লিও টলষ্টয়ের জীবনশিল্প পর্ব – ১ – লিউ টলষ্টয় আমার প্রিয় লেখক। কী জীবনে কি শিল্পে। যেমন রবীন্দ্রনাথ। দুজন সমান প্রিয়। কেউ কারো চেয়ে বড়ো বা ছোট নয়। টলষ্টয়ের কাহিনীগুলির ভিতর দিয়ে তিনি যা শিক্ষা দিতে চেয়েছিলেন তা জীবনের মূলনীতি ও জীবনদর্শন। কিন্তু আমি চাই রস ও আনন্দ। বছর কয়েক পরে আমার নজরে আসে আনা কারেনিনা। তন্ময় হয়ে পড়ি। সব কথা যে বুঝি তা নয়, কতই বা বয়স।
আঠারো কি উনিশ। আরো কিছুদিন পরে পড়ি হোয়াট ইজ আর্ট। সব কথা বোঝা আরো কঠিন। মোটামুটি হৃদয়ঙ্গম হয় যে আর্ট হবে সত্য ও নির্ঝর। সুন্দর না হলেও চলে। ওদিকে আমি রাশি রাশি কন্টিনেন্টাল নাটক উপন্যাস পড়েছি। জীবনের সত্য মিথ্যা ভালো মন্দ পাপ পুণ্য সুন্দর মিছিল করে চলেছে। কী তার চৈচিত্র্য। কী তার আকর্ষণ। জীবনকে আমি আর্টের দর্পণে নিরীক্ষণকরব না ধর্ম ও নীতির নিকষ দিয়ে কেবল শুভটুকুই আর্টের বিচারে সোনা বলে যাচাই করব।
লিও টলষ্টয়ের জীবনশিল্প পর্ব – ১
পঞ্চাশ বছর বয়সে টলস্টয় বনে না গেলেও বাণপ্রস্থ নিয়েছিলেন। তাঁর নিজের যৌবনের ভরা গঙ্গা তাঁর অমনোনীত হয়েছিল। সেই ভরা যৌবনের সৃষ্টিকেও তিনি নীতির বিচারে খাটো মনে করতেন। এতে কিন্তু আমার মন সায় দেয়নি। ভালো টলষ্টয়ের বিবেক তাঁর মতে সমাজে বেলায় যেমন শিল্পের বেলায়ও তেমনই। ভালো কবিতা, ভালো গান, ভালো ছবি, এ কথা যখন বলব তখন কি এই কারণে বলব যে কবিতাটা বা ছবিটা লোকহিতকর, শিক্ষাপ্রদ, নীতিসম্মত? মানুষের সহজাত রসবোধ ও রূপবোধকে দমন না করে এ রকম একটা সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না।
আর্টের সংজ্ঞাকে সঙ্কুচিত করে তাকে ধর্মশাস্ত্র বা নীতিশাস্ত্রের সীমানার ভিতর আনতে গেলে যা হয় তা যেন চীন দেশের মহিলাদের লোহার জুতা পরানো। সুন্দরীকে সতী বানানোর এই সাধু অভিপ্ৰায় আৰ্টকে এত উচ্চে তুলে নিয়ে যাবে যে তাকে আর আর্ট বলে চেনা যাবে না। তার চেয়ে হতে দাও না কেন তাকে অসতী। হোক না সে আনা কারেনিনা।
আমি আনা কারেনিনাকেই আর্টের আদর্শ ভাবি। যুদ্ধ ও শান্তি তো অনেকের মতে এ যুগের মহাকাব্য ইলিয়াড আমার মতে ওর র সঙ্গে সমান বলে গণ্য হতে পারে একমাত্র দন্তয়েবস্কির রচিত কারামাজভ ভ্রাতৃগণ। ইলিয়াডের পর ‘অডিসি’ লেখাই ছিল প্রত্যাশিত, কিনতু ‘আকা কারেনিনা।’ আর একখানি ‘অডিসি’ নয়। তা সত্ত্বেও সে উপন্যাস একালের পাঁচ সাতখানি শ্রেষ্ঠ উপন্যাসের অন্যতম। তাকে কোনো উচ্চতম স্ত রে উঠেছিলেন সে দুটি যদি তাঁর পায়ের তলা থেকে সরে যায় ততে তাঁর উচ্চতাই বা থাকে কোথায়! কেনই বা লোকে তাঁল বাণী শুনবে, তিনি প্রায়শ্চিত্ত করে ঋষি হয়েছেন বলে।
