এক নজরে জীবনবৃত্তান্ত । শিল্পী জয়নুল আবেদিন

আজকে আমাদের আলোচনার বিষয়ঃ এক নজরে জীবনবৃত্তান্ত । এটি শিল্পী জয়নুল আবেদিন এর জীবনী গ্রন্থমালার অন্তর্গত।জয়নুল আবেদিন  বিংশ শতাব্দীর একজন বিখ্যাত বাঙালি চিত্রশিল্পী। পূর্ববঙ্গে তথা বাংলাদেশে চিত্রশিল্প বিষয়ক শিক্ষার প্রসারে আমৃত্যু প্রচেষ্টার জন্য তিনি শিল্পাচার্য উপাধি লাভ করেন।

 

এক নজরে জীবনবৃত্তান্ত । শিল্পী জয়নুল আবেদিন

 

এক নজরে জীবনবৃত্তান্ত । শিল্পী জয়নুল আবেদিন

১৯১৪ :

বৃহত্তর ময়মনসিংহ জেলার কিশোরগঞ্জে (বর্তমানে জেলা) ২৯ ডিসেম্বর জন্ম। সরকারি নথিতে জন্মতারিখ ১৮ নভেম্বর। পিতার নাম তমিজউদ্দিন আহমেদ, মা জয়নবুন্নেছা।

১৯২২ :

স্কুলে ভর্তি । বিদ্যালয়ের নাম শেরপুর রামরঙ্গিনী স্কুল চতুর্থ শ্রেণী পর্যন্ত এখানে অধ্যয়ন করেন ।

১৯২৬ :

মাতামহের বাড়ি ময়মনসিংহ আকুয়া মাদ্রাসা কোয়ার্টারে পিতা কর্তৃক গৃহনির্মাণ, সেখানে স্থায়ীভাবে বসবাস।

১৯৩০ :

ময়মনসিংহ মৃত্যুঞ্জয় স্কুলে নবম শ্রেণীতে ভর্তি। বোম্বে ক্রনিকল পত্রিকায় গলফ খেলার চিত্র-অঙ্কন প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে পুরস্কার লাভ ।

 

এক নজরে জীবনবৃত্তান্ত । শিল্পী জয়নুল আবেদিন

 

১৯৩২-৩৮ :

এ সময় কলকাতা গভর্নমেন্ট স্কুল অব আর্টসের ছাত্র ছিলেন। থাকতেন ৩১ ওয়েলেসলি স্ট্রিটের এক মেসে এবং পরে ব্যান্ডেল রোডে। পাশ্চাত্য একাডেমিক ধারায় ড্রইং, জলরঙ, তেলরঙ এবং ছাপচিত্রে কাজ শেখেন। পশ্চিমবঙ্গ ও পার্শ্ববর্তী অঞ্চল, বিহারের দুমকা এলাকা ও পূর্ব বাংলার ময়মনসিংহে আউটডোর স্টাডি করতেন। ১৮৩৭ সালে ছাত্রাবস্থায় আর্ট স্কুলের অস্থায়ী শিক্ষক নিযুক্ত।

১৯৩৮:

কলকাতার একাডেমি অব ফাইন আর্টসে অনুষ্ঠিত অল-ইন্ডিয়া আর্টস, একজিবিশনে অংশ নিয়ে গভর্নরস গোল্ড মেডেল লাভ করেন। আর্ট স্কুলের চূড়ান্ত পরীক্ষায় প্রথম শ্রেণীতে প্রথম হয়ে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন ।

১৮৩৯ : শিক্ষক হিসেবে আর্ট স্কুলে স্থায়ী নিযুক্তি পান । ব্রিটিশ সরকারের তিন বছর মেয়াদি স্কলারশিপ পান। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কারণে যাত্রা স্থগিত ।

১৯৪৩ : পঞ্চাশের মন্বন্তর শুরু। কলকাতা রাজপথের ভুখানাঙ্গা মানুষের প্রচুর স্কেচ ও দুর্ভিক্ষ-চিত্র আঁকেন। কমিউনিস্ট পার্টির উদ্যোগে দুর্ভিক্ষের চিত্র নিয়ে কলেজ স্ট্রিট মার্কেটে প্রদর্শনী হয়। চিত্রগুলো বিপুল আলোড়ন তোলে এবং প্রশংসিত হয়।

১৯৪৬ : বিয়ে। কনে ঢাকা নিবাসী তৈয়ব উদ্দিন আহমদের কন্যা জাহানারা বেগম । কলকাতার ইসলামিয়া কলেজে মুসলিম শিল্পীদের চিত্রশিল্পের প্রদর্শনীতে অংশগ্রহণ করেন। নভেম্বর-ডিসেম্বরে ইউনেস্কোর উদ্যোগে প্যারিসে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক আধুনিক চিত্রপ্রদর্শনীতে অংশগ্রহণ।

 

এক নজরে জীবনবৃত্তান্ত । শিল্পী জয়নুল আবেদিন

 

