সৃজনের প্রত্যাশায় । শিল্পী জয়নুল আবেদিন

আজকে আমাদের আলোচনার বিষয়ঃ সৃজনের প্রত্যাশায়। এটি শিল্পী জয়নুল আবেদিন এর জীবনী গ্রন্থমালার অন্তর্গত।জয়নুল আবেদিন  বিংশ শতাব্দীর একজন বিখ্যাত বাঙালি চিত্রশিল্পী। পূর্ববঙ্গে তথা বাংলাদেশে চিত্রশিল্প বিষয়ক শিক্ষার প্রসারে আমৃত্যু প্রচেষ্টার জন্য তিনি শিল্পাচার্য উপাধি লাভ করেন।

 

সৃজনের প্রত্যাশায় । শিল্পী জয়নুল আবেদিন

 

সৃজনের প্রত্যাশায় । শিল্পী জয়নুল আবেদিন

জয়নুল আবেদিন প্রথমেই শিল্পীদের নিয়ে যুক্তিতর্কে মিলিত হলেন । ঢাকায় একটি শিল্পশিক্ষা কেন্দ্র প্রতিষ্ঠার প্রাসঙ্গিকতা নিয়ে ব্যাপক আলোচনা হয় । তখন এই অঞ্চলে মানসম্পন্ন কোনো আর্ট স্কুল ছিল না। আর একটি স্বাধীন দেশের মনন বিকাশে এ ধরনের প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজনীয়তা জয়নুল আবেদিন গভীরভাবে উপলব্ধি করলেন । তার ভাবনার সঙ্গে অন্য চারুশিল্পীরা সহমত পোষণ করলেন । এভাবে তিনি তার কর্মকাণ্ডের সপক্ষে একটি সমর্থন অর্জন করতে পারলেন । তিনি কয়েকজন সহযোদ্ধা নিয়ে আর্ট স্কুল প্রতিষ্ঠায় ঝাঁপিয়ে পড়লেন ।

তিনি বিষয়টি নিয়ে অন্যান্য শিল্পী, সাহিত্যিক, বোদ্ধাদের সাথে আলোচনায় মিলিত হলেন। তারপর রাজনীতিবিদ ও সরকারি কর্মকর্তাদের সামনে বিষয়টি উপস্থাপন করলেন। সৃজনশিল্পীরা বিষয়টিকে উৎসাহিত করলো। কিন্তু সাধারণ মানুষের অনেকে বিষয়টির গুরুত্ব উপলব্ধি করতে পারলো না। ফলে কেউ কেউ শুভকামনা জানালেও অধিকাংশই ছিল নিস্পৃহ কিংবা বিরূপ।

অনেকেই কুসংস্কারে আক্রান্ত হয়ে ছবি আঁকাকে ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলো, ধর্মবিরোধী কাজ হিসেবে সাব্যস্ত করলো। এই বিরূপ পরিস্থিতিতে জয়নুলের নেতৃত্বে উদযোগী শিল্পীরা চালাতে লাগলেন ব্যাপক প্রচারাভিযান। মানুষের নিকট চারুশিক্ষাতে মহিমান্বিত করার জন্য তারাও নানা কৌশল প্রয়োগ করলেন। বোঝাতে লাগলেন এই প্রতিষ্ঠান পুজো করার মূর্তি তৈরি করবে না, শিল্পসুষমামণ্ডিত ভাস্কর্য তৈরি করবে। ছবি আঁকা যে ইসলামে নিষিদ্ধ নয় তাও জানালেন মানুষকে।

 

সৃজনের প্রত্যাশায় । শিল্পী জয়নুল আবেদিন
পূর্ববাংলায় আধুনিক শিল্প আন্দোলনের পুরোধাগণ

 

তাছাড়া রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন কাজে এবং সামাজিক কর্মকাণ্ডে ছবির প্রয়োজনীয়তা বিষয়ে মানুষকে অবহিত করলেন। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন সাধারণ মানুষের সমর্থন ছাড়া এ কাজ করা অসম্ভবপ্রায়। কারণ রাষ্ট্রীয় কর্মকর্তারা বিষয়টিকে তখনো আমলে নেননি । জনমত সপক্ষে গেলে কাজটি সহজেই বাস্তবায়ন সম্ভব ।

তখন পূর্ববঙ্গে চারুশিক্ষার অবয়বটি একেবারেই প্রাথমিক পর্যায়ের। অনেকের ভাবনায়ই বিষয়টি ছিল না। যারা বিষয়টির বিরোধিতা করছেন তারাও বিষয়টি সম্পর্কে ওয়াকিবহাল নন। এতে জয়নুল হতোদ্যম হলেন না ।

ঢাকায় এসে জয়নুল আবেদিন উঠলেন শ্বশুরবাড়িতে। পুরনো ঢাকার আবদুল হাদী লেনে । প্রায় প্রতিদিন তিনি শ্বশুরালয় থেকে হেঁটে হেঁটে তখনকার রেডিও পাকিস্তান অফিসের উল্টোদিকের একটি রেস্টুরেন্টে আসতেন। এখানে রেডিও সংশ্লিষ্ট নানা ঘরানার সৃজনশিল্পীরা আড্ডা মারতেন। বলা যায়, সে সময়ের বিখ্যাত সব সুরকার, গায়ক, কবি-সাহিত্যিকরা আড্ডা দিতেন। যেমন কবি ফররুখ আহমদ সিকান্দার আবু জাফর, আব্বাসউদ্দিন, কবি জসীম উদদীন, সৈয়দ আলী আহসান প্রমুখ।

