আজকে আমাদের আলোচনার বিষয়ঃ শৈশবে টুনু কিংবা ঠাণ্ডার বাপ । এটি শিল্পী জয়নুল আবেদিন এর জীবনী গ্রন্থমালা। জয়নুল আবেদিন বিংশ শতাব্দীর একজন বিখ্যাত বাঙালি চিত্রশিল্পী। পূর্ববঙ্গে তথা বাংলাদেশে চিত্রশিল্প বিষয়ক শিক্ষার প্রসারে আমৃত্যু প্রচেষ্টার জন্য তিনি শিল্পাচার্য উপাধি লাভ করেন।
শৈশবে টুনু কিংবা ঠাণ্ডার বাপ । শিল্পী জয়নুল আবেদিন
জয়নুল সোনার চামচ মুখে দিয়ে জন্মাননি। তবে স্নেহ-মমতা পেয়েছিলেন প্রচুর। বাবা-মা, আত্মীয়স্বজন ও পাড়া-প্রতিবেশীর বিশাল ভালোবাসার মধ্য দিয়ে ছোট্ট জয়নুল বেড়ে উঠতে থাকেন । এতো ভালোবাসায় কিন্তু জয়নুল ননীর পুতুল হয়ে যাননি ৷ ছোট্ট টুনি পাখির মতো ঢ্যালঢেলে দেহখানি সবাই কোলে তুলে নিতে দারুণ পছন্দ করতো। জয়নুল তা পছন্দও করতো। তারপরও কি যেন একটি ব্যাপার ছিল তার মধ্যে, যা ছোট্ট শিশুদের সঙ্গে মানানসই নয়। সবসময় একটি পরিমিতিবোধ তার মধ্যে কাজ করতো। হৈ-হুল্লোড় তেমন পছন্দ করতো না। চুপচাপ থাকতো। শিশুদের মধ্যে এ রকম আপাত গাম্ভীর্য সবাইকে অবাক করতো। তার এই আলাদা শিশু-চরিত্রও তাকে অনেকের প্রিয় করে তোলে।
সুশীল ও নিরুপদ্রব জয়নুল অনেকের চোখের মণি হয়ে যায়। এরূপ স্বভাবের জন্য পাড়া-প্রতিবেশী তাকে একটি নামও দিয়ে ফেললো । তা হলো ঠাণ্ডার বাপ । ঠাণ্ডা মানে চুপচাপ, শীতল। আর তিনি ছোট্টকালে যা-তা ঠাণ্ডা ছিলেন না, ছিলেন ঠাণ্ডার বাপ। জয়নুল তখন বড়দের কাছ থেকে আরেকটি সুন্দর নাম পেয়েছিলেন, যার উল্লেখ আগেই করা হয়েছে টুনু।
টুনুর মন ছিল টুনটুনির মতো ছটফটে । অথচ বাইরে থেকে মনে হতো ঠাণ্ডা, সুস্থির। বন্ধুবান্ধবের সঙ্গে চলতো মেপে মেপে। খেলাধুলা করতো তবে অতিরিক্ত নয় । হৈ-হুল্লোড়ের মধ্যে নিজেকে ভাসিয়ে দিত না। সবকিছুতেই যেন মেপে মেপে চলা । তবে একটি ব্যাপারে খুব বেহিসাবি ছিলেন। তা হলো ঘুরে বেড়ানো। একা একা ঘুরে বেড়াতেন ।
ঘুরে ঘুরে প্রকৃতি দেখতেন । অবাক হয়ে প্রকৃতির রঙ বদল দেখতেন । রঙের খেলায় বিস্মায়িত চোখ তন্ময় হয়ে থাকতো। আর পাখি ফুল তাকে বিভোর করতো। নদীর কুলকুল অন্তরে শিহরণ জাগাতো। এভাবে তিনি প্রকৃতির গভীরে চলে যেতেন। বিদ্যাতায়নিক শিক্ষার আগেই প্রকৃতির বিদ্যালয়ের তিনি ছাত্র হয়ে ওঠেন। গাছপালা, আলোছায়া, আকাশ-বাতাস, রোদ-বৃষ্টি সবই যেন টুমুর জানার বিষয়। ঘাসের ওপর হাঁটতে হাঁটতে ভালোবাসার টান অনুভব করতেন।
অনাদরে ফুটে থাকা ফুলের মহত্ব ও সৌন্দর্যে টুনু আপ্লুত হতো। আলোছায়া যেন ছোট্ট টুনুর সঙ্গে দুষ্টুমি করতো। বাতাসের মোলায়েম ঝাপটা মায়ের আঁচলে ঢাকা আনুরে স্পর্শ বুলিয়ে দিত। ফুলে বর্ণিল শোভা ও গন্ধ তাকে আহ্লাদিত করতো । সাদা কাশফুলের নড়াচড়া মনে দোলা লাগাতো। প্রজাপতির পেছনে পেছনে ছুটে বেড়াতেন ক্লান্তিহীনভাবে ।
অতএব আমাদের এই ঠাণ্ডার বাপ যে একেবারে ঠাণ্ডা ছিলেন তা বলা যাবে। না। তার মনে সব সময়ই উত্তেজনার তাপ বিদ্যমান ছিল। এই উত্তেজনার তেজ যে শুধুমাত্র প্রকৃতিনির্ভর ছিল তা নয়। বিভিন্ন পেশার মানুষের কাজকর্মের প্রকৃতি, রসুই ঘরে বানানো নক্সাদার পিঠাও তাকে আকৃষ্ট করতো। তিনি কামারের লোহা পিটিয়ে দা কুড়াল ও অন্যান্য জিনিস বানানো দেখতেন নিবিষ্ট মনে । অবাক হয়ে দেখতেন একখণ্ড লোহা কি করে সুন্দর সুন্দর ব্যবহারযোগ্য উপাদানে পরিণত হয়। তার এই অবাক হয়ে দেখাটায় কামাররা আমোদ পেত । তারাও টুনুকে প্রশ্রয় দিত, টুনুকে আদর করে বসতে দিত।