ঋষি টলস্টয় এর পরে শিল্পের সাধনা ছেড়ে জীবনমরণের প্রশ্নের উত্তর অম্বেষণে আত্মনিয়োগ করেন। বেদ উপনিষদ্ গীতাবাউবেল কোরান বৌদ্ধশাস্ত্র প্রচন্ড ক্ষুধা নিয়ে অধ্যয়ন করেন। চার্চের ভাষ্য ত্যাগ করে সরাসরি যীশু কথামৃত আস্বাদন করেন। যীশু কথামৃত আস্বাদান করেন। যীশুর বাণী আমি খ্রীষ্টানদের মতো অনুসরণ করেন।
কোনো কারণেই মানুষ হত্যা করা চলবে না, মানুষমাত্রেই তোমার ভাই ও তোমার পিতার সন্তান। হিংসার প্রতিশোধ হিংসা দিয়ে নয়, প্রেম দিয়ে। মাথার ঘাম পায়ে ফেলে অর্জিত অন্ন গ্রহণ করবে, অপরের পরিশ্রমের ফল থেকে তাকে বঞ্চিত করবে না।
চাষীর মতো পোশাক পর মুচির মতো জুতো তৈরি করা হলো টলষ্টয়ের নিত্য কর্ম। তবে ওর থেকে তাঁর কোনো আয় ছিল না, চলথ অন্য আয়ে। জমিদারির স্বত্ব তিনি স্ত্রীকে লিখে দেন। কিন্তু গ্রন্থস্বত্ব সর্বসাধারণকে দিতে চাইলে পরিবারের কাছ থেকে দুস্তর বাধা পান। শেষে এইভাবে রফা হয় যে, ঋষি হবার পূর্বে তিনি যেসব গ্রন্থ লিখেছিলেন সেসব গ্রন্থের স্বত্ব স্ত্রীকে লিখে দেন, সেইগুলিই তাঁর সোনার খনি। বারস একান্নে। তিনি খেতেন নিরামিষ। কপিরাইটনা থাকায় ঋষি টলষ্টয়ের বাণী দেশে বিদেশে ছড়িয়ে যায়।
ধনী ও মধ্যবিত্ত ঘরের সন্তানরা তাঁতে বোনা কাপড়ের চাষীর পোষাক পরে গ্রামে গ্রামে ঘুরে বেড়ান। দেখলে চেনা যায় কে কে টলষ্টয়পন্থী। কে কে উচ্চস্তর থেকে নেমে এসেছেন। দেক্লাসে বা ডিক্সাসড। টলস্টয় মাঝে মাঝে মস্কো যেতেন। একবার একবার সেখানকার থিয়েটারে ঢুকতে গিয়ে বাধা পান।
দারোয়ান বলে, ‘এই চাষী। তুই এর বুঝবি কী! এসব তোদের জন্য নয়।” কে একন ব্যাপারটা দূর থেকে লক্ষ করে ছুটে আসেন। বলেন, ‘সর্বনাশ! মানুষ চিনতে পারো না! ইনি যে কাউন্ট লিও টলস্টয়।’ দারোয়ান লজ্জায় ভয়ে জড়সড়। টলস্টয় তাকে সাধুবাদ দেন। তুমি ঠিকই চিনেছ যে আমি একজন মুজিক। তুমি ঠিকই চিনেছ, আর কেউ নয়।’ চাষী বলে তাঁকে ভুল করাতে তিনি মহা খুশি। টলষ্টয়ের নিজের ঘরেই বিদ্রোহ মাথা তুলেছিল তাঁর এক ছেলে তো সোজা গি আর্মিতে যোগ দেয়। যেটা সব চেয়ে নৃশংস রেজিমেন্ট সেই ব্ল্যাক ওয়াচে।
নামটা ঠিক মনে পড়ছে না। টলস্টয় অসহায়। আরেক ছেলে তো কঠিন অসুখের সময় তাঁকে দেখতে আসবে না। সে বলে তার বাবা আগে ভাগেই বিখ্যাত সাহিত্যিক হয়ে তার বিখ্যাত সাহিত্যিক হবার পথরোধ করে বসে আছেন। বিপ্লবের পরে আরেক ছেলের মন্তব্য, ‘এর জন্য দায়ী হচ্ছে বাবা। তিনিই তো বিপ্লবের নাটের গুরু।
