আজকে আমরা আর্ট ইনস্টিটিউট সম্পর্কে আলোচনা করবো। এটি শিল্পী জয়নুল আবেদিন এর জীবনী গ্রন্থমালার অন্তর্গত।জয়নুল আবেদিন বিংশ শতাব্দীর একজন বিখ্যাত বাঙালি চিত্রশিল্পী। পূর্ববঙ্গে তথা বাংলাদেশে চিত্রশিল্প বিষয়ক শিক্ষার প্রসারে আমৃত্যু প্রচেষ্টার জন্য তিনি শিল্পাচার্য উপাধি লাভ করেন।

আর্ট ইনস্টিটিউট । শিল্পী জয়নুল আবেদিন
দীর্ঘ এক অভিযান শেষে জয়নুল সফলতা পান। এ সফলতায় পূর্ববঙ্গের মানুষ চারুচর্চার একটি প্রতিষ্ঠান পেল। সরকার আর্ট স্কুল প্রতিষ্ঠায় সম্মত হয় এবং ১৯৪৮-৪৯ অর্থবছরে এর কার্যক্রম শুরু হয়। স্থান হিসেবে নির্বাচন করা হয়। রায়বাজার সংলগ্ন ন্যাশনাল মেডিক্যাল হাসপাতাল স্কুলের দুটি ঘর। এর হাসপাতাল অংশের পশ্চিম দিকের উপরতলা ও নিচতলার চারটি ঘর প্রায় পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে ছিল। এগুলো স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন ফাইলপত্রে বোঝাই ছিল। এর থেকে নিচতলার দুটো ঘর আর্ট স্কুলের জন্য বরাদ্দ করা হয়।
আর্ট স্কুলের নাম রাখা হয় গভর্নমেন্ট ইনস্টিটিউট অব আর্ট । জয়নুল আবেদিন হন প্রতিষ্ঠানের অধ্যক্ষ আনোয়ারুল হক লেকচার ইন আর্ট, সফিউদ্দিন আহমেদ লেকচার ইন গ্রাফিক আর্ট এবং কামরুল হাসান হেড ডিজাইনার হিসেবে যোগ দেন। ড্রাফটম্যান আলী আহসান ও হাবিবুর রহমান শিক্ষক হিসেবে যুক্ত হন ।
অতঃপর ১৯৪৮ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর ছাত্র ভর্তি করার বিজ্ঞাপন প্রচারিত হয় । ৩০ সেপ্টেম্বর ১৮ জন ছাত্র নিয়ে শুরু হয় আর্ট স্কুলের আনুষ্ঠানিক শিক্ষাক্রম । উদ্যমী কতিপয় শিক্ষক আর সৃষ্টিপথের যাত্রী একদল ছাত্র নিয়ে পূর্ববঙ্গে অনন্য এক উদাহরণ সৃষ্টি করেন। কিন্তু আনুষ্ঠানিক কার্যক্রমের এ সূচনায় উপস্থিত থাকতে পারেননি প্রতিষ্ঠান নির্মাণের কারিগর জয়নুল আবেদিন ।
তিনি তখন করাচিতে, কেন্দ্রীয় তথ্য মন্ত্রণালয়ের প্রধান শিল্পী হিসেবে নিয়োজিত । আনোয়ারুল হক তখন অফিসার ইন-চার্জ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। জয়নুল আবেদিন বছরখানেক করাচিত্তে সরকারি কাজে নিয়োজিত ছিলেন । সেখানে শিল্প-সাহিত্যজগতে তিনি উজ্জ্বল নক্ষত্ররূপে ছিলেন। সবকিছু ছিন্ন করে ১৯৪৯ খ্রিস্টাব্দে ইনস্টিটিউটে অধ্যক্ষ হিসেবে যোগ দেন । স্বপ্নের আর্ট ইনস্টিটিউটে এসে তিনি এর সার্বিক উন্নয়নে কর্মতৎপর হয়ে ওঠেন, তেমনি ছাত্ররাও জয়নুলকে পেয়ে উৎফুত বোধ করে।
উল্লেখ্য, গভর্নমেন্ট ইনস্টিটিউট অব আর্ট-এর প্রথম বর্ষে ভর্তি হওয়া ছাত্রদের মধ্যে ছিলেন হামিদুর রহমান, আমিনুল ইসলাম, আবদুর রহমান ভূঁইয়া, আবদুল কাদের, মোহাম্মদ ইসমাইল, আলফাজুদ্দিন খন্দকার, নুরুল ইসলাম, খালেদ চৌধুরী, শামসুল ইসলাম, ইমদাদ হোসেন, জুলফিকার আলী, প্রভাস সেন, লোকনাথ ধর ও আরো কয়েকজন। এদের মধ্যে কয়েকজন কয়েক মাসের মধ্যেই ঝরে পড়েন ।

