বাংলার পট : পটুয়া

আজকে আমরা বাংলার পট : পটুয়া সম্পর্কে আলোচনা করবো। যা বাংলার চিত্রকলা ( মধ্যযুগ থেকে কালীঘাট) এর অন্তর্গত।

 

বাংলার পট : পটুয়া

 

বাংলার পট : পটুয়া

পটুয়াদের পট লৌকিক ধারার শিল্প। বাংলায় সব চিত্রশিল্পীদের পটুয়া বলা হয়, এখানে আমাদের আলোচ্য পটুয়া সম্প্রদায়ের শিল্প-দীঘল পট বা লাটাই পটের সঙ্গে নানা উপাখ্যান গান গেয়ে দেখানো হয়, তাতে সূক্ষ্ম কারিগরি নেই, আটপৌরে ভাষায় শিল্প আদিমতার ছোঁয়া লাগানো। চাট্ট বা চাট বলতে কাপড়কে বোঝায়, পটুয়ারা আগে কাপড়ে আঁকত, এখন কাগজে এঁকে কাপড়ের উপর লাগিয়ে নেয়। লোকচিত্রকলা দীর্ঘপ্রবাহের মধ্যে দিয়ে চলে আসছে।

বাংলার পটের প্রাচীনতম সংগ্রহ উনিশ শতকের। তার আগেও পটচিত্রের ধারা প্রবাহিত ছিল, এ শুধু অনুমান নয় অপ্রত্যক্ষ প্রমাণও আছে। পটচিত্রের পৃষ্ঠপোষকতা করে এসেছেন জনসাধারণ, লৌকিকজন। সামন্তশ্রেণি বা দরবারের পৃষ্ঠপোষকতা তা পায়নি, পেয়েছে আরো বৃহত্তর জনসমাজের পৃষ্ঠপোষকতা। পটুয়াদের যে শ্রেণি বা বর্ণের কথা আমরা জানি তা মান্য সমাজের নয়। পটুয়ারা সমাজের নিম্নবর্গের ও সমাজের নিচুস্তরের মধ্যে পরিগণিত। কিন্তু উচ্চ বা মান্য সমাজ বা বর্গ যা করতে পারেনি বাঙালির চিত্রকলার ধারাকে এই পটুয়ারাই শতাব্দীর পর শতাব্দী জীবিত করে রেখেছে।

গত শতাব্দীর গোড়ার থেকে বাঙালির সাংস্কৃতিক জীবনে পটুয়াদের অবদান ও পটচিত্রের অবস্থানের গুরুত্বের কথা বোঝার চেষ্টা হচ্ছে। সমাজের নিচুতলার অবস্থান থেকে তাদের মান্য সমাজে তুলে আনা যায়নি—মান্য সমাজের বাধার জন্য, অথচ যে শিল্পকর্ম তারা করে এসেছে মান্য সমাজ তা করতে পারেনি। হিন্দু দেবদেবী পুরাণের ছবি আঁকলেও হিন্দু সমাজে তাদের ঠাঁই ছিল না, মুসলমান সমাজ তাদের গ্রহণ করেনি যেহেতু তারা হিন্দু দেবদেবীর ছবি আঁকে। যদিও জন্মগতভাবে অধিকাংশ পটুয়াই মুসলমান। কিছু কিছু হিন্দু আচার আচারণও তারা পালন করে। কোনো কোনো গবেষক মনে করেন, বর্ণহিন্দু সমাজের নিপীড়নে পটুয়ারা ধর্মান্তর গ্রহণ করেছিল, আদিতে হয়তো এদের একাংশ বৌদ্ধ ছিল। পোশাকি ধর্ম যাই হোক না কেন পটুয়াদের ধর্ম মানবধর্ম। মুসলমান ও হিন্দু এ দুইয়ের মধ্যে তারা ঐক্যের প্রতীক।

বাংলার পট : পটুয়া
রামায়ণের দৃশ্য, পটুয়া পট, ১৯ শতক বাঁকুড়া, ডে. সি. ফ্রেঞ্চ সংগ্রহ

 

আধুনিক ইউরোপীয় চিত্রকলা চর্চা করা পশ্চিমমুখী দৃষ্টিভঙ্গি থেকে অনেকেই পটচিত্রের গুরুত্ব বুঝতে পারবেন না বা অনেকেই গ্রামীণ ব্যাপার বলে পটচিত্রের শিল্পশৈলী এড়িয়ে যাবেন। পটচিত্রের গুরুত্ব বুঝতে চেয়েছিলেন অবনীন্দ্রনাথ নন্দলাল-বিনোদবিহারী প্রমুখ। যামিনী রায় পটচিত্র থেকে নিজের শিল্পশৈলীর উদ্ভাবন করেছিলেন। পরবর্তী অনেক শিল্পী পটের আঙ্গিক রূপ আত্মীকরণ করেছেন। মার্গ সংগীত বা সাহিত্য যেমন লোকশিল্প বা সংগীত থেকে গ্রহণ করে, তেমনি মার্গ চিত্রকলাও লৌকিক চিত্রকলা থেকে গ্রহণ করে নিজের এলাকা বাড়িয়ে তোলে।

বাংলার পট : পটুয়া
বাঁকুড়া পট, আঠারো শতক, সংগ্রহ- ভি এন্ড এ

 

সংস্কৃত ও পালি সাহিত্যে এই পটচিত্র ও পটচিত্রকারদের বহু উল্লেখ আছে। পরবর্তীকালে উত্তর-মধ্য ভারতে ‘চরণ চিত্রের’ উল্লেখ পাচ্ছি আমরা । অর্থাৎ চিত্রকলার প্রবাহমানতা কয়েক হাজার বছরের। একদিক থেকে বাংলার পটুয়াদের এই ‘চরণ-চিত্র’ ধারার উত্তরসূরি। বাংলার পটে বিষয়ের এলাকা ব্যাপক।