শিল্পী টলস্টয় ব্যর্থ হননি। ঋষি টলস্টয় হবার পরেও লিখেছেন, ‘রেজারেকশন,’ তৃতীয় মহত্তম উপন্যাস। অন্তত গোটা দুইি বিস্মরণীয় গল্প, প্রভু ও ভূত্য’ আর ‘আইভান ইলিচের মৃত্যু।’ কিন্তু ঋষি টলস্টয় না পারলেন মহাযুদ্ধ ঠেকাতে, না পারলেন মহাবিপ্লব এড়াতে। একটার লজিকাল পরিণতি অপরটা। বিরাশি বছরে মৃত্যুবরণ না করে আরো সাত বছর বেঁচে থাকলে দেখে যেতেন তাঁর ব্যর্থতার দৃশ্য।
শিল্পী টলস্টয় ও ঋষি টলস্টয়, একজন মানুষকে দু’ভাগে বিভক্ত করা যায় না। যুদ্ধ ও শন্তি লেখার বয়সে টলষ্টয়ের আধ্যাত্মিক ব্যাকূলতা ও বিবেকের তাড়না যথেষ্ট প্রবল ছিল। ‘আনা কারোনিনা’ লেখার বয়সে আরো তীব্র হয়। টলস্টয় সাংসারিক সাফল্যের চূড়ায় উত্তীর্ণ হয়ে তিনি উপলব্ধি করেন যে মানব জীবনের অন্বিষ্ট যশ নয়, বিভব নয়, মানসম্মান নয়, রাজক্ষমতা নয়, ভোগবিলাস নয়। মৃত্যু অপেক্ষা করছে তার আত্মাকে এক অজানা লোকে নিয়ে যেতে যেখানে সে নিঃসম্বল। কিংবা সে একোবরেই অস্তিত্বহীন। পরপারে অন্তহীন শূন্যতা। করণীয় তা হলে কী? যীশু যা বলে গেছেন, বিধাতাকে ভালোবাসা, মানুষকে ভালোবাসা।
ভালোবাসা যদি সত্য হয় তবে হত্যা করা কখনো সত্য নয়, কোনো কারণেই শ্রেয় নয়, শোষণ করা কখনো সত্য নয়, কোনো কারণেই শ্রেয় নয়, শোষণ করা কখনো সত্য নয়, কোনো কারণেই শ্রেয় নয়। আধুনিক ইউরোপীয় সভ্যতা দিচ্ছে এর বিপরীত শিক্ষা, খ্রীস্টীয় শিক্ষার সঙ্গে সে সভ্যতার মূলেই বিরোধ। খ্রীষ্টধর্মে যারা বিশ্বাস করে তারা সে সভ্যতায় বিশ্বাস করতে পারে না। সে সভ্যতায় যারা বিশ্বাস করে তারা খ্রীষ্টধর্মে বিশ্বাস করতে পারে না। খোসাটা আসল নয়, শাঁসটাই আসল। খাঁটি খ্রীস্টান হতে হবে। খাঁটি খ্রীস্টানের সঙ্গে খাঁটি বৌদ্ধের বা খাঁটি মুসলমানের বা খাঁটি হিন্দুর মূলত কোনো ভেদ নেই।
শিল্প কি কেবল শিল্পকেই সার করবে, মানবজাতির জীবনমরণের সমস্যা নিয়ে ভাববে না, সমাধান নিয়ে মাথা ঘামাবে না? এ বিষয়ে টলষ্টয়ের সঙ্গে আমার মতভেদ আজীবন। তাজমহল গড়ার কাজও কতক মানুষকে করতে হবে। চারদিকে দুর্ভিক্ষের হাহাকার সত্ত্বেও সৃষ্টিকর্মে তৎপর থাকতে হবে, তন্ময় থাকতে হবে।
শিল্পের তিলোত্তমা ঈর্ষপরায়না। সব মানুষের কতব্য নির্দেশ করতে গিয়ে কতক মানুষের কথা ভুলে যাওয়া উচিত নয়। এরা যা সৃষ্টি করছে তা সব মানুষের পক্ষে ও সব মানুষের জন্যে। এরা যদি না করে তো আর কেউ করবে না। শিল্পীরা তাদের স্বধর্ম নিয়েই থাকবে, সেটাও ধৰ্ম।
