আজকে আমরা আলোচনা করবো শিল্পী জয়নুল আবেদিন এর শিক্ষাজীবনের আরও কিছু। এটি শিল্পী জয়নুল আবেদিন এর জীবনী গ্রন্থমালার অন্তর্গত। জয়নুল আবেদিন বিংশ শতাব্দীর একজন বিখ্যাত বাঙালি চিত্রশিল্পী। পূর্ববঙ্গে তথা বাংলাদেশে চিত্রশিল্প বিষয়ক শিক্ষার প্রসারে আমৃত্যু প্রচেষ্টার জন্য তিনি শিল্পাচার্য উপাধি লাভ করেন।
শিক্ষাজীবনের আরও কিছু । শিল্পী জয়নুল আবেদিন
আর্ট স্কুলে ভর্তি হয়ে ছাত্র হিসেবে জয়নুলের আগের সব অমনোযোগিতা উবে যায় । সবচেয়ে মনোযোগী ও মেধাবী ছাত্র হিসেবেই তিনি আর্ট স্কুলে সুখ্যাতি অর্জন করেন। শিক্ষকরা জয়নুলকে তার একাগ্রচিত্ততার জন্য খুব পছন্দ করতেন ৷ আর জয়নুলও শিক্ষকদের তীক্ষ্ণভাবে অনুসরণ করতেন। তাদের জ্ঞান ও অর্জিত শৈল্পিক উৎকর্ষ রপ্ত করতে চেষ্টা করতেন। উল্লেখ্য, জয়নুল আর্ট স্কুলে যেসব শিক্ষকের আওতায় শিল্পশিক্ষা করছিলেন তারা শিল্পী ও শিল্পবোদ্ধা হিসেবেও খ্যাত ছিলেন।
প্রথম বর্ষে তার শিক্ষক ছিলেন বলাইচন্দ্র দাস, দ্বিতীয় বর্ষে রিসেন মিত্র, তৃতীয় বর্ষে মণীন্দ্রভূষণ গুপ্ত, চতুর্থ থেকে ষষ্ঠ বর্ষ বসন্তকুমার গাঙ্গুলী। মুকুল দে ছিলেন তাদের অধ্যক্ষ, তিনি স্কেচ খাতা দেখতেন । শিক্ষকদের মধ্যে আরো ছিলেন সত্যেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়, প্রহ্লাদচন্দ্র কর্মকার, সতীশচন্দ্র সিংহ, সুশীল সেন, আবদুল মঈন প্রমুখ। তাদের ছাপচিত্রের কলাকৌশল শেখাতেন রমেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী ।
নিজস্ব দায়বোধ থেকে কমার্শিয়াল কাজে নিজেকে যুক্ত করেন জয়নুল, আবার শিল্পচর্চার অপার আগ্রহ থেকে প্রয়োজনীয় সময়টুকুও দিতে হয় । এই দুই পরিসরে প্রচুর শ্রম ও সময় দিতে হয় । বলা যায়, অবসর তিনি পেতেনই না । আর ছুটিছাটায় চলে যেতেন ছবি আঁকতে একটু দূরে কোথায়, প্রকৃতির নিবিড়তায় ।
তখন আর্ট কলেজের কোর্স ছিল ছয় বছরের। প্রথম তিন বছর ধরা হতো এলিমেন্টারি পর্ব, পরবর্তী তিন বছরকে ধরা হতো এডভান্সড পর্ব। প্রথম পর্বে অঙ্কনের সাধারণ কলাকৌশল ও সব বিষয়ের প্রাথমিক ধারণা দেয়া হতো। দ্বিতীয় পর্বে শুরু হতো বিভাগভিত্তিক শিক্ষাক্রম । তখন আর্ট স্কুলে ছয়টি বিভাগ ছিল ফাইন আর্ট বিভাগ (ইউরোপীয় ধারা অনুসৃত ড্রইং-পেইন্টিং), কমার্শিয়াল বিভাগ (পোস্টার, ফেস্টুন, বিজ্ঞাপন, মোড়ক, বইপত্রের ছবি ইত্যাদি), প্রাচ্যকলা বা অরিয়েন্টাল আর্ট বিভাগ (ভারতীয় চিত্রধারা, পারস্য ও প্রাচ্যের অন্যান্য চিত্রধারা), ভাস্কর্য বিভাগ, ছাপচিত্র বিভাগ।
পছন্দের বিভাগ হিসেবে তিনি বেছে নিয়েছিলেন ফাইন আর্টস । তবে প্রিয় অধ্যক্ষ মুকুল দে চেয়েছিলেন। জয়নুল প্রাচ্যকলায় ভর্তি হোক । রীতি অনুযায়ী অধ্যক্ষের কথা মেনে নেয়াই ছিল নিয়ম। কিন্তু জয়নুল আগ্রহী ছিলেন ফাইন আর্টস-এ । তিনি অধ্যক্ষ মুকুল দে- কে মনের কথা জানালেন এবং এর পক্ষে নিজের যুক্তি তুলে ধরলেন । অধ্যক্ষ মুকুল দে তা মেনে নিলেন। এভাবে জয়নুল শিল্পী হয়ে ওঠার পেছনের একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিলেন ।
মনের মতো বিভাগ পেয়ে ছবি আঁকায় জয়নুলের আগ্রহ আরো বেড়ে গেল । স্কুলের বাইরে ছবি আঁকা আর্ট কলেজের ছাত্রদের একটি রীতি । আর এই কাজটি তিনি অত্যন্ত নিষ্ঠার সঙ্গে করতেন। মানুষ ও প্রকৃতির গভীরে প্রবেশে নিরন্তর এক প্রচেষ্টা থেকে তিনি এ কাজটি করতেন ।
কলকাতা ও আশপাশের প্রচুর ছবি ও স্কেচ এঁকেছেন তিনি। আর একটু বেশি দিনের ছুটি পেলে চলে যেতেন দূরে । যেতেন সাঁওতাল পরগনা দুমকা কিংবা প্রিয় জন্মভূমি ময়মনসিংহের ব্রহ্মপুত্র নদের তীরে। বীরভূমের ময়ূরাক্ষী নদী আর ব্রহ্মপুত্র নদ তাকে ভীষণভাবে আলোড়িত করেছিল । নদীকেন্দ্রিক মানুষ ও প্রকৃতি তার ছবিতে প্রভাব রাখে ।
আরও দেখুনঃ