রামায়ণ-মহাভারত-কৃষ্ণলীলা-চণ্ডী-দুর্গা-কালী শিব-মনসা থেকে সমসাময়িক ঘটনা, আন্দোলন, চরিত্র এসবই পটুয়াদের বিষয়। এ ছাড়া যমপট, গাজীর পট, শূলপট, মহারাজা পট, বেড়াপট জঙ্গল পট ও আদিবাসী সমাজের আরো কয়েকরকমের পট প্রচলিত আছে। প্রচলিত আছে মসনদ-ই-আলা পট, সত্যজীবের পট আঁকা হয়। কয়েক দশক ধরে কিছু কিছু সামাজিক প্রকল্প এঁকে তারা গানসহ প্রচার করেন। সমকালীন রাজনীতিও এসে গেছে পটে।

বাংলার পট : পটুয়া
বাঁকুড়া জড়ানো পট, সংগ্রহ- যামিনী রায়

 

পটচিত্রে যা আকর্ষণ করে তা হলো বর্ণবিন্যাস ও গড়ন। ভেষজ, খনিজ, ভূমিজ রং, শঙ্খ থেকে তারা রং তৈরি করত। তাই রঙের বিন্যাস যা পাওয়া যায় তা আধুনিক চিত্রকলায় অপ্রাপ্য। প্রতিমাগুলো মূর্ত বা সম্পূর্ণ প্রতিমা নয় অসম্পূর্ণ কিন্তু বিমূর্তও নয়—এটাই এক ধরনের শৈলী। কোনো কোনো চিত্রে রেখা অত্যন্ত শক্তিশালী। তার চরম প্রকাশ কালীঘাটের পটে। বিষ্ণুপুর অঞ্চলে পটে সূক্ষ্ম রেখার কাজ খুবই দেখা যায়, আর বিষ্ণুপুর অঞ্চলের পটে কিছুটা রাজস্থানী অনুচিত্রের ধরন পাওয়া যায়।

গৌড়ীয় বৈষ্ণব সমাজের সঙ্গে উত্তর ভারতের নিয়মিত যোগাযোগ স্থাপিত হয়েছিল, সে সময় কিছু অনুচিত্র- শিল্পী উত্তর ভারত থেকে এসে থাকতে পারেন, তাঁদের কাজ সে সময়ে পটুয়ারা লক্ষ করে থাকবে। এ ছাড়া বাঁকুড়ার টেরাকোটার কিছু রৈখিক বৈশিষ্ট্য এই অঞ্চলের পটে পাওয়া যায়। মুর্শিদাবাদের কোনো কোনো পটে দরবারি চিত্রকলার কিছু উপাদান পাওয়া যায়। যেমন রামায়ণপট ও কৃষ্ণলীলাপট। আশুতোষ সংগ্রহশালায় ‘কমলেকামিনী’ পটটিও অনুচিত্র ঘেঁষা।

গুরুসদয় সংগ্রহশালায় দুটি চক্ষুদানপট দেখলে মনে পড়ে পরবর্তীকালে নন্দলাল বসুর ভারতীয় কংগ্রেসের সভার কিছু প্যানেল অঙ্কনের কথা। ‘চৌকাপটে’ শিল্পকর্ম আর দীঘল পটের বা জড়ানো পটের শিল্পকর্ম একটু পৃথক ধরনের। দীঘল পটে আখ্যানের অংশ বেশি, চৌকাপটে রূপকল্প বেশি। আদিবাসী পটের জগৎ আরো আলাদা, এখানে আদিম ভাব জাদু বিশ্বাসের কল্পনা অত্যন্ত প্রবল—এ অন্য ধরনের শিল্প সুষমা।

পটুয়ারা আগে পাঁচালী-মঙ্গলপাঠের ত্রিপদী সুরে গাইত। এখন নানান সমকালীন সুর তারা মিশিয়ে নিচ্ছে। অনেকক্ষণ ধরে গেয়ে গেয়ে দীঘলপট একটার পর একটা অংশ খুলে গায় তারা—একটি দৃশ্য থেকে দৃশ্যান্তরে যাওয়ার মতো বা নাটকের একটি অঙ্ক থেকে আরেকটি অঙ্কে যাওয়ার মতো।

পশ্চিমবঙ্গ থেকে আস্তে আস্তে বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে পটচিত্র, পটুয়া সম্প্রদায় চলে যাচ্ছে অন্যান্য পেশায়। যে কৃষিভিত্তিক গ্রামীণ জনসাধারণ পটুয়াদের পৃষ্ঠপোষকতা করতেন তাঁদের কাছে পটচিত্র, গান গেয়ে আখ্যান বর্ণনা, লোকশিক্ষা – ছবি ও গানের মাধ্যমে আর আকর্ষণীয় নয়। মেদিনীপুরের নয়া গ্রাম, ঠেকুয়াচক, আমদাবাগ, নির্ভয়পুরের মতো কয়েকটি মাত্র অঞ্চলের পটুয়ারা এই শিল্পকে এখনও উজ্জীবিত করে রেখেছে। শহর অঞ্চলের কিছু গবেষক, আকাদেমি বা সংগ্রাহকদের পৃষ্ঠপোষকতা তারা যা পায় তা দিয়ে অন্নসংস্থান হয় না। তবুও বঙ্গীয় শিল্পধারায় পটের প্রবাহ ক্ষীণভাবে চলেছে।

Leave a comment