টলস্টয় গ্রামের বাস করতেন, চাষী ও কারিগরদের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক। সেই পথ দিয়ে তীর্থযাত্রীরা যাতায়াত করত সন্ন্যাসী ফকির জিপসীদেরও আসা যাওয়া ছিল। এই যে চিরন্তন স্বদেশ একে ছেড়ে তিনি বিদেশেও যেতেন না, দু বার গিয়ে অস্বস্তি বোধ করতে অল্পদিনের মধ্যে ফিরে আসেন। টলষ্টয়ের এই বিদেশবিমুখতার সঙ্গে যোগ দেয় নগরবিমুখতা। নগরগুলো তো বিদেশেরই অনুকরণ। সেখানে গেলেও তিনি অস্বস্তি বোধ করতেন। তবে ছেলেমেয়েদের শিক্ষাদীক্ষার জন্য তাঁকে মস্কোতেও বাসা নিতে হয়েছিল। বছর কয়েক মাস সেখানে কাটাতেন। তিন্তু তাঁর হৃদয় পড়ে থাকত ইয়সনাইয়া পলিয়ানায়। রবীন্দ্রনাথের যেমন শান্তিনিকেতনে। বুদ্ধিজীবীরা।
প্রায় সকলেই মস্কোতে বা সেন্ট পিটার্সবার্গে। অনেকে প্যারিসে বা দক্ষিণ ফ্রান্সে বা ইটালীতে বা জার্মানীতে। টলস্টয় এঁদের দেখতে পারতেন না, তাঁর ধারণা দেশের লোকে নাড়ির সঙ্গে এঁদের যোগ নেই, এঁরা লিবারেল হলে শৌখিন লিবারল, বিপ্লবী হলে পুঁথি পোড়ো বিপ্লবী।
লিবারেলদের মুখে যখন ব্যক্তি স্বাধীনতার বা পার্লামেন্টারি গণতন্ত্রের খই ফুটত তখন তিনি বলতেন, যুদ্ধকালে কনসক্রিপশন কী করে তার সঙ্গে খাপ খায়? যারা রাষ্ট্রে হুকুমে মানুষ হত্যা করে তারা তো তাদের বিবেক হারিয়ে বসেছে। রাষ্ট্রের পায়ের মাথা বিকিয়ে দিয়েছে। পশ্চিম থেকে যন্ত্র আমদানি করে তার পায়ে আত্মা বলি দিলে সেটাও তেমনি মারাত্মক। চাষী আর কারিগরকে কলমজুর বানিয়ে প্রগতি হবে, এটা মায়া।
টলষ্টয়ের সমাধান চাষীকে বলতে একটুকরো জমি দিতে হবে, যেখানে চাষীরাই মালিকানা। জমিদারেরও নয় রাষ্ট্রেরও নয়। দেশের বুদ্ধিজীবী মহল তাঁর সঙ্গে একমত ছিলেন না। জমিদারেরও উপর ছিল তার অবজ্ঞা। তা ছাড়া কেই বা তাঁর মতো জমিতে গিয়ে চাষাবাস করতে রাজী? তা হলে তো আর বুদ্ধিজীবী বলে গণ্য হবেন না। বুদ্ধিজীবীকে তিনি বানাতে চান চাষী।
ওঁরা কিন্তু চাষীকে বানাতে চান বুদ্ধিজীবী। রাষ্ট্রের সঙ্গে, চার্চের সঙ্গে, শিল্পীদের সঙ্গে, বুদ্ধিজীবীদের সঙ্গে মতবিরোধেই কেটে যায় টলষ্টয়ের শেষ জীবন। পরিবারের সঙ্গে তেমনি। গৃহত্যাগ করে তিনি কোথাও চলে যেতে চেয়েছিলেন, কিন্তু পথের ধারে এক রেলস্টেশনে ঘটে মৃত্যুবরণ। সব দেশের মানুষ তাঁর জন্য কাঁদে, সব শ্রেণীর মানুষও। একমাত্র তুলনা বঙ্গবন্ধু সপরিবারে নিধন।
২
লিউ টলষ্টয়ের জন্মের একশত সত্তুর বছর অতীত হয়েছে। তাঁর জীবনকালেই তিনি দেশের সীমা অতিক্রম করেছিলেন। তাঁর মৃত্যুর সময় দেখা গেল, স্বদেশে সমাদ্রিত জার, টলস্টয় সর্বত্র সমাদ্রিত। তাঁর জীবনমরণ সন্ধিক্ষণে সারা দুনিয়ার লোক উৎকণ্ঠিত। কেন এত শ্রদ্ধা, এত প্রীতি, এত মমতা? যুদ্ধ ও শান্তি, আনা কারেনিনা ও রেজারেকশন এই তিনটি মহান উপন্যাসের জন্যই কি? না তাঁর মানবদরদী জীবদর্শনের জন্য, জনদরদী জীবনযাপনের জন্য? যুদ্ধবিরতি ও শোষণ বিরতির জন্য তাঁর অবিশ্রান্ত লেখনি চালনার জন্য?
