আজকের আলোচনার বিষয়ঃ শিশুদের জয়নুল। এটি শিল্পী জয়নুল আবেদিন এর জীবনী গ্রন্থমালার অন্তর্গত। জয়নুল আবেদিন বিংশ শতাব্দীর একজন বিখ্যাত বাঙালি চিত্রশিল্পী। পূর্ববঙ্গে তথা বাংলাদেশে চিত্রশিল্প বিষয়ক শিক্ষার প্রসারে আমৃত্যু প্রচেষ্টার জন্য তিনি শিল্পাচার্য উপাধি লাভ করেন।
শিশুদের জয়নুল । শিল্পী জয়নুল আবেদিন
জয়নুল আবেদিন দেশ ও জাতির মানস উন্নয়নে প্রচুর কাজ করেছেন । পূর্ববঙ্গের মানুষের সৃজনশীলতার বিকাশ ঘটাতে কঠোর পরিশ্রম করেছেন। পাশাপাশি নতুন প্রজন্মের মানস গঠনের দিক নিয়ে ভেবেছেন। তাদের টেকসই ভবিষ্যৎ নির্মাণের কথা ভেবেছেন। এই উদ্দেশ্যে তিনি অন্য শিশু সংগঠকদের সাথে যুগপৎ কাজ করেছেন। দীর্ঘদিন তিনি দেশের বৃহৎ শিশু সংগঠন কচি-কাঁচার মেলার সাথে কাজ করেছেন। এর উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য হিসেবে সক্রিয় ভূমিকা রেখেছেন । দেশের বিভিন্ন জায়গায় শিশুদের সান্নিধ্যে গিয়েছেন, তাদের উৎসাহিত করেছেন। শত ব্যস্ততার মাঝেও তিনি শিশুদের নিয়ে কাজ করেছেন ।
শিশুদের চারুকলা শিক্ষার প্রতি তিনি আগ্রহী ছিলেন । কচি-কাঁচার মেলা পরিচালিত একটি ছবি আঁকার স্কুল ছিল, নাম ‘শিল্পবিতান’। তিনি ছিলেন। এর উৎসাহদাতা ও পরামর্শদাতা। তিনি চাইতেন শিশুরা দেশজ ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির ছায়ায় বেড়ে উঠুক ব্যক্তিত্বের বিকাশ ঘটাক। তিনি শিশুদের সঙ্গে কাজ করতে গিয়ে যাদের সঙ্গে পেয়েছিলেন তারা হলেন কবি সুফিয়া কামাল, সওগাত সম্পাদক ও শিশুসাহিত্যিক মোহাম্মদ নাসিরউদ্দিন, অধ্যাপক অজিত কুমার গুহ, আবদুল্লাহ আল মৃতী শরফুদ্দীন, দাদাভাই রোকনুজ্জামান খান, সাংবাদিক আবদুল ওয়াদুদ প্রমুখকে। একজন পরিপূর্ণ মানুষ হয়ে ওঠার জন্য শিশুকালের শিক্ষাটা যে খুব জরুরি এটা তারা বুঝতে পেরেছিলেন।
প্রথাগত বিদ্যায়তনিক শিক্ষা ছাড়াও শিশুদের ছবি আঁকা, খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডকে জয়নুল আবেদিন খুব গুরুত্ব দিতেন। সহশিক্ষার কার্যক্রমে তিনি শিশুদের উৎসাহ দিতেন, সাহস জোগাতেন। ১৯৬০ খ্রিস্টাব্দের দিকে কচি-কাঁচার মেলা শিশু- কিশোরদের জন্য আনন্দ মেলা আয়োজন করেছিল। এতে তিনি অতি উৎসাহের সঙ্গে অংশগ্রহণ করেন। শিশুদের বন্ধু হয়ে তিনি তাদের সঙ্গে মিলেমিশে একাকার হয়ে যান।
