হোয়াট ইজ আর্ট পর্ব ২০ – [ বিজ্ঞান ও শিল্পের সম্পর্ক। ভ্রান্ত বিজ্ঞান। অকিঞ্চিৎকর বিজ্ঞান। বিজ্ঞান হবে মানব জীবনের বৃহৎ সমস্যাকেন্দ্রিক এবং শিল্পের ভিত্তিভূমি। ]

হোয়াট ইজ আর্ট পর্ব ২০
উপসংহার
শিল্প সম্পর্কীয় আমার প্রিয় বিষয়টি পনেরো বৎসর কাল ব্যাপী সাধনায় আমার শ্রেষ্ঠ শক্তি নিয়োগ করে আমি সমাপ্ত করেছি। এই বিষয়টি পনেরো বৎসর পর্যন্ত আমাকে কর্মব্যস্ত রেখেছিল-এই কথা আমি এই অর্থে ব্যবহার করিনি যে, পনেরো বৎসর ধরে আমি ইে বই লিখে আসছি।
বরং এ কথাই বলতে চেয়েছি যে, পনেরো বৎসর আগে আমি শিল্প সম্পর্কে যখন লিখতে শুরু করি,-ভেবেছিরাম, একবার যখন এই কাজে হাত দিয়েছি, তখন কোন প্রকার বিরতি ছাড়াই তা সম্পূর্ণ করব। কিন্তু বাস্তব ক্ষেত্রে দেখা গেল, বিষয়টি সম্পর্কে আমার দৃষ্টিভঙ্গি এতখানি অস্বচ্ছ ছিল যে, আমার বিবেচনায় সন্তোষজনকভাবে আমি সেগুলিকে বিন্যস্ত করতে পারিনি। সে সময় থেকে বিষয়টি নিয়ে আমার চিন্তার কোন ছেদ পড়েনি, এবং আমি বিষয়টির ওপর ছয়বার কি সাতবার নতুন করে লেখা আরম্ভ করি। কিন্তু প্রতিবারই বৃহৎ একটা অংশ লেখার পর আমি উপলব্ধি করি যে, আমার আরদ্ধ কর্মকে সন্তোষজনক পরিণামমুখী করতে আমি অসমর্থ হয়েছি।
এ কারণে কাজটিকে আমার এক পাশে সরিয়ে রাখতে হয়েছে। এখন সে কর্মটি আমি সমাপ্ত করেছি। আমার পরিসমাপ্ত কর্মটি সু-সম্পাদিত হোক না হোক, আমার প্রত্যাশা এই যে, আমাদের সমাজে শিল্পের প্রবণতা এবং গতি যে ভ্রান্ত পথের অভিমুখী, সে ভ্রান্ত পথ অনুসরণের কারণ এবং শিল্পের প্রকৃত লক্ষ্য বিষয়ে আমার মৌলিক চিন্তা ভ্রান্তিহীন, -সুতরাং আমার রচনাটি সেইদিক দিয়ে মূল্যহীন বিবেচিত হবে না।
কিন্তু আমার আশা ফলবতী হওয়ার জন্যে এবং শিল্প যাতে তার ভ্রান্ত পথ পরিত্যাগ করে ও নতুন লক্ষ্যের দিকে অগ্রসর হয় সে জন্যে আরও একটি সমান গুরুত্বপূর্ণ আত্মিক মানবিক ক্রিয়া বিজ্ঞান-যার ওপর শিল্পও নিবিড়ভাবে নির্ভরশীল-সেই বিজ্ঞানেরও শিল্পের অনুরূপ বর্তমানে অনুসৃত ভ্রান্তপথ বর্জন করা বাঞ্ছনীয়।
বিজ্ঞান ও শিল্প ফুস্ফুস্ এবং হৃদপিন্ডের মতো নিকট সম্পর্কে সংযুক্ত। এ কারণে একটি অঙ্গ দূষিত হলে অপরটিরও যথাযথভাবে কাজ করতে পারে না। বিশুদ্ধ বিজ্ঞান অনুসন্ধানের সাহায্যে নির্দিষ্ট কাল এবং সমাজ-বিবেচিত খুবই গুরুত্বপূর্ণ সত্য এবং জ্ঞানকে মানব-চেতনার সম্মুখীন করে। শিল্প এ সমস্ত সত্যকে বোধেল জগৎ থেকে আবেগের জগতে সঞ্চারিত করে। সুতরাং বিজ্ঞান-নির্বাচিত পথ ভ্রান্ত হলে শিল্প- অনুসৃত পথও ভ্রান্ত হবে। বিজ্ঞান ও শিল্প এক বিশেষ ধরনের নোঙর-সম্বলিত (কবফমব-ধহপযড়ৎং) বজরার মতো। এ ধরনের বজরা আমাদের নদীগুলিতে এক সময় যাতায়াত করত।
