পূর্ণতার পথে । শিল্পী জয়নুল আবেদিন

আজকে আমরা আলোচনা করবো জয়নুল আবেদিন এর পূর্ণতার পথে। এটি শিল্পী জয়নুল আবেদিন এর জীবনী গ্রন্থমালার অন্তর্গত। জয়নুল আবেদিন  বিংশ শতাব্দীর একজন বিখ্যাত বাঙালি চিত্রশিল্পী। পূর্ববঙ্গে তথা বাংলাদেশে চিত্রশিল্প বিষয়ক শিক্ষার প্রসারে আমৃত্যু প্রচেষ্টার জন্য তিনি শিল্পাচার্য উপাধি লাভ করেন।

 

পূর্ণতার পথে । শিল্পী জয়নুল আবেদিন

 

পূর্ণতার পথে । শিল্পী জয়নুল আবেদিন

ছাত্র হিসেবে জয়নুল বরাবরই ভালো ছিলেন। প্রথম হয়েই প্রতিটি শিক্ষাবর্ষ পাড়ি দিচ্ছিলেন। প্রচলিত শিক্ষা গ্রহণকালে অমনোযোগী ছাত্রটি সুবোধ বালকের মতো ছবি আঁকা শেখাকে ধ্যান হিসেবে নিলেন। নিবিড়ভাবে অনুশীলনে বিভোর থাকেন। ক্লাস শেষের বাকি সময়টুকু রঙ-তুলিতে আঁকিবুকি করতেন । ময়মনসিংহের দিনগুলোতে এতোদিন মনের মাধুরী মিশিয়ে ছবি আঁকতেন, সে আঁকায় প্রাতিষ্ঠানিক কোনো ধরাবাধা নিয়ম ছিল না। এখন তিনি প্রাতিষ্ঠানিক কানুন মেনে ছবি আঁকা মকশো করতে থাকেন। চিত্রশিল্পের নানা ধারার সঙ্গে পরিচিত হতে থাকেন ।

বিরামহীনভাবে ছবি আঁকায় তিনি কোনো ক্লান্তিবোধ করতেন না। অঙ্কনে তিনি আনন্দ পেতেন । নানা বিচিত্র বিষয় তিনি ক্যানভাসে ফুটিয়ে তুলতেন। আলীপুর চিড়িয়াখানা, গড়ের মাঠ, বোটানিক্যাল গার্ডেনে প্রথম দিকে তিনি ছবি আঁকতেন । মানুষের নানাভঙ্গি, পশুপাখি ও গাছপালার নিবিড় পর্যবেক্ষণ শেষে রঙ-তুলিতে চিত্ররূপ দিতেন।

 

পূর্ণতার পথে । শিল্পী জয়নুল আবেদিন

 

শহর কলকাতা ও আশপাশে তিনি ছবি আঁকতেন । থাকতেন ৩১ ওয়েলেসলি স্ট্রিটের একটি মেসে। প্রথম কয়েক মাস তো তার শোয়ার মতো সিটও ছিল না। সিঁড়ির নিচে কোনো রকমে ঘুমানোর মতো একটি ব্যবস্থা করে নেন । এখানে কাটিয়ে দেন তিনটি বছর । থাকা-খাওয়ার কষ্টে আরাধ্য কাজ থেকে তিনি লক্ষ্যচ্যুত হননি । শিল্পী হওয়া ছিল যেন তার কাছে এক সংগ্রামমুখর প্রতিজ্ঞা ।

তবে শিল্পী হতে গিয়ে কখনো নিজের বাস্তবতা হতে দূরে সরে যাননি । নিজের পরিবার, স্বদেশের মানুষ ও সংস্কৃতি ছিল তার কাছে পরম আদরণীয়। সেই সাথে দায়িত্ববোধ ছিল প্রখর। বৃত্তির টাকায় ছাত্রজীবন নির্ভাবনায় সম্পন্ন করতে পারতেন । কিন্তু সব সময় মাত্র ত্রিশ টাকা পেনশন পাওয়া বাবার সংসার চালানোর কষ্টও তাকে ভাবিত করতো। যে বাবা সমাজের বিরূপ স্রোতের বিপরীতে দাঁড়িয়ে তাকে আর্ট স্কুলে ভর্তির অনুমতি দিয়েছিলেন, যে মা গায়ের গহনা খুলে তার ভর্তির টাকা জুগিয়েছিলেন, তা তিনি কখনো বিস্মৃত হননি । ফলে দায়িত্ববোধ ও মানবিকতাবোধ তাকে তাড়িয়ে বেরিয়েছে । তিনি তাদের কষ্ট লাগবে নিজেকে নিয়োজিত করতে সচেষ্ট হন ।

তাই দেখি, দ্বিতীয় বর্ষে পড়াকালীন থেকেই তিনি সংসারের কিছু দায়ভার বহন করতে থাকেন । ছোট ভাই জাহিদুর রহমানকে ওয়েলেসলি স্ট্রিটের মেসে রেখে পড়াশোনার ব্যবস্থা করেন । মাঝে মাঝে সংসারের ব্যয় নির্বাহে টাকাও পাঠান ।

 

পূর্ণতার পথে । শিল্পী জয়নুল আবেদিন

 

তাই আমরা দেখি, নিবিষ্টমনে শিল্প শিক্ষার পাশাপাশি তিনি কিছু কমার্শিয়াল কাজে নিজেকে নিয়োজিত করেন। যেমন তিনি টেবিল ল্যাম্পের শেষ-চিত্রণ করতেন, হানাফি পত্রিকায় কার্টুন আঁকতেন। এরূপ আরও কাজ যখন যা পেতেন। শিল্পচর্চা ও কমার্শিয়াল কর্ম মিলে তাকে প্রচুর পরিশ্রম করতে হতো। এই পরিশ্রম ছিল তার কাছে ক্লান্তিহীন। এতে তিনি তৃপ্তি পেতেন। পরিবারকে সহযোগিতা করে তিনি সৃষ্টিশীল আনন্দ পেতেন। জয়নুলের এই মানবিক স্বভাবটি আজীবন অব্যাহত ছিল।

বলা যায়, ধীরে ধীরে তা বিকশিত হয়ে জাতীয় পর্যায়ে থিতু হয়। এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়েও তার মানবিকতাবোধ টনটেন ছিল । তার কর্মমুখর জীবন পর্যালোচনা করলে এ রকম অনেক দৃষ্টান্ত আমরা দেখবো । এমনকি ছবিতেও তার ব্যক্তি-স্বভাবটি মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়। মাটি ও মানুষের প্রতি দায়িত্ববোধ তার শিল্পচেতনার প্রধান বৈশিষ্ট্য । ছবিগুলো দেখলে আমরা একাত্ম হতে পারি, কেননা জয়নুলের ছবি মানে আমাদের ছবি ।

আরও দেখুনঃ

Leave a comment