টলষ্টয়ের রচনার আমার প্রথম পরিচয় ১৬ বছল বয়সে, যখন আমি স্কুলের ছাত্র। তাঁর কাহিনী গুচ্ছ পুরস্কার পেয়েই সঙ্গে সঙ্গে নিমগ্ন হয়ে পড়ি। সেই যে সম্পর্ক স্থাপিত হল সে সম্পর্ক সারা জীবনেও ছিন্ন হল না। জীবনদর্শনেসর ক্ষেত্রে আমি তাঁর অনুচরদের সঙ্গে রয়েছি। কিন্তু সাহিত্যের ক্ষেত্রে তাঁর প্রভাব খাটিয়ে উঠেছি। আর্টকে তিনি পঞ্চাশোত্তর বয়সে ধর্মপ্রচার বা নীতিপ্রচারের বাহন করেছিলেন। সেখানে তাঁর সঙ্গে আমার মৌল মতভেদ। আমার মতে এতে আর্টের স্বাধীনতা খর্ব হয়। অমিতাচারী আর্টকে সংযত হতে বলা এক জিনিস, শৃঙ্খলার খাতিরে শৃঙ্খল পরিয়ে দেওয়া আরেক। নির্ঝরের জন্যে সৌন্দর্যকে লাঘব করা যায় না।
সত্যের জন্যেও না, তবে দ্বন্দ্বের দিন আমি দ্বিধান্বিত। ঠিক এই কারণেই আমি রবীন্দ্রনাথের আরো কাছাকাছি। পরবর্তী বয়সে আমি কবির প্রভাবও কাটিয়ে উঠেছি। এ সংসারে ধনহীনরা ধনবান হতে চায়, বলহীনরা বলবনা হতে চায়, অশিক্ষতারা শিক্ষিত হতে চায়, নিম্নস্থানীয়রা উচ্চস্থানীয় হতে চায়।
কিন্তু এর বিপরীত অভিলাষ কেউ কোথাও পোষণ করে কি? যদি কেউ করে সে সরাসরি সন্ন্যাসী হয়ে যায়, মঠে যোগ দেয় কিংবা আশ্রম প্রতিষ্ঠা করে। টলস্টয় দীনহীনদের একজন হয়ে তাদেরই মতো শ্ৰম-লব্ধ অন্নে প্রাণধারণ করতে চেয়েছিলেন, পশুবলে তাঁর আস্থা ছিল না, বুদ্ধিজীবীদের ওপর তাঁর অবজ্ঞা জন্মেছিল, সভ্যতার উপরে তিনি বীতশ্রদ্ধা। অথচ সন্ন্যাসীও হননি, মঠেও যোগ দেননি, আশ্রমও প্রতিষ্ঠা করেননি। বঙ্গবন্ধু তবু তাঁর সহধর্মিনীকে দেশ সেরা নিযুক্ত করতে পেরেছিলেন। টলষ্টয়ের ঘরণী শেষ পর্যন্ত ঘরণী ঘর ছাড়তে যাওয়া মানেই ঘরণীকে ছাড়তে চাওয়া। সেই কাজটি যেদিন করতে সমর্থ হন সেদিন তিনি হন অভিজাত জীবনধারা থেকে মুক্ত পুরুষ।
কিন্তু ততদিনে তাঁর বয়স হয়েছে ৮২, শরীর ভেঙে গেছে, দিনকয়েকের মধ্যেই তিনি পথের ধারে এক রেল ষ্টেশনে অন্তিম নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। বেঁচে থাকলে আবার তাঁকে তাঁর ঘরসংসারেই ফিরে যেতে হতো। সেটা হতো তাঁর পক্ষে পরাজয়। যদি না তাঁর সহধর্মিণীর ঘটত এক প্রকার অন্তঃপরিবর্তন। যদি না সমস্ত গৃহস্থালিটাই হয়ে যেত ঋষি ও ঋষিপত্নী তথা ঋষিসন্ততিদের আশ্রম। একটি কি দুটি কন্যা আর কোনো পুত্রকন্যার উপরে তাঁর জীবনদর্শনের উল্লেখযোগ্য প্রভাব পড়েনি। তাঁদের তিনি মানাতে পারেননি যে স্বেচ্ছায় ধনসম্বদ ও অলস জীবনধারা ত্যাগ না করলে বিপ্লবের দিন বাধ্যহ হয়েই সর্বস্ব হারাতে হবে।