বিজ্ঞান নোঙরগুলিকে উজানের দিকে নেওয়া তরীর মতো-যে নোঙরগুলি তরীগুলিকে সুরক্ষিত করত এবং তার সম্মুখগতি সুনিশ্চিত করত। অপরপক্ষে শিল্প চরকি-কলের মতো বজরাকে নোঙরের দিকে আকর্ষণ করে। বস্তুতপক্ষে এরই দ্বারা ঘটে সম্মুখ-গতির সঞ্চার। সুতরাং বিজ্ঞানের ভ্রান্ত কার্যকলাপ অনিবার্যত অনুরূপ ভ্রান্ত শিল্পক্রিয়ার সৃষ্টি করে।
সকল শিল্পের বৈশিষ্ট্য সর্বপ্রকার অনুভূতির সঞ্চারণ হলেও, স্বীকৃত গুরুত্বপূর্ণ অনুভূতি- সঞ্চারক না হলে সীমাবদ্ধ অর্থে আমরা কোন বস্তুকে শিল্প বলে অভিহিত করি না। তেমনি সকল বিজ্ঞান সাধারণভাবে সর্বপ্রকারের সম্ভাব্য জ্ঞানের সঞ্চারক হলেও, শব্দটির সীমিত অর্থে স্বীকৃত গুরুত্বপূর্ণ জ্ঞান-সঞ্চারক বস্তুকেই আমরা বিজ্ঞান বলে অভিহিত করি।
শিল্প-সঞ্চারিত অনুভূতি এবং বিজ্ঞান-সঞ্চারিত তথ্য উভয়ের গুরুত্বের পরিমাণ নির্দিষ্ট কোন সময় এবং সমাজের ধর্মীয় উপলব্ধির দ্বারা মীমাংসিত হয়। অর্থাৎ নির্দিষ্ট সময়ের অথবা সমাজের জীবনধৃত সর্বজনিক লক্ষ্যের উপলব্ধির দ্বারাই মীমাংসিত হয়।

সে লক্ষ্য সাধনের সর্বাপেক্ষা অধিক সহায়ক বিষয়কে সর্বপ্রযত্নে অনুধাবন করতে হবে; সে লক্ষ্য সাধনে স্বল্প সহায়ক বিষয়ের প্রতি কম মনোযোগী হতে হবে; আর মানবজীবনের লক্ষ্য সাধনে আদৌ সহায়তা করে না এমন বিষয়কে পুরোপুরি উপেক্ষা করতে হবে। সে বিষয়ে পর্যবেক্ষণ করা হলেও সে প্রয়াসকে বিজ্ঞান বলে স্বীকার করা চলবে না।
মানবিক জ্ঞান এবং মানবজীবনের প্রকৃতিও এরূপ বলে এই ধারা সব সময় চলে আসছে এবং এই রকম চলাই উচিত। কিন্তু আমাদের যুগের অভিজাত শ্রেণীর লোকদের বিজ্ঞান কোন ধর্মকেই শুধু যে অস্বীকার করে তাই নয়, বরং ধর্ম মাত্রকেই কুসংস্কার বিবেচনা করায় পূর্বের মতো এখনও এই ধরনের পার্থক্য নির্ণয়ে অক্ষম।
আমাদের কালের বিজ্ঞানীরা সব কিছুই নিরপেক্ষভাবে সমীক্ষা করেন বলে দৃঢ়তার সঙ্গে ঘোষণা করেন। কিন্তু ‘সব কিছু’ কথাটি বস্তুতপক্ষে সীমাহীন বস্তুপুঞ্জের অর্থজ্ঞাপক বলে ‘সব কিছু’ বললে খুব বেশি করে বলা হয়। সুতরাং সমানভাবে সব কিছুর সমীক্ষা অসম্ভব। বস্তুতপক্ষে শুধু তত্ত্বের দিক থেকে বলা হলেও কার্যক্ষেত্রে সব কিছু সমীক্ষা করা অসম্ভব। সে সমীক্ষা নিরপেক্ষভাবে করা তো হয়ই না, বরং একমাত্র সে বস্তুরই সমীক্ষা করা হয় একদিকে যার খুবই চাহিদা আছে এবং যারা বিজ্ঞান নিয়ে ব্যাপৃত তাদের কাছে সর্বাধিক প্রীতিপ্রদ।