আর্ট স্কুলের শিক্ষকরা সবাই ছিলেন কলকাতা আর্ট স্কুলের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। স্বাভাবিকভাবে ওই স্কুলের প্রতি ছিল তাদের ভালোবাসার টান । ঢাকার আর্ট শিক্ষার এ প্রতিষ্ঠানে তারা কলকাতা আর্ট স্কুলের পাঠ্যসূচিকে প্রাধান্য দিলেন। উল্লেখ্য, তখন একমাত্র শান্তিনিকেতন ছাড়া সব আর্ট শিক্ষা প্রতিষ্ঠানেই ব্রিটিশ ধাঁচের কারিকুলাম অনুসরণ করা হতো। পাঁচ বছরের কোর্স ছিল। প্রথম দুই বছর এলিমেন্টারি বিভাগ। পরবর্তী তিন বছর ড্রইং, পেইন্টিং অথবা কমার্শিয়াল আর্ট থেকে যে কোনো একটি বেছে নেয়া।


ছোট পরিসরে শিক্ষা কার্যক্রম চালানো ছিল কঠিন । দ্বিতীয় বছর ছাত্র ভর্তির পর সমস্যা আরো প্রকট হয়। তৃতীয় বর্ষে সমস্যা আরো বাড়ে। ছাত্রদের মধ্যে অসন্তোষ ধূমায়িত হয়। একদল ছাত্রের নেতৃত্বে সরকারের শিক্ষা সঙ্কোচন নীতির বিরুদ্ধে দেয়ালে পোস্টার সাঁটিয়ে প্রতিবাদ জানানো হয়। ধর্মঘটের প্রস্তুতিও নেয়া হয় । কিন্তু শিক্ষকদের পরামর্শে ছাত্ররা আর ধর্মঘটে যায়নি। ভয় ছিল, ধর্মঘট ডাকলে যদি প্রতিষ্ঠানটি সরকার বন্ধ করে দেয়। তবে এই ক্ষোভের মধ্য দিয়ে ছাত্ররা প্রতিবাদের একটি মঞ্চ তৈরি করে, তা হলো ‘ঢাকা আর্ট গ্রুপ’ । এর সভাপতি মনোনীত হন শিল্পী জয়নুল আবেদিন। এর মাধ্যমে তরুণ শিল্পীরা প্রতিবাদের এক ভাষা নির্মাণ করেন ।
১৯৫২ খ্রিস্টাব্দের মাঝামাঝি ইনস্টিটিউট সেগুনবাগিচায় স্থানান্তরিত হয় । বড়সড় কম্পাউন্ড সমেত বাড়িটা বরাদ্দ পাওয়ায় ছাত্র-শিক্ষকরা স্বস্তিবোধ করলো। বলা দরকার, ইনস্টিটিউটের এই স্থানান্তরের সময়ও জয়নুল আবেদিন দেশে ছিলেন না । আনোয়ারুল হক ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষের দায়িত্বে ছিলেন। ফিরে এসে তিনি ইনস্টিটিউটকে একটি বৃহৎ প্রতিষ্ঠানে পরিণত করার পরিকল্পনা নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েন।

এ জন্য তাকে অনেক সময়, মেধা ব্যয় করতে হয়েছে, সংগ্রাম করতে হয়েছে। তিনি চাইতেন, প্রতিষ্ঠানটি আরো বৃহৎ পরিসরে পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা নিয়ে বিকশিত হোক। ইনস্টিটিউটের নিজস্ব ভূমি ও ভবনের জন্য তিনি আবার মাঠে নামেন। সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন লোকের সঙ্গে যোগাযোগ করেন, দেনদরবার করেন। অতঃপর ব্যাপক তৎপরতা চালিয়ে শাহবাগে প্রায় সাড়ে এগারো বিঘা জমি বরাদ্দ নেন। আর ফোর্ড ফাউন্ডেশনের আর্থিক আনুকূল্যও পান। ১৯৫৪ খ্রিস্টাব্দের ৫ ফেব্রুয়ারি ভবনের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয়। এর নকশা ও পরিকল্পনা করেন স্থপতি মাজহারুল ইসলাম।
জয়নুল আবেদিন নিয়মিত এসে কাজের তদারকি করতেন। প্রায় দুবছর অবিরাম কাজ করে ভবনটির কাজ সমাপ্ত হয় । স্বপ্নের এই ভবন তৈরির মাধ্যমে জয়নুল আবেদিন তার ইচ্ছার বাস্তব অবয়বটি দেখতে পেলেন। একজন মানুষের জন্য এ এক পরম পাওয়া । এর জন্য তাকে পাড়ি দিতে হয়েছে কষ্টের এক দীর্ঘ নদী, কঠোর পরিশ্রম, ব্যক্তিগত অনেক সম্ভাবনার বিসর্জন। সব সময়ই তিনি তার সংকল্পে দৃঢ় ছিলেন।
শাহবাগের নতুন ভবনে ইনস্টিটিউটের কার্যক্রম চালু হয় ১৯৫৬ খ্রিস্টাব্দের শেষের দিকে। এ সময় ইনস্টিটিউটের স্বপ্ন বাস্তবায়নের কারিগর দেশে ছিলেন। যথারীতি আনোয়ারুল হক অধ্যক্ষের দায়িত্বে ছিলেন ।
আরও দেখুনঃ