তখন বিদেশে গিয়ে পিতার গ্রন্থস্বত্বের দৌলতে ভদ্রতা রক্ষা করতে হবে। ঋষি টলস্টয় যেখানে নিজের ঘরের লোকেই সঙ্গে নিতে পারলেন না সেখানে সারা দেশের লোককেই বা সঙ্গে নিতে পারবেন কেমন করে? সে কাজের ভার পড়ল লেনিনের উপরে, ভার দিল ইতিহাস। লেনিনেরও নিঃস্বার্থ জীবন, সাধারণের মতো জীবনযাত্রা। কিন্তু জনগণকে সঙ্গে নেবার জন্য কী পরিমাণ রক্তপাত করতে হলো তাঁকে! পরে তাঁর উত্তরসূরী ষ্ট্যালিনকে। রক্ষে স্রোতে ভেসে গেল যুদ্ধ ও শান্তি তথা আনা করেনিনা তথা রিজারেকশনের বুদ্ধিদীপ্ত বলদৃপ্ত ধনসম্পদশালী অভিজাত ও উচ্চবিত্ত শ্রেণী।
কিন্তু তাতে তাদেরই বা লাভ কী হলো যাদের মধ্যে টলস্টয় ভাগ করে দিতে চেয়েছিলেন ছোট ছোট জোত? যেখানে যারা শোষণও করবে না, শোষিতও হবে না। স্বাধীন ও স্বতন্ত্রভাবে চাষ করবে, যা ফলাবে তা খাবে, যা খাবে তা ফলাবে। শিল্পের মতো কৃষিও চলে গেছে কেন্দ্ৰীয় কর্তৃত্বে। কর্তার ইচ্ছায় কর্ম। খেত খামার কারো নিজের নয়। রাষ্ট্রের কিংবা সমষ্টির। টলস্টয় দেখলে কষ্ট পেতেন। কিছুতেই তাঁকে বোঝানো যেত না যে এরই নাম সামাজিক ন্যায়।
পশ্চিমের লোক যাকে গণতন্ত্র বলে তাতে তো তিনি বিশ্বাসই করতেন না, সুতরাং সে জিনিস গড়ে ওঠেনি দেখে তিনি কাকেই বা দোষ দিতেন? এক ডিকটেটরশিপের বদলে আরেক ডিকটেটরশিপ। অভিজাতদের না হয়ে শ্রমিকদের। সমাজের এক মেরুর না হয়ে অপর মেরুর। টলস্টয়প্রচারিত অহিংসার নামগন্ধ নেই। সত্যেরও আছে কি না সন্দেহ। কাউকে তো কিছু প্রাণ খুলে লিখতেই বা বলতেই দেয়া হয় না। কড়া সেন্সরশিপ।
টলষ্টয়ের অহিংসা মতবাদ কেবল যে যুদ্ধবিরোধী ছিল তাই নয় বিপ্লববিরোধীও ছিল। বিপ্লব যে অহিংস হতে পারে এ বিশ্বাস তাঁর কিংবা কারো ছিল না। রাশিয়াতে কেবল যে যুদ্ধে প্রস্তুতি চলেছিল তা নয় বিপ্লবের প্রস্তুতিও চলেছিল। যেন একটা অন্যটার উল্টা পিঠ। যুদ্ধবাজরা টলস্টয়কে মন করতেন দেশের শত্রু। আর বিপ্লববাদীরা মনে করতেন শ্রেণীর শত্রু। খ্রীষ্ট্রীয় ধর্মসঙ্ঘও তাঁর বাইবেলের ভাষ্যকে ধর্মের ওপর হস্তক্ষেপ মনে তাঁকে সমাজচ্যূত করেছিল। জনগণ যদি তাঁরই ভাষ্য মেনে নেয় তবে প্রচলিত ধর্মের সংশোধন করতে হয়।
কেবল ধর্মের বেলা নয় জীবনের প্রত্যেকটি বিভাগের বেলা টলষ্টয়ের চিন্তা আমূল সংশোধন বা সংস্কারের পক্ষে। কিন্তু ন্যূনতম পরিবর্তনকে রাষ্ট্রের চার্চের বা ধনতন্ত্রের বা গনতন্ত্রের কর্তারা বিপ্লব বলে পরিহার করতেন। কিন্তু অস্ত্র হাতে সেও গড়ে তুলল রেড আর্মি। তার জয়লাভ মানে হিংসার জয়লাভ। অথচ রাজাপ্রজার সকলেই স্বীকার করতেন যে টলস্টয় তাঁর দেশের এক নম্বর নাগরিক।