বিজ্ঞান নিয়ে ব্যাপৃত অভিজাত শ্রেণীর ব্যক্তিদের সর্বাপেক্ষা অভিপ্রেত বিষয় হল এমন পদ্ধতির সংরক্ষণ-যার সাহায্যে তারা নিজেদের বিশেষ সুবিধাগুলি অক্ষুণ্ণ রাখতে পারেন। যে সমস্ত বস্তু অলস-কৌতূহল চরিতার্থ করে, বৃহৎ কোন মানসিক প্রয়াস দাবি করে না এবং বাস্তবক্ষেত্রের যার প্রযুক্তি সম্ভব সেগুলিই তাদের নিকট সর্বাধিক প্রীতিপ্রদ।
সুতরাং ধর্মতত্ত্ব ও দর্শন সহ প্রচলিত সমাজবিন্যাসের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বিজ্ঞানের এক অংশ এবং একই পর্যায়ের ইতিাহসও অর্থনীতি-একমাত্র প্রচলিত সমাজবিন্যাসই স্থায়ী হওয়া উচিত বলে প্রমাণ করতে ব্যাপৃত। এই সমাজবিন্যাসের উদ্ভব এবং অস্তিত্ব রক্ষার মূলে এমন সমস্ত নিয়ম ক্রিয়াশীল-মানুষের ইচ্ছায় যার পরিবর্তন ঘটানো সম্ভব নয়। সুতরাং এ সমস্ত নিয়ম পরিবর্তনের সকল প্রয়াসই অনিষ্টকর এবং ভ্রান্ত।
অংকশাস্ত্র, জ্যোতির্বিজ্ঞান, রাসায়ন, পদার্থবিদ্যা, উদ্ভিদবিদ্যা এবং প্রাকৃতিক বিজ্ঞান সমূহ-যা পরীক্ষামূলক বিজ্ঞান নামক অপর অংশের অন্তর্ভূক্ত, সেগুলি মানবজীবনের লক্ষ্যের সঙ্গে প্রত্যক্ষ সম্পর্কহীন বস্তু নিয়ে সর্বক্ষণ ব্যাপৃত। এ সব বিজ্ঞান অদ্ভুত বিষয়সমূহ এবং এমন সব বস্তু নিয়ে ব্যাপৃত যার বাস্তব প্রয়োগ হলে অভিজাত শ্রেণীরাই লাভবান হতে পারেন।
সমীক্ষার নির্বাচিত বিষয় সমূহকে সমর্থন করবার জন্য (যা তাদের নিজস্ব স্থিতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ) আমাদের যুগের বিজ্ঞানীরা একটি কাজ করেছেন। সেটি হল, শুধু ‘বিজ্ঞানের জন্যই বিজ্ঞান’-এরূপ একটি তত্ত্ব খাড়া করেছেন যা ‘শিল্পের জন্যই শিল্প’ মতবাদের অনুরূপ।
‘যা কিছু আমাদের আনন্দ দেয় তাই শিল্প’-কলা কৈবল্যবাদী মতবাদ দ্বারা একথা যেমন প্রমাণিত হয়, তেমনি আমাদের কৌতূহল উদ্রেককারী বস্তুর সমীক্ষা মাত্রই বিজ্ঞান- বিজ্ঞানের জন্য বিজ্ঞান তত্ত্ব দ্বারাও এ কথাই প্ৰতীয়মান হয়।
এ অবস্থায় বিজ্ঞানের একটি অংশ মানুষ কিভাবে জীবনের লক্ষ্য চরিতার্থ করবার জন্য বেঁচে থাকবে-এই সমীক্ষার পরিবর্তে আমাদের জীবন-পরিবেশে যে অশুভ এবং মিথ্যা বিন্যাস বিদ্যমান-তাকে ন্যায়সঙ্গত এবং অপরিবর্তনীয় বলে প্রমাণিত করে। বিজ্ঞানের অপর অংশ অর্থাৎ পরীক্ষামূলক বিজ্ঞান শুধুমাত্র সহজ কৌতূহল এবং প্রয়োগ- কৌশলগত সমুন্নতি নিয়েই ব্যাপৃত।
বিজ্ঞানের এই শ্রেণী-বিভাগের মধ্যে প্রথমটি যে হানিকর সে শুধু এই কারণেই নয় যে, তা মানুষের বোধশক্তিকে বিভ্রান্ত করে মানুষকে ভ্রান্ত সিদ্ধান্তের দিকে পরিচালিত করে, বরং শুধুমাত্র স্বীয় অস্তিত্বের দ্বারা প্রকৃত বিজ্ঞানের স্থান অধিকার করেছে বলেও তা হানিকর। সে ক্ষতির স্বরূপ এই : জীবনের সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ জিজ্ঞাসার সম্মুখীন হবার জন্য প্রত্যেক মানুষকে প্রথমেই যুগ যুগ ব্যাপী মানুষের জীবনের প্রত্যেকটি অনিবার্য প্রশ্নের চতুর্দিকে পুঞ্জীভূত এবং সকল প্রকার মানবীয় উদ্ভাবন শক্তির সাহায্যে পুষ্ট মিথ্যাকে অস্বীকার করতে হবে।