বাংলাদেশের শিশুদের নিয়ে তার ছিল অতি উচ্চ ভাবনা। তিনি তাদের সৃজনমনের ভাবনায় আস্থা রাখতেন। ১৯৭২ খ্রিস্টাব্দের ফেব্রুয়ারি মাসে চিকিৎসার উদ্দেশ্যে তিনি লন্ডন যান। এর আগে কচি-কাঁচার মেলার উদ্যোগে শিশুদের আঁকা ছবি নিয়ে প্রদর্শনী করেন। প্রদর্শনীর থিম ছিল মুক্তিযুদ্ধ ১৯৭১ । ছবিগুলোতে শিশুমনের মুক্তিযুদ্ধ ভাবনা স্থান পায়। শিশুরা যেভাবে মুক্তিযুদ্ধকে দেখেছে তুলি ও ক্যানভাসে তারা তাই ফুটিয়ে তুলেছে।
পাকিস্তান আর্মির নৃশংসতা, লাইন ধরে মানুষ খুন করা, মেয়েদের পাশবিক নির্যাতন যেমন এই ছবিগুলোতে স্থান পেয়েছে তেমনি মুক্তিযোদ্ধাদের নানা বীরত্বগাথা, বাঙালি মায়ের ত্যাগ-তিতিক্ষা, বিজয়ী মুক্তযোদ্ধার অগ্রযাত্রা ইত্যাদি ধাঁচের ছিল ছবিগুলো । কচি-কাঁচার মেলার অফিসে আয়োজিত এ মেলার উদ্বোধন করেন। মুক্তিযুদ্ধের এক মহানায়ক তাজউদ্দীন আহমদ । এরূপ ৩০০ ছবি থেকে ৭০টি বাছাই করে জয়নুল আবেদিন সঙ্গে করে লন্ডন নিয়ে যান। সেখানে ২২ জুন। থেকে ৩১ জুলাই পর্যন্ত কমনওয়েলথ ইনস্টিটিউটে শিশুদের এই ছবিগুলো প্রদর্শিত হয় । প্রদর্শনী উদ্বোধন করেন তৎকালীন বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. কামাল হোসেন।
এ প্রদর্শনীতে দিনা নামের এক শিশুশিল্পীর ছবি দিয়ে একটি পোস্টার ছেপে দর্শকদের কাছে বিক্রি করা হয়। বিক্রয়লব্ধ টাকা বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিলে জমা হয়। শুধু তাই নয়, শিশুদের এই ছবিগুলো নিয়ে এডিনবরা ও কানাডায় প্রদর্শনী হয়। শিশুদের চোখে দেখা মুক্তিযুদ্ধ এভাবে বিদেশিদের কাছে উপস্থাপিত হয় এবং যুদ্ধের পরিস্থিতি উপলব্ধি করতে সহায়ক হয়।
শিশুর অনুভূতির মাঝে বিদেশিরা সত্যনিষ্ঠতা খুঁজে পায়। লন্ডনের সংবাদপত্র ও সংবাদ সংস্থাগুলো প্রদর্শনীর ফলাও প্রচার করে। এরপর ১৯৭৩ খ্রিস্টাব্দে জয়নুল আবেদিন প্রিয় শিশুদের ছবি নিয়ে ভারতে যান। সেখানে বড়সড় প্রদর্শনী করেন। কলকাতা, দিল্লি ও বোম্বাইয়ে দুমাসকাল এ প্রদর্শনী চলে । এর মাধ্যমে ভারতবাসী সদ্য স্বাধীন দেশের শিশুদের সৃজনধারা ও তাদের ভাবনার সঙ্গে পরিচিত হতে পারে ।
জয়নুল আবেদিন শিশুদের বড় ভালোবাসতেন। ভালোবাসতেন তার শৈশবের ৰাঙা দিনগুলো, ভালোবাসতেন জন্মস্থান ময়মনসিংহ। তিনি ছিলেন আন্তর্জাতিক এক ব্যক্তিত্ব। মৃত্যুর বছরখানেক আগে তিনি তার ছবিগুলো সংরক্ষণের জন্য একটি সংগ্রহশালা করেন। রাজধানী ঢাকায় অনায়াসেই তিনি তা করতে পারতেন। তা না করে তিনি বেছে নেন শৈশবের স্মৃতিবিজড়িত ময়মনসিংহ শহর। ১৯৭৫ খ্রিস্টাব্দে সেখানে প্রতিষ্ঠা করেন ‘জয়নুল আবেদিন চিত্র সংগ্রহশালা’।
আরও দেখুনঃ

