আজকে আমরা আলোচনা করবো জয়নুলের পারিপার্শ্বিক। এটি শিল্পী জয়নুল আবেদিন এর জীবনী গ্রন্থমালা। জয়নুল আবেদিন বিংশ শতাব্দীর একজন বিখ্যাত বাঙালি চিত্রশিল্পী। পূর্ববঙ্গে তথা বাংলাদেশে চিত্রশিল্প বিষয়ক শিক্ষার প্রসারে আমৃত্যু প্রচেষ্টার জন্য তিনি শিল্পাচার্য উপাধি লাভ করেন।

জয়নুলের পারিপার্শ্বিক । শিল্পী জয়নুল আবেদিন
এতো স্নেহ আর প্রকৃতির ছায়ায় বসবাস করেও কিন্তু কষ্ট ছিল তাদের নিত্যসঙ্গী। বাবা পুলিশের চাকরি করে যে টাকা আয় করতেন তাতে সংসার চালানো ছিল কঠিন। জয়নুলের চাচা-জ্যেঠারা সবাই ব্যবসা করতেন আর তার বাবা দলছুট হয়ে পুলিশের চাকরিতে যোগদান করেন। বাবার কষ্টের সংসারে দারিদ্র্যের যে পরিচয় তিনি পেয়েছিলেন পরবর্তী জীবনে তার কর্মে এর প্রভাব পড়েছিল। আমরা দেখি, তার চিত্রকলার প্রধান ফোকাসই ছিল নিম্নবর্গ ও নিরন্ন মানুষ মানুষের জীবনের যন্ত্রণা তুলির আঁচড়ে যে বাস্তবতা তুলে ধরেছিল জয়নুল তা যাপিতজীবনের অভিজ্ঞতা থেকেই অর্জন করেছিলেন।
জয়নুলের পরিবারটি ছিল রক্ষণশীল। বাবা ছিলেন ধর্মপ্রাণ। আত্মীয়স্বজন কেউ শিল্পী ছিলেন না। আর আঁকিয়ে তো দূরের কথা। কেননা ছবি আঁকাকে তখন ধর্মীয়ভাবে নিষিদ্ধ মনে করা হতো। এমনই এক পরিবেশে জয়নুল মানসপটে ছবিই হলো ধ্যান ও জ্ঞান সবকিছুই তার কাছে চিত্রসম লাগতো। তন্ময় হয়ে তিনি পারিপার্শ্বিক থেকে পাঠ নিতে লাগলেন। তার দুর্দমীয় ইচ্ছার প্রতি তিনি সবসময়ই বিশ্বস্ত ছিলেন। তাই শীঘ্রই তিনি অনুকূল সাড়া পান।

স্কুলের শিক্ষকরাও তার ছবি আঁকাকে উৎসাহিত করতেন। এছাড়া কলকাতা আর্ট কলেজে পড়ুয়া কয়েকজন ছাত্রের সান্নিধ্যও তিনি পেয়ে যান । আর্ট কলেজের গল্প শুনে শুনে তিনি তার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা স্থির করে ফেলেন। তিনি স্বপ্ন দেখেন একদিন তিনিও আর্ট কলেজে ভর্তি হবেন। একদিন তো তিনি উধাও হয়ে যান। বাড়িতে উৎকণ্ঠা আর কান্নার রোল পড়ে যায়। কয়েকদিন পর ফিরে এসে তিনি জানান কলকাতা আর্ট কলেজ দেখে এসেছেন। শান্তশিষ্ট টুনুর এরূপ কাণ্ডে সবাই অবাক হয় ।
রক্ষণশীল পরিবার হলেও তাদের পরিবারটি চিন্তাভাবনায় যে কিছুটা এগিয়ে ছিল এর প্রমাণ পাই জয়নুলের ইচ্ছার প্রতি মা-বাবার সমর্থন দেখে। তারা ছেলেকে নিরুৎসাহিত করেননি। বরং তার ইচ্ছাকে বিকশিত হতে দিয়েছেন। একান্ত গৃহিণী মা নিজের অলঙ্কার বিক্রি করে জয়নুলকে আর্ট কলেজে ভর্তির ব্যবস্থা করেছিলেন। বলা যায়, পরিবারের সমর্থন পেয়েই জয়নুল পিছিয়ে পড়া মুসলিম সমাজ থেকে ওঠে এসে শিল্পের প্রাঙ্গণে প্রবেশ করতে পেরেছিলেন।

এ ছিল তৎকালীন মুসলিম সামাজিক বাস্তবতার পরিপ্রেক্ষিতে এক অনন্য উদাহরণ ও বিস্ময়। এরপর জয়নুল শুধু এগিয়ে গেছেন সাফল্যের গাথা রচনা করে । বাধা এসেছে, কিন্তু তাকে থামাতে পারেনি। আর জয়নুলের বিস্ময়কর কর্মকাণ্ড শুধুমাত্র ব্যক্তিক ছিল না, সমগ্রের উন্নতিতে তা সমন্বিত হয়। বলা যায় জয়নুল তার নিজের সাফল্যের চেয়ে দেশ ও জাতির সাফল্যকে বড় করে দেখেছিলেন। আজীবন তিনি তাই করে গেছেন ।
আরও দেখুনঃ