দ্বিতীয় যে বিভাগ সম্পর্কে বর্তমান বিজ্ঞান বিশেষভাবে অহমিকার ভাব পোষণ করে এবং বহু ব্যক্তির নিকট যা একমাত্র প্রকৃত বিজ্ঞান বলে বিবেচিত-তাও হানিকর, যেহেতু তা যথার্থ গুরুত্বপূর্ণ বিষয় থেকে অকিঞ্চিৎকর বিষয়ের দিকে মানুষের চিত্তকে বিক্ষিপ্ত করে। এই শ্রেণীর বিজ্ঞান প্রত্যক্ষভাবেও যে হানিকর তার কারণ, সমাজের বর্তমান অন্যায় ব্যবস্থায়-(যে ব্যবস্থাকে প্রথম শ্রেণীর বিজ্ঞান ন্যায়সঙ্গত বলে সমর্থন করে)- বৈজ্ঞানিক প্রয়োগগত সুফলগুলি সমস্ত মানবজাতির কল্যাণে নিয়োজিত না হয়ে ক্ষতিরই কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
বাস্তবিক পক্ষে শুধুমাত্র এই ধরনের সমীক্ষায় আত্মনিবেদিত ব্যক্তির নিকটেই এটা মনে হয়, যেন প্রাকৃতিক বিজ্ঞান-জগতে সমস্ত আবিষ্কার মাত্রই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং প্রয়োজনীয়। এ সমস্ত ব্যক্তি নিজের পারিপার্শ্বিকের দিকে যখন দৃষ্টিপাত করেন না, এবং প্রকৃত গুরুত্বপূর্ণ বস্তু কী -তা উপলব্ধি করেন না, তখনই তাদের এরূপ মনে হয়। যে মনস্তাত্ত্বিক আনুবীক্ষণিক দৃষ্টির সাহায্যে তাঁরা পরীক্ষানিরীক্ষা চালান, তাদের একমাত্র কর্তব্য তার থেকে নিজেকে সবলে বিযুক্ত করা এবং চারিদিকে চোখ মেলে দেখা।
তা হলেই তারা বুঝতে পারবেন, কী সব অকিঞ্চিৎকর বিষয় নিয়ে তারা শিশুসুলভ গর্ব অনুভব করেন। অর্থাৎ বুঝতে পারবেন, যে জ্ঞান আমরা হেলায় বর্জন করেছি এবং ধর্মতত্ত্ব, আইনশাস্ত্র, রাষ্ট্রনীতি এবং অর্থশাস্ত্র ইত্যাদির অধ্যাপকদের হাতে বিকৃতি-কবলিত হতে দিয়েছি, তার তুলনায় তাঁদের (বিজ্ঞানীদের) বহুমাত্ৰিক জ্যামিতি, ছায়াপথের বর্ণালী বিশ্লেষণ, আনবিক গঠন, প্রস্তর যুগের মানুষের খুলির আয়তন, এবং ওই জাতীয় নানা নগণ্য বিষয়সমূহের জ্ঞানই শুধু নয়,-এমনকি জীবাণুবিদ্যার, রঞ্জনরশ্মি ইত্যাদির জ্ঞানও কত অকিঞ্চিৎকর।
আমরা আমাদের চতুর্দিকে দৃষ্টিনিক্ষেপ করলেই হৃদয়ঙ্গম করতে পারব যে, প্রকৃত বিজ্ঞানের সঙ্গত কাজ কৌতূহলোদ্দীপক বস্তুমাত্রেরই সমীক্ষা নয়, বরং যে উপায়ে মানুষের জীবন প্রতিষ্ঠিত হওয়া উচিত তার অনুধ্যান-অর্থাৎ ধর্মের, নীতির এবং সামাজিক জীবনের সে সমস্ত জিজ্ঞাসার অনুসন্ধান যার মীমাংসা ব্যতীত প্রকৃতি-বিষয়ক আমাদের সকল জ্ঞান হানিকর অথবা তুচ্ছ।
আমরা খুবই গর্ব এবং আনন্দ অনুভব করি যে, আমাদের বিজ্ঞান ঝলপ্রপাতের শক্তিকে সদ্ব্যবহার করা এবং কলকারখানার কাজে নিয়োজিত করা সম্ভব করেছে, এবং তার সাহায্যে আমরা পর্বত বিদীর্ণ করে সুড়ঙ্গপথ নির্মাণে সমর্থ হয়েছি, ইত্যাদি।