একই রকমভাবে তিনি কুমোরবাড়িতে ঘুরঘুর করতেন। নিবিষ্ট মনে দেখেন মাটির দলা ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে কিভাবে আসবাব তৈরি করা হয়। মাটি কিভাবে নানা রকমের সানকি, কলসি, হাঁড়ি-পাতিল হয়ে যায়, দেখে তিনি খুব মজা পেতেন। কাচা পারে আঁচড় কেটে নকশা ও ছবি তোলা দেখতে একটু কাছেই চলে আসতো। শুধু কী তাই, মাটি টিপে টিপে তৈরি হতো পুতুল, খেলা ও শোপিস। এসব জিনিসপত্র শুকিয়ে পুড়িয়ে শক্ত করা হতো। এর ওপর রঙ-তুলি দিয়ে বাহারি কারুকাজ করা হতো।
এ কাজটি টুনু আয়েশ করে দেখতো, মনে বড় আনন্দ পেত । তাঁতিবাড়ির কাপড় বুনোনের প্রক্রিয়া তাকে উদ্বেলিত করতো। মাকু চালিয়ে সুতোর পর সুতো গেঁথে কাপড় তৈরি করা হতো। আর অবাক হয়ে দেখতেন কাপড়ের জমিনে জাদুকরী উপায়ে লতাপাতা, পাখি, ফুল আঁকা হয়ে যাচ্ছে। গ্রামের তাঁতিদের এসব আজব কাজকর্ম তাদের প্রতি তার শ্রদ্ধাবোধ বাড়িয়ে দেয় । তাদের বড় কাছের মানুষ মনে হয় । তারাও তাকে এমন করেই ভাবতো ।
এইভাবে তিনি সেই ছোটবেলাই মানুষকে আকাশের মতো বিশাল ভাবতে শিখেছিলেন। আকাশ তিনি খুব ভালোবাসতেন। আকাশ যেখানে দিগন্তে নেমে পড়েছে সেদিকে কখনো ধেয়ে গেছেন, কিন্তু আকাশ ধরতে পারেননি । তবে আকাশে ভেসে চলা মেঘের সঙ্গে তিনিও ভেসে বেড়াতেন। মেঘের তুলোধুনো হয়ে যাওয়া তাকে খুব আনন্দ দিত। আর লেপ্টে থাকা ছোপ ছোপ রঙ কিংবা আকাশে নানা রঙের বিচ্ছুরণ তাকে মুগ্ধ করতো।
দিগন্তরেখায় আকাশ ধরতে না পারলেও নদীর কিনার ধরে তিনি অনেক দূর চলে যেতেন । হয়তো জানতে চাইতেন মাঝি নাও নিয়ে কোথায় যায়। কখনো পারে মাটি লেপ্টে বসে নৌকার দূরদেশে চলে যাওয়া দেখতেন, দেখতেন নাও কীভাবে ছোট হতে হতে মিলিয়ে যায়। নানা রঙের পালের বাহার দেখতেন, আর দেখতেন নৌকার রকমফের। কতো রকম নৌকা যে দেখতেন, আর দেখতেন হরেক রকম মানুষ । আর নদীর প্রবাহ, জোয়ার-ভাটাও ছিল তার দেখার বিষয়। পানকৌড়ি পাখির টুপটাপ মাছ ধরা কিংবা ভোদরের হঠাৎ পানি ফঁড়ে মাথা তোলা দেখতেন ।
বক কাদামাটিতে ঠায় দাঁড়িয়ে মাছের অপেক্ষায় থাকতো, কখনো দল বেঁধে আকাশে উড়ে যেতো। অনেক সময় শত শত পাখির দঙ্গল আকাশে সারিবদ্ধভাবে কিংবা বাহারি আকার তৈরি করে মাথার ওপর দিয়ে উড়ে যেতো । চিৎ হয়ে টুনু তা দেখতো। সবকিছুতেই ছিল তার আনন্দ ।
তার এসব আনন্দের বিষয়বস্তু মা-বাবাকে চিন্তায় ফেলে দেয়। সংসারের বড় সন্তান এরূপ বিবাগী হলে কোন বাবা-মার তা ভালো লাগে। এই ঘুরে- বেড়ানো টুনুর একটি গোপন স্বভাবের কথা আর কেউ না জানলেও মা কিন্তু ঠিকই জেনে যান। আর ধীরে ধীরে আরো অনেকেই জানে। লাজুক ছেলেটি লুকিয়ে লুকিয়ে ছবি আঁকে। এঁকে তোশকের নিচে কিংবা গোপন কোনো কুঠুরিতে লুকিয়ে রাখে। কখনো আনমনে ক্লাসের খাতা কিংবা টেক্সট বইয়ের পাতায় সুন্দর সুন্দর ছবি আঁকে ।
আরও দেখুনঃ