১৯৪৭ : ভারত বিভাগ। ঢাকায় চলে আসেন। আরমানিটোলায় অবস্থিত নর্মাল স্কুলে আর্ট শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন। আবদুল হাদি লেনে শ্বশুরালয়ে বসবাস করতে থাকেন।

১৯৪৮ :

জয়নুল আবেদিনের নেতৃত্বে ঢাকায় আর্ট স্কুল, গভর্নমেন্ট ইনস্টিটিউট অব আর্টস প্রতিষ্ঠা ও সেপ্টেম্বর থেকে যাত্রা শুরু। সহযোগী হিসেবে পেয়েছিলেন কয়েকজন শিক্ষক। তিনি প্রতিষ্ঠানের অধ্যক্ষ হন। কিন্তু এর আগেই পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকারের তথ্য ও বেতার বিভাগের প্রচার শাখার মুখ্য নকশাবিদ হয়ে আগস্টে করাচি গমন করেন ।

১৯৪৯ : ২৮ ফেব্রুয়ারি করাচি থেকে ঢাকায় ফেরেন। ১ অক্টোবর আর্ট ইনস্টিটিউটের অধ্যক্ষ পদে যোগদান করেন । ১৯৫০। ডিসেম্বর মাসে তাঁর নেতৃত্বে ‘ঢাকা আর্ট গ্রুপ’ গঠন; তিনি এর সভাপতি হন । ফেব্রুয়ারি থেকে আজিমপুরে বসবাস করতে থাকেন ।

১৯৫১ : এ বছর শিল্পী শান্তিনগরে একটি বাড়ি কেনেন। ১৬-২১ জানুয়ারি ঢাকা আর্ট গ্রুপের প্রথম প্রদর্শনী হয়। এক বছরের বৃত্তি নিয়ে ৩ আগস্ট লন্ডন গমন । সেখানে স্লেড স্কুল অফ আর্টে উচ্চতর প্রশিক্ষণ গ্রহণ

১৯৫২ : ফ্রান্স, স্পেন, ইতালি ও তুরস্ক সফর। ভেনিসে অনুষ্ঠিত ইউনেস্কো আয়োজিত আন্তর্জাতিক শিল্প সম্মেলনে যোগদান করেন ।

১৯৫৩ : কনিষ্ঠ পুত্র মইনুল আবেদিনের জন্য পার্বত্য চট্টগ্রামের উপজাতীয়দের জীবন ও পরিবেশভিত্তিক জলরঙ চিত্রমালা আঁকেন।

১৯৫৪ : ঢাকার শাহবাগে আর্ট ইনস্টিটিউটের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপিত হয়। ২৩-২৭ এপ্রিল অনুষ্ঠিত ঢাকার সাংস্কৃতিক সম্মেলনের একটি অধিবেশনের সভাপতির দায়িত্ব পালন।

১৯৫৫ : শিল্পী জয়নুল আবেদিনের উদ্যোগে অক্টোবরে ইনস্টিটিউটের সেগুনবাগিচা ভবনে প্রথম লোকশিল্প প্রদর্শনীর আয়োজন। পাকিস্তান আর্ট কাউন্সিলের উদ্যোগে করাচিতে তাঁর একক প্রদর্শনীর আয়োজন। সপরিবারে করাচিতে মাসখানেক অবস্থান ।

১৯৫৬ : ২৫ আগস্ট এক বছরের রকফেলার ফাউন্ডেশনের অধীনে জাপান, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, মেক্সিকো, কানাডা, ব্রিটেন, জার্মানি, বেলজিয়াম, ফ্রান্স, ইতালি, সুইজারল্যান্ড ও স্পেন সফরের উদ্দেশ্যে ঢাকা ছাড়েন । অক্টোবরে চারুকলা ইনস্টিটিউটের কার্যক্রম স্থায়ীভাবে শাহবাগে স্থানান্তরিত হয় ।

১৯৫৮ : শাহবাগ আর্ট ইনস্টিটিউটে লোকশিল্প প্রদর্শনীর আয়োজন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফজলুল হক হলের জীবন সদস্য নির্বাচিত। ১৯৫৯। পাকিস্তান প্রেসিডেন্ট কর্তৃক সৃজনশীল কাজের জন্য দেশের সর্বোচ্চ পদক ‘প্রাইড অব পারফরমেন্স’ লাভ করেন। একই বছর সর্বোচ্চ সরকারি খেতাব ‘হিলাল-ই-ইমতিয়াজ’-এ ভূষিত হন ।

 

এক নজরে জীবনবৃত্তান্ত । শিল্পী জয়নুল আবেদিন

 

১৯৬১ : আমন্ত্রিত সরকারি অতিথি হিসেবে সোভিয়েত ইউনিয়ন ভ্রমণ করেন; সেখানে স্বর্ণপদক লাভ ।

১৯৬৩: গভর্নমেন্ট ইনস্টিটিউট অব আর্টস ইস্ট পাকিস্তান ১৯৬৩-৬৪ শিক্ষাবর্ষ থেকে কলেজ অব আর্টস অ্যান্ড ক্রাফটসে রূপান্তরিত হয়। তখন থেকে বিএফএ স্নাতক ডিগ্রি পাঠ্যক্রম শুরু হয়।