কিন্তু পরিতাপের কথা এই যে, আমরা সে জলপ্রপাতের শক্তিকে কাজে লাগিয়েছি শ্রমিকদের হিতার্থে নয়, বরং বিলাসদ্রব্য উৎপাদনকারী পুঁজিবাদীদের অথবা মানববিধ্বংসী যুদ্ধাস্ত্র নির্মাণকারীদের আরও ঐশ্বর্যশালী করে তুলবার জন্য। যে ডিনামাইটের সাহায্যে সুড়ঙ্গপথ নির্মাণের জন্য আমরা পর্বত বিদীর্ণ করেছি, যে ডিনামাইটকে আমরা যুদ্ধের কাজেও ব্যবহার করি। এই শেষোক্ত কাজ থেকে বিরত থাকতে আমরা যে শুধু অনিচ্ছুক তাই নয়, বরং এরূপ কাজকে অনিবার্য বিবেচনা করে অবিচ্ছিন্নভাবে তারই জন্য প্রস্তুত হয়ে চলি।
আমরা হয়ত এখন ডিপথেরিয়ার জীবাণুকে প্রতিষেধক হিসেবে টীকা দিতে সক্ষম হয়েছি, রঞ্জনরশ্মির সাহায্যে শরীরের ভিতরকার একটি ছুঁচও দেখতে পাই, কুব্জকে ঋজু করতে পারি, উপদংশ রোগকে নিরাময় করতে পারি এবং আশ্চর্য অস্ত্রোপচারে সক্ষম হয়েছি।
তা সত্ত্বেও প্রকৃত বিজ্ঞানের যথাযথ লক্ষ্য উপলব্ধি করলে এ সমস্ত অর্জিত কৃতিত্ব নিয়ে (যদি তা তর্কাতীতভাবে প্রমাণিত হয়ও) আমাদের গর্বিত হওয়া উচিত নয়। বিশুদ্ধ কৌতূহলোদ্দীপক বস্তুর পিছনে অথবা নিছক বাস্তব প্রয়োগমূলক প্রকৃত বিজ্ঞানের জন্য ব্যয়িত হত, তাহলে বর্তমান যে সব রুগীদের মধ্যে অতি সামান্য সংখ্যক ব্যক্তি হাসপাতালে আরোগ্য লাভ করে,-তাদের অর্ধেকের বেশি রোগমুক্ত থাকত।
কারখানার পরিবেশে রক্তশূন্য বা বিকৃত শিশুরা বেড়ে উঠত না, শিশুমৃত্যু বর্তমান কালের মতো শতকরা পঞ্চাশ ভাগ হত না, এবং বর্তমান বিজ্ঞান মূর্খতা এবং দুঃখের ভয়াবহতাকে যে মানবজীবনের একটা প্রয়োজনীয় অবস্থা বিবেচনা করে-তার অস্তিত্বও থাকত না।
আমরা বিজ্ঞানের ধারণাকে এতটা বিকৃত করেছি যে, যদি বলা হয়, শিশুমৃত্যু, বেশ্যাবৃত্তি, উপদংশ রোগ, সমস্ত জাতির অধোগতি, এবং মানুষের সামগ্রিক হত্যার নিবারণ করাই বিজ্ঞানের কর্তব্য, তবে তা আমাদের যুগের মানুষের কাছে অদ্ভুত মনে হবে।
বিজ্ঞান আমাদের নিকট প্রকৃত বিজ্ঞান বলে প্রতীয়মান হয় -যখন কোন ব্যক্তি রসায়নাগারে এক পাত্র থেকে আর একটি পাত্রে তরল দ্রব্য ঢালে, অথবা বৰ্ণালী বিশ্লেষণ করে, অথবা ব্যাঙ্ বা শুশুক জাতীয় প্রাণী-বিশেষকে ব্যবচ্ছেদ করে, কিংবা বৈশিষ্ট্যপূর্ণ বৈজ্ঞানিক মিশ্র ভাষায় প্রচলিত বাগ্বৈশিষ্ট্যের অস্পষ্ট জাল বোনে। অধিবিদ্যাগত, দার্শনিক, ঐতিহাসিক, মামলা-মকদ্দমার বিচার সম্পর্কীয়, অথবা রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক-যা সে ব্যক্তির নিজের নিকটও অর্ধস্পষ্ট এবং যার উদ্দেশ্য যা আছে তাই থাকা উচিত -এটা প্ৰদৰ্শন।