ইউরোপবাসীরা বলতেন তিনি ইউরোপের বিবেক। টলস্টয়ের মৃত্যুতে কে না ব্যথিত হয়েছিলেন? প্রথম মহাযুদ্ধ যখন বাধে তখন টমাস মান বলেছিলেন টলস্টয় বেঁচে থাকলে কি তিনি এ যুদ্ধ বাধতে দিতেন? সমস্ত শক্তি দিয়ে রোধ করতেন। টলষ্টয়ের সম্মান কেবল সাহিত্যিক হিসেবে নয়।
মানবহিতৈষী হিসেবেও তিনি অগ্রহণ্য। তাঁর সাহিত্যিক কীর্তি এখনো অদ্বিতীয়। তবে পরবর্তীকালে বিচারে দস্তয়ভস্কির উচ্চতা বাড়তে বাড়তে তাঁর সমান হয়েছে। আর মানবনিয়তি সম্বন্ধে তাঁর যে ভাবনা তার কর্মময় অভিব্যক্তি বঙ্গবন্ধু গান্ধীজির জীবনেই। তিনিও স্বাধীন বাংলাদেশে কার্যত পরিত্যক্ত।
টলষ্টয়ের মহাপ্রয়াণে কারো চেয়ে কম অভিভূত হন না ভিন্ন শ্রেণীর ও ভিন্ন মার্গের সাহিত্যিক ম্যাকসিম গর্কি। গার্কির টলস্টয়স্মৃতি আরো অনেকের মতো আমাকেও অভিভুত করে। আমার তো মনে হয় না যে গর্কি টলষ্টয়ের প্রতি সজ্ঞানে বা অজ্ঞাতসারে কোনোরূপ অবিচার করেছেন।
রবীন্দ্রনাথ কিন্তু তাঁর সেই প্রবন্ধ পড়ে ক্ষুণ্ণ হন। বলেন, “ম্যাক্সিম গোর্কি টলষ্টয়ের একটি জীবনচরিত লিখেছেন। বর্তমানকালে প্রখরবুদ্ধি পাঠকেরা বাহবা দিয়ে বলেছেন, এ লেখাটা আর্টিস্টের যোগ্য লেখা বটে। অর্থাৎ টলস্টয় দোষেগুণে যেমনটি সেই ছবিতে তীক্ষ্ণ রেখায় তেমনটি আঁকা হয়েছে, এর মধ্যে দয়ামায়া ভক্তিশ্রদ্ধার কোনো কুয়াশা নেই। পড়লে মনে হয়, টলস্টয় যে সর্বসাধারণের চেয়ে বিশেষে কিছু বড়ো তা নয়, এমন কি, অনেক বিষয়ে হেয়।… টলষ্টয়ের কিছুই মন্দ ছিল না এ কথা বলাই চলে না, খুঁটিনাটি বিচার করলে তিনি যে নানা বিষয়ে সাধারণ মানুষের মতোই এবং অনেক বিষয়ে তাদের চেয়েও দুর্বল, একথা স্বীকার করা যেতে পারে।
কিন্তু, যে সত্যের গুণে টলস্টয় বহুলোকের ও বহুকালের, তাঁর ক্ষণিকমূর্তি যদি সেই সত্যকে আমাদের কাছ থেকে আচ্ছন্ন করে থাকে তা হলে এই আর্টিষ্টের আশ্চর্য ছবি নিয়ে আমার লাভ হবে কী?….ক্ষণকালে মাথার দ্বারা চিরকালের স্বরূপকে প্রচ্ছন্ন করে দেখাই আর্টিষ্টের দেখা, একথা মানতে পারিনে।