১৯৬৪ : পেশোয়ার বিশ্ববিদ্যালয়ের আমন্ত্রণে ফাইন আর্ট বিভাগ চালু করার দায়িত্ব নিয়ে আগস্টে পেশোয়ার যান, সেখানে ভিজিটিং প্রফেসর হিসেবে ৭ মাস কাটান।

১৯৬৫ : পেশোয়ার বিশ্ববিদ্যালয়ে চারুকলা বিভাগ স্থাপন করে ফেব্রুয়ারি মাসে ঢাকা ফেরেন।

১৯৬৭ : ৪ নভেম্বর ইস্ট পাকিস্তান কলেজ অব আর্ট অ্যান্ড ক্রাফটসের অধ্যক্ষের পদ থেকে স্বেচ্ছায় অবসর নেন। একই সাথে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ডিন অব ফাইন আর্টস-এর পদ থেকেও অবসরগ্রহণ করেন। আনুষ্ঠানিকভাবে গুণমুগ্ধ ও ভক্ত শিক্ষার্থীদের পক্ষ থেকে তাকে ‘শিল্পাচার্য’ উপাধিতে ভূষিত করা হয় ।

১৯৬৮ : টেলিভিশন, ফিল্ম ও পাবলিকেশন্সের জন্য পাকিস্তান সরকারের অনারারি আর্ট অ্যাডভাইজার নিযুক্ত।

১৯৭০ : ফেব্রুয়ারি মাসে ঢাকায় বাঙালি শিল্পীদের নিয়ে ‘নবান্ন’ শীর্ষক প্রদর্শনী- আয়োজনে নেতৃত্ব দান। এ-উপলক্ষে ৬৫ ফুট দীর্ঘ স্ক্রলচিত্র অঙ্কন। ১২ নভেম্বর উপকূলীয় অঞ্চলে প্রচণ্ড সাইক্লোন ও জলোচ্ছ্বাস হয় । এতে প্রায় ৩ লাখ মানুষের প্রাণহানি ঘটে। ঘটনাস্থল প্রত্যক্ষ করার পর ‘মনপুরা ৭০ শীর্ষক ৩০ ফুট দীর্ঘ একটি স্ক্রলচিত্র আঁকেন ।

১৯৭১ : ফেব্রুয়ারিতে জননেতা মওলানা ভাসানী আয়োজিত ময়মনসিংহের এক জনসভায় যোগ দেন এবং ‘হিলাল-ই-ইমতিয়াজ’ খেতাব প্রত্যাখ্যানের ঘোষণা দেন। ১২ মার্চ বাংলা চারু ও কারুশিল্পী সংগ্রাম পরিষদের আয়োজিত ‘স্বাধীনতা’ শীর্ষক মিছিলেন নেতৃত্ব দেন ।

 

এক নজরে জীবনবৃত্তান্ত । শিল্পী জয়নুল আবেদিন

 

১৯৭২ : বাংলা একাডেমীর সভাপতি নির্বাচিত হন। জানুয়ারিতে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার পুনর্নির্মাণের সেরা নকশা বাছাই কমিটির সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন। ফেব্রুয়ারিতে প্যারালাইটিক স্ট্রোকে তাঁর মুখ আংশিকভাবে অবশ হয়ে পড়ে, সরকারি উদ্যোগে চিকিৎসার জন্য এপ্রিলে লন্ডনে যান। দেশে প্রত্যাবর্তনের পর হাতে লেখা সংবিধান তৈরির সার্বিক তত্ত্বাবধানের দায়িত্ব পালন।

১৯৭৩ : ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলার ভিজিটিং প্রফেসর নির্বাচিত হন। দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয় অনারারি ডি লিট ডিগ্রিতে ভূষিত হন। ১৯৭৪ – বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমী গঠনের ক্ষেত্রে বিশেষ ভূমিকা পালন এর অন্যতম উপদেষ্টা মনোনীত।

১৯৭৩ : জাতীয় অধ্যাপক নির্বাচিত। সোনারগাঁ-এ ‘বাংলাদেশ লোকজ চারু ও কারুকলা ফাউন্ডেশন’ এবং ময়মনসিংহে জয়নুল সংগ্রহশালা’ প্রতিষ্ঠা করেন ।

১৯৭৬ : সেপ্টেম্বর থেকে অসুস্থ হয়ে পড়েন, ডিসেম্বর ফুসফুস ক্যান্সার রোগ শনাক্ত । সরকার তাঁর সুচিকিৎসার জন্য তাকে লন্ডন পাঠান। সেখানে ২ মাস। চিকিৎসা গ্রহণ । ৭ মে ঢাকার পিজি হাসপাতালে ভর্তি ২৮ মে ৬২ বছর বয়সে হাসপাতালে মারা যান।

শিল্পীর প্রতিষ্ঠিত আর্ট ইনস্টিটিউটের সন্নিকটে বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদ প্রাঙ্গণে তাঁকে সমাধিস্থ করা হয় ।

আরও দেখুনঃ

Leave a comment