কিন্তু বিজ্ঞান, যথার্থ বিজ্ঞান,-সেই জাতীয় বিজ্ঞান যা প্রকৃতই সম্মানের অধিকারী-যে সম্মান এখন বিজ্ঞানের মতো এক (সব চাইতে কম গুরুত্বপূর্ণ) অংশের অনুবর্তীরা দাবি করেন-তা একেবারেই ওই প্রকৃতির নয়। প্রকৃত বিজ্ঞান হচ্ছে এইটি জানা -আমাদের কি বিশ্বাস করা উচিত, কিভাবে উচিত নয়; যৌন সম্পর্ককে কিভাবে দেখতে হবে, শিশুদের কিভাবে শিক্ষা দেওয়া উচিত, ভূমির ব্যবহার কেমন হবে, অপরকে নির্যাতন না করে কিভাবে নিজের চেষ্টায় কর্ষণ করা যায়, বিদেশীদের এবং পশুদের প্রতি আচরণ কি রকম হওয়া উচিত এবং মানুষের জীবনের পক্ষে গুরুত্বপূর্ণ আরও অনেক কিছু।
প্রকৃত বিজ্ঞান চিরকালই এই প্রকার এবং তা এই রকমই হওয়া উচিত। আমাদের যুগে এই পর্যায়ের বিজ্ঞানেরই অভ্যুদয় ঘটেছে। কিন্তু একদিকে সমাজের স্থিতাবস্থায় সমর্থক বৈজ্ঞানিকদের দ্বারা এই প্রকৃত বিজ্ঞান অস্বীকৃত এবং খন্ডিত, অপরদিকে পরীক্ষামূলক বিজ্ঞান-সাধকদের নিকট এই ধরনের বিজ্ঞান অন্তঃসারশূন্য, অপ্রয়োজনীয় এবং অবৈজ্ঞানিক বলে বিবেচিত।
উদাহরণ স্বরূপ বলা যায়, গির্জা-মতবাদ বর্তমানে যে অপ্রচলিত এবং অবাস্তব তা দেখাবার জন্য বিভিন্ন গ্রন্থ এবং উপদেশসমূহের আবির্ভাব ঘটছে যাতে আমাদের যুগোযোগী যুক্তিগ্রাহ্য, ধর্মীয় উপলব্ধিকে স্বচ্ছভাবে ব্যাখ্যা করবার প্রয়োজনীয়তার কথাও বলা হচ্ছে।

যে অধিবিদ্যাকে প্রকৃত বিজ্ঞান মনে করা হয়, তা কেবলমাত্র এ সমস্ত গ্রন্থকে খন্ডন করবার কাজে ব্যাপৃত এবং যে সমস্ত কুসংস্কার দীর্ঘকাল থেকে অপ্রচলিত এবং বর্তমানে অর্থহীন, সেগুলির সমর্থন এবং যৌক্তিকতা প্রতিপাদনে এই অধিবিদ্যায় মানববুদ্ধিকে পুনঃ পুনঃ নিয়োগ করা হচ্ছে। অথবা ধরুন, একটি ধর্মদেশনার আবির্ভাব ঘটল-যাতে বলা হচ্ছে, ভূমির ব্যক্তিগত মালিকানা অন্যায় এবং ভূমিসংক্রান্ত ব্যক্তিগত মালিকানার প্রতিষ্ঠানটি জনসাধারণের দারিদ্র্যের মুখ্য কারণ। স্বভাবতই প্রকৃত বিজ্ঞানের কর্তব্য, এ রকম ধর্মদেশনাকে স্বাগত জানানো এবং এই প্রতিপাদ্য থেকে আরও কিছু সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা।
কিন্তু আমাদের যুগের বিজ্ঞান এই ধরনের কিছুই করে না : পরন্তু রাষ্ট্রনৈতিক-অর্থনীতি বিপরীত সিদ্ধান্তের নির্দেশ দেয়। যেমন, অপরাপর সব রকমের সম্পত্তির মতো ভূমিজ সম্পত্তিও খুব স্বল্প সংখ্যক মালিকের হাতে উত্তরোত্তর অধিক পরিমাণে অবশ্যই কেন্দ্রীভূত হওয়অ উচিত।
আবার অনুরূপভাবে কেউ মনে করতে পারেন, প্রকৃত বিজ্ঞানের কাজ হল যুদ্ধ এবং হত্যার অযৌক্তিকতা, লাভহীনতা এবং অনৈতিকতা প্রদর্শন করা, অথবা বেশ্যাবৃত্তির অমানবিকতা এবং অনিষ্টকারিতা, অথবা মাদকদ্রব্য ব্যবহার এবং পশুমাংস ভক্ষণের চরম বুদ্ধিহীনতা, অনিষ্টকারিতা এবং অনৈতিকতা প্রদর্শন, অথবা স্বাদেশিকতার অযৌক্তিকতা, অনিষ্টকারিতা অথবা সেকেলে মনোভাব প্রদর্শন।
