আজকে আমাদের আলোচনার বিষয়ঃ তিনি ছিলেন মহান। এটি শিল্পী জয়নুল আবেদিন এর জীবনী গ্রন্থমালা। জয়নুল আবেদিন বিংশ শতাব্দীর একজন বিখ্যাত বাঙালি চিত্রশিল্পী। পূর্ববঙ্গে তথা বাংলাদেশে চিত্রশিল্প বিষয়ক শিক্ষার প্রসারে আমৃত্যু প্রচেষ্টার জন্য তিনি শিল্পাচার্য উপাধি লাভ করেন।

তিনি ছিলেন মহান । শিল্পী জয়নুল আবেদিন
জয়নুল আবেদিন ছিলেন বড় মাপের শিল্পী। আর ছিলেন শিল্পী তৈরির কারিগর তিনি নিজে যেমন ছবি আঁকতে পছন্দ করতেন, তেমনি নতুন কেউ ছবি আঁকছে দেখে তৃপ্তি পেতেন। বাংলাদেশকে তিনি শিল্পীর তুলিতে আঁকা এক দেশ ভাবতেন । আর ভাবতেন শিল্পীরা এই দেশকে তাদের তুলিতে তুলে আনুক। দেশের রূপ, রস এবং রূঢ় বাস্তবতার ছবি ফুটে উঠুক । এই ভাবনা তিনি শুধু স্বপ্নেই দেখতেন না, নিরস্তর স্বপ্ন বাস্তবায়নে তৎপর ছিলেন।
জয়নুল আবেদিন নিজের অভিজ্ঞতায় জেনেছিলেন প্রাতিষ্ঠানিকভাবে শিল্পী হওয়ার তালিম পাওয়া এই পূর্ববঙ্গে তথা আজকের বাংলাদেশে কতো কঠিন ছিল। সারা পূর্ববাংলায় ছবি আঁকার কোনো জাতীয় প্রতিষ্ঠান ছিল না। উপরন্ত এখানকার রক্ষণশীল সমাজে ছবি আঁকা গর্হিত কাজ বলে বিবেচিত হতো। আর যারা এইসব বাধাবিঘ্ন কাটিয়ে শিল্পী হওয়ার দৃঢ় বাসনা পোষণ করতেন, তাদের সুদূর কোথায়ও গমন করতে হতো। যেমন আমাদের এই প্রিয় শিল্পী জয়নুল আবেদিন শিল্পী হওয়ার জন্য কলকাতায় গমন করেছিলেন।

তিনি শুধু একজন শিল্পীই ছিলেন না, ছিলেন একজন নির্মাতা । জাতি নির্মাণে তিনি শৈল্পিক পরিসরে যেসব কাজ সমাধা করে গেছেন পরবর্তী প্রজন্ম হিসেবে আমরা তার প্রাপ্তি ভোগ করে চলেছি। তিনি বাংলাদেশের মানুষের মনন নির্মাণে অনন্যসাধারণ ভূমিকা রেখেছেন। এই যে আজ ঢাকা শহরে এতো আর্ট গ্যালারি, জেলায় জেলায় আর্ট স্কুল কিংবা কলেজ। পেইন্টিং, ভাস্কর্য, স্থাপত্য নিয়ে চিন্তাভাবনার অবিরাম স্রোত; ছবি বিষয়ক বইপত্র। এসবের নেপথ্যের ভিত কিন্তু জয়নুল আবেদিন। তিনি আমাদের জীবনের সঙ্গে এসবের সংযোগ ঘটিয়ে দিয়েছেন ।
শিল্পী জয়নুল আবেদিন ঔপনিবেশিক ভারতে জন্মেছিলেন। উপনিবেশবাদের গ-ানির মধ্যে তিনি বেড়ে উঠেছিলেন। বিরুদ্ধ বাতাবরণে তার শৈশব-কৈশোর অতিবাহিত করেন এবং শিল্পী জীবনের বিকাশ সাধন করেন তার এই পথচলায় প্রতি মুহূর্ত ছিল দ্বন্দ্বমুখর। নিজের বিরুদ্ধে নিজেকে যুদ্ধ করতে হয়েছে । তেমনি নিজের পারিপার্শ্বিকের সঙ্গে বোঝাপড়া করতে হয়েছে। এ এক ভয়ংকর যুদ্ধ।

একদিকে নিজের বোধ, স্বজাতির প্রতি ভালোবাসা, দেশজ বাস্তবতা ও শিল্প-ঐতিহ্যের প্রতি সুদৃঢ়তা অন্যদিকে উনুল ঔপনিবেশিক নান্দনিকতা এবং কৃত্রিম আভিজাত্য। এই দুই পক্ষ থেকে একটি পক্ষ তাকে বেছে নিতে হবে । তিনি কঠিন পথটিই বেছে নিলেন । নিজের অস্তিত্বসংলগ্ন বাস্ত বতাকে শিরোধার্য করে তিনি শিল্পের অভিযাত্রী হন। এবং তিনি বিজয়ী হন ।
১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দে ব্রিটিশ উপনিবেশ অবসান হওয়ার সন্ধিক্ষণে তিনি জ্বলজ্বলে এক শিল্পীর মর্যাদায় অধিষ্ঠিত। তার শিল্প-প্রতিভার আতা তখন সমগ্র ভারতীয় উপমহাদেশে দেদীপ্যমান। এমনই এক শৈল্পিক অর্জন নিয়ে তিনি কলকাতা থেকে নিজ বাসভূমে ফিরে আসেন। তার দেশ তখন পাকিস্তান। আর পূর্ব পাকিস্তানে তার জন্মভূমি। তার জন্মভূমিতে প্রাতিষ্ঠানিক কোনো শিল্পচর্চা কেন্দ্র নেই। এ ব্যাপারটি তিনি মেনে নিতে পারেননি। তিনি প্রতিষ্ঠান নির্মাে ব্রতী হলেন। তা ছিল এক কঠিন চ্যালেঞ্জ।

কর্তৃপক্ষ শিল্প প্রতিষ্ঠানের বাস্তবতাই বুঝতে পারছে না, আর মানুষজন এ ব্যাপারটি নিয়ে অজ্ঞতাই প্রকাশ করে । উপরন্তু বুঝদার মানুষদের কাছেও আশানুরূপ উৎসাহ পাননি। ফলে তাকে ব্যাপক এক সাংগঠনিক তৎপরতায় অবতীর্ণ হতে হয়। প্রচণ্ড ইচ্ছাশক্তি ও লক্ষ্যের সাধুতার জন্য তিনি জয়ী হন। এই ভূখণ্ডে তিনি প্রাতিষ্ঠানিক শিল্পচর্চা কেন্দ্র গড়ে তোলেন।
এখানে তিনি থেমে থাকলেন না। বাংলাদেশের লোকঐতিহ্য সংরক্ষণ ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সামনে তুলে ধরার জন্য প্রতিষ্ঠা করলেন লোকশিল্প জাদুঘর, যা মধ্যযুগে বাংলার রাজধানী সোনারগাঁওয়ে অবস্থিত। আর তার আরেক কীর্তি হলো ময়মনসিংহ শহরে স্থাপিত জয়নুল আবেদিন চিত্রশালা ।
আরও দেখুনঃ