এদের সঙ্গে কলকাতাতেই জয়নুল আবেদিনের সুসম্পর্ক ছিল। এদের সঙ্গে কিছুক্ষণ খোশগল্পে মেতে থাকতেন । ওখান থেকে রেললাইন পেরিয়ে কিছুদূর গেলেই ছিল একটি কালভার্ট । জয়নুল আবেদিন প্রায়শ কালভার্টের ওপর আসর বসাতেন । নতুন প্রজন্মের বোদ্ধা ও সৃজনশিল্পীরা সাগ্রহে যেতেন, জয়নুল আবেদিনের সান্নিধ্যে তারা প্রেরণা পেতেন।

এ প্রতিশ্রুতিশীলদের মধ্যে ছিলেন কথাসাহিত্যিক আলাউদ্দিন আল আজাদ, শিল্পী আমিনুল ইসলাম, আবদুল্লাহ আল মুতী শরফুদ্দিন, হাসান হাফিজুর রহমান। আসতেন প্রগতিশীল আন্দোলনে সংশ্লিষ্ট ছাত্র-শিক্ষকগণ । এদের মধ্যে ছিলেন সরদার ফজলুল করিম, অজিত কুমার গুহ, মুনীর চৌধুরী, আতাউল করিম, সৈয়দ আনোয়ারুল করিম প্রমুখ। এদের সঙ্গে জয়নুল আবেদিন বিবিধ বিষয়ে আলোচনা করতেন। জয়নুল আবেদিনের দুর্ভিক্ষ বিষয়ক ছবি নিয়ে এদের প্রচুর আগ্রহ ছিল।

 

সৃজনের প্রত্যাশায় । শিল্পী জয়নুল আবেদিন

 

জয়নুল আবেদিনের সর্বভারতীয় শিল্পী পরিচিতি ও তার ব্যক্তিত্বের বিশালতা এই অঞ্চলের সর্বসাধারণের কাছে সুপরিচিত ছিল না। তবে অগ্রসর ধারার লোকজন ঠিকই খবর রাখতেন। এসব অগ্রসর প্রগতিশীলদের উদ্যোগে জয়নুলকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র- শিক্ষকদের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেয়ার জন্য একটি পরিচিতিসভা ও তার একটি শিল্প প্রদর্শনী আয়োজন করলেন। ১৯৪৮ সালে জানুয়ারিতে আয়োজিত এই অনুষ্ঠানের উদ্যোক্তা ছিলেন মুনীর চৌধুরী, আতাউল করিম, আনোয়ারুল করিম।

ফজলুল হক হলে আয়োজিত দিনব্যাপী এ আয়োজনে প্রচুর ছাত্র-শিক্ষক উপস্থিত ছিলেন। প্রদর্শনীতে শিল্পীর দুর্ভিক্ষচিত্র দেখে দর্শকগণ নতুন এক অভিজ্ঞতার স্বাদ নেয় । এই আয়োজনের মাধ্যমে জয়নুল তার উদ্যোগের সপক্ষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় পরিবারের একটি শক্ত সমর্থন পেলেন। সেই সঙ্গে সুদূরপ্রসারী একটি চেতনার বিস্তার ঘটলো ।

একই বছরের ১৪ আগস্ট পাকিস্তানের প্রথম স্বাধীনতা দিবসে রাষ্ট্রীয় কর্মকর্তাদের তুষ্টি আদায়ে তিনি আয়োজন করলেন আরেকটি প্রদর্শনী। এর মাধ্যমে তিনি রাষ্ট্রের উঁচু ব্যক্তিদের শিল্পের গুরুত্ব বোঝাতে প্রয়াসী হন । এই আয়োজনে জয়নুলকে প্রভাবিত করেন তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের স্বাস্থ্যমন্ত্রী হবীবুল্লাহ বাহার চৌধুরী। সরকারপক্ষীয়দের মধ্যে তিনি ছিলেন জয়নুল আবেদিনের উদ্যোগে একজন সতীর্থ।

 

সৃজনের প্রত্যাশায় । শিল্পী জয়নুল আবেদিন

 

প্রদর্শনীর থিম ছিল, সুলতান মাহমুদ-এর নিতি বিজয় থেকে মোহাম্মদ আলি জিন্নাহর পাকিস্তান কায়েম পর্যন্ত ভারতবর্ষ জুড়ে মুসলিম কীর্তিগুলো উপস্থাপন করা। এতে একশটি পোস্টার আঁকার মাধ্যমে এই বিষয়টি তুলে ধরা হয়। পোস্টারগুলো ড্রয়িং করেছিলেন জয়নুল আবেদিন আর রঙ লাগানোর কাছে নিয়োজিত হন কামরুল হাসান। আর আমিনুল ইসলাম দায়িত্ব নিয়েছিলেন প্রয়োজনমতো রঙগুলো তৈরি করে দেয়া, আনুষঙ্গিক ছুটা কাজ করার।

মাত্র দুমাসে একশত পোস্টার আঁকা ছিল একটি দুঃসাধ্য ব্যাপার । কিন্তু একটি স্বপ্ন বাস্তবায়নের ইশারা পেয়ে তিনি অসাধ্য সাধন করলেন । প্রতিদিন সকাল ৯টা থেকে রাত ৯টা অবধি তারা কাজ করতেন । প্রদর্শনী আয়োজিত হয় গভর্নর হাউসে। এ প্রদর্শনীটি সারা পাকিস্তানে ব্যাপক প্রচার পায়। রাষ্ট্রীয় কর্তাব্যক্তিদের জয়নুল আবেদিন চিত্রশিল্পের ব্যবহারিক উপযোগিতা হৃদয়ঙ্গম করাতে পেরেছিলেন। ফলে প্রদর্শনীটি আর্ট স্কুল প্রতিষ্ঠায় সহায়ক হয়েছিল ।

আরও দেখুনঃ

Leave a comment