যদিও এ ধরনের গ্রন্থের অস্তিত্ব বিদ্যমান আছে, তথাপি সেগুলি সবই অবৈজ্ঞানিক বলে বিবেচিত অপরপক্ষে যে সমস্ত গ্রন্থ এ সব ব্যাপারের ওচিত্য প্রমাণের উদ্দেশ্যে রচিত এবং যার লক্ষ্য মানবজীবনের সঙ্গে সম্পর্কহীন শুধুমাত্র অলস জ্ঞানতৃষ্ণার পরিতৃপ্তি-তাকেই বৈজ্ঞানিক বলে বিবেচিত করা হয়।
প্রকৃত লক্ষ্য থেকে আমাদের যুগের বিজ্ঞান যেভাবে বিচ্যুত হয়েছে কতিপয় বিজ্ঞানী- উপস্থাপিত আদর্শের সাহায্যে তা উজ্জ্বলভাবে দেখানো যেতে পারে এবং অধিকাংশ বৈজ্ঞানিক মনোভাবাপন্ন মানুষই সে আদর্শকে অস্বীকার না করে বরং স্বীকৃতি জানিয়েছেন।
এক হাজার বা তিন হাজার বৎসর পরে পৃথিবীর রূপ কি হবে তার বর্ণনা দিয়ে মুর্খতাপূর্ণ ফ্যাশনবিলাসী গ্রন্থে এ সমস্ত আদর্শের শুধু যে অভিব্যক্তি দেওয়া হয়েছে তা নয়, যে সমস্ত সমাজতাত্ত্বিক নিজেদের চিন্তাশীল বিজ্ঞান-চেতনাসম্পন্ন মানুষ বিবেচনা করেন, তারাও এরূপ আদর্শ প্রচার করেছেন। এই আদর্শগুলি হল, কৃষিকার্য দ্বারা ভূমি থেকে খাদ্য প্রাপ্তির পরিবর্তে খাদ্য তৈরি হবে রসায়নাগারে, এবং প্রাকৃতিক শক্তির সদ্ব্যবহারের সাহায্যে মানবিক শ্রমকে প্রায় সম্পূর্ণভাবে বাতিল করা যাবে।
বর্তমানের মতো ভবিষ্যতের মানুষ পোষা মুরগির ডিম খাবে না, কিংবা নিজের ক্ষেতের শস্যজাত পাউরুটি খাবে না, অথবা তার বাগানের গাছের আপেল খাবে না,-যে গাছে ফুল ফোটা থেকে ফল সুপক্ক হওয়া পর্যন্ত সে নিজে চোখে দেখেছে; বরং যে খাদ্য গবেষণাগারে সংযুক্ত শ্রমের সাহায্যে প্রস্তুত হয়, এবং যে শ্রমের খুব ক্ষুদ্র পরিমাণ অংশমাত্র সে বহন করে-সেই স্বচ্ছ পুষ্টিকর খাদ্য সে আহার করবে। ভবিষ্যতে মানুষের পরিশ্রম করবার প্রায় প্রয়োজনই হবে না এবং বর্তমানে অভিজাত প্রশাসক শ্রেণীর মানুষ যে আলস্যের স্রোতে গা ঢেলে দেয়, তেমনি সকল মানুষই সে আলস্য-বিলাসে সমর্থ হবে।
আমাদের যুগের বিজ্ঞান কি পরিমাণে সত্যপথ-বিচ্যুত-এ সব আদর্শের মধ্যে তা যেমন স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান, তেমন আর কিছুতে নয়।
আমাদের যুগের অধিকাংশ মানুষ উত্তম এবং সুপ্রচুর খাদ্য পায় না (বাসগৃহ, পোশাক পরিচ্ছদ এবং জীবনের প্রাথমিক প্রয়োজনীয় বস্তুও পায় না)। অধিকাংশ মানুষ নিজস্ব স্বার্থের হানি হওয়া সত্ত্বেও ক্রমাগতই শক্তির অতীত পরিশ্রম স্বীকারে বাধ্য হয়। এই উভয় অমঙ্গলকে খুব সহজেই অপসারিত করা সম্ভব পারস্পরিক দ্বন্দ্ব, বিলাসিতা, এবং অন্যায় বিত্ত বন্টন-এক কথায় মিথ্যা অনিষ্টকর সমাজবিন্যাস বাতিল করে একটা যুক্তিপূর্ণ মানবিক জীবনরীতি প্রতিষ্ঠার সাহায্যে।
কিন্তু বিজ্ঞান প্রচলিত সমাজবিন্যাসকে গ্রন্থগুলির গতির মতো অপরিবর্তনীয় বিবেচনা করে, এবং সে কারণে এরূপ ধঅরণাও করে যে, বিজ্ঞানের কাজ এ ভ্রান্ত সমাজ-ব্যবস্থাকে বিশদ করা নয়, এবং একটা নতুন যুক্তিপূর্ণ জীবনরীতির আয়োজনও নয়,-বরং প্রচলিত সমাজ-ব্যবস্থার মধ্যেই সমস্ত লোকের আহার সংস্থান করা এবং দুষিত প্রশাসক শ্রেণীর তুল্য জীব, যাপনরত সকলের পক্ষেই অলস জীবন যাপন সম্ভব করে তোলা।
ইতোমধ্যে এঁরা ভুলে গেছেন যে, নিজের শ্রমের দ্বারা ভূমি থেকে প্রাপ্ত শস্য, সজি এবং ফল দ্বারা যে পুষ্টি লাভ করা যায় এবং পুষি।ট সব চাইতে আনন্দদায়ক, স্বাস্থকর, সহজতম এবং সর্বাপেক্ষা স্বাভাবিক পুষ্টিকর এবং পেশীসমূহের ব্যবহার জীবনধারণের পক্ষে নিশ্বাস-প্রশ্বাসের সাহায্যে রক্তের মধ্যে অক্সিজেন সঞ্চারিত করার মতো সমান প্রয়োজনীয়।
সম্পত্তি এবং শ্রম বিভাজনকে অক্ষুণ্ণ রেখে রাসায়নিক উপায়ে প্রস্তুত খাদ্যের দ্বারা মানুষের উত্তম পুষ্টির ব্যবস্থা করা এবং প্রাকৃতিক শক্তির দ্বারা মানুষের কাজ করিয়ে নেওয়ার উপায় উদভাবন, অনেকটা বদ্ধ দূষিত বায়ুপূর্ণ ঘরে অবস্থিত কোন ব্যক্তির ফুসফুসে অক্সিজেন পাম্প করার উপায় উদ্ভাবনের মতো-যখন ওই বদ্ধ ঘরে আর বন্ধ হয়ে না থাকাটাই সে ব্যক্তির পক্ষে একমাত্র প্রয়োজনীয়।
উদ্ভিদ এবং পশুজগতে খাদ্য উৎপাদনের জন্য এমন একটা রসায়নাগারের ব্যবস্থা আছে-যা কোন অধ্যাপকের পক্ষেও অতিক্রমসাধ্য নয়। এই রসায়নাগারের উৎপাদন- সম্ভোগ এবং তাতে অংশ গ্রহণের জন্য মানুষের একমাত্র যা করণীয় তা হল, চির- আনন্দময় প্রবর্তনার কাছে আত্মসমর্পণ-যার অভাবে মানুষের জীবন যন্ত্রণা-বিশেষ। কিন্তু আশ্চর্যের সঙ্গে এটা লক্ষ্য করা যায়, আমাদের যুগের বিজ্ঞানীর মানুষের ভোগের জন্য সবস্তু সম্ভোগে সমস্ত বিঘ্নকে সর্বশক্তির সাহায্যে উৎপাদন আত্মনিয়োগ না করে সেই ব্যবস্থাকে অপরিবর্তনীয় বলে মেনে নেয়।
আনন্দের সঙ্গে কাজ এবং ভূমিজাত ভোজ্য আহরণের দ্বারা জীবন-বিন্যাসের পরিবর্তে তারা এমন উপায় উদ্ভাবন করে-যা তাদের কৃত্রিম গর্ভস্রাবে পরিণত করবে। এটা মানুষকে বদ্ধ অবস্থা থেকে মুক্ত বাতাসে আনয়নের জন্য সহায়তা নয়, বরং তৎপরিবর্তে এমন উপায়ের উদ্ভাবন-যার সাহায্যে তার দেহে প্রয়োজনীয় পরিমাণ অক্সিজেন প্রবাহিত করা যায় এবং এমন ব্যবস্থা করা যাতে গৃহে বসবাসের পরিবর্তে সে শ্বাসরোধকারী ক্ষুদ্র কক্ষে বাস করতে বাধ্য হয়। বিজ্ঞান ভ্রান্ত পথে না গেলে এ ধরনের মিথ্যা আদর্শের অস্তিত্ব থাকতে পারত না।
আরও পড়ুনঃ