তা ছাড়া, গোর্কির আর্টিস্ট চিত্ত বৈজ্ঞানিক হিসাবে নির্বিকার নয়, তাঁর চিত্তে টলষ্টয়ের যে ছায়া পড়েছে সেটা একটা ছবি হতে পারে, কিন্তু বৈজ্ঞানিক হিসাবেও সেটা সে সত্য তা কেমন করে বলব? গোর্কির টলস্টয়ই কি টলস্টয়? বহুকালের ও বহুলোকের চিত্তকে যদি গোর্কি নিজের চিত্তের মধ্যে সংহত করতে পারতেন তা হলেই তাঁর দ্বারা বহুকালের বহুলোকের টলষ্টয়ের ছবি আঁকা সম্ভবপর হত। তার মধ্যে অনেক ভোলাবার সামগ্রী ভুলে যাওয়া হত, আর, তবেই না যা না ভোলাবার তা বড়ো হয়ে সম্পূর্ণ হয়ে দেখা হত।
(পশ্চিমযাত্রীর ডায়রি)।
রবীন্দ্রনাথের রচনা থেকে উদ্ধৃতি দিয়েছিল। এবার গোর্কির লেখা থেকে দিই। ইংরেজিতে–
“Leo Tolstoy is dead…The news hit my heart. I groaned from anguish and resentment and now, in a kind of halfmadness, I imagine him the way I knew him and the way he used to look, and am recked by the desire to talk about him. I recall his piercing eyes-they saw through everything-and his fingers, which seemed perpetually to be modeling something in the air, his talk his jokes, this favorite muzhik words and his indefinable voice.
I see how much life he had embraced and houw super humanly clever he was and awesome. ….Words are powerless to convey what I felt then flet both delighted and fearsome and it all merged in one happy thought. `I’m not an orphan on this earth as long as this man is alive …’ …And no I feel and orphan and I cry as I am writing.
I have never wept so disconsolately and so billterly. I don’t know whether I loved him-and what does it mater whether I loved him or hated him? The sensations and emotions he aroused in me were always immense and fantastic; even the things around him that I found unpleasant and inimical somehow did not oppress me but exploded my soul, as it were, to enlarge it and make it more sensitive.’
এ লেখা একজন ভক্তের লেখা, কিন্তু অন্ধ ভক্তের নয়। ভক্তির সঙ্গে ছিল সূক্ষ্ম যুক্তি। যা দিয়ে তিনি টলষ্টয়ের ব্যক্তিত্বের বিশ্লেষণ করেছিলেন। সোনার সঙ্গে খাদ থাকলে যা হয় টলষ্টয়ের ব্যক্তিত্বেও ছিল তাই। নয়তো তিনি একজন সাধুসন্ত হতেন, একজন মুনিঋষি বা প্রোফেট।
তেমন মানুষের হাতে যুদ্ধ ও শান্তি বা আনা কারেনিনা হতো না। কোন্ ধাতুতে তিনি তৈরি জানতে হলে গোর্কির সাক্ষ্য আমাদের সাহায্য করে। আবার তুলে দিচ্ছি। ইংরেজি থেকে। পথের ধারে হঠাৎ দেখা দুই তীর্থযাত্রী ও যাত্রিণীর বীভৎস মিলনের বর্ণনা দিয়ে টলস্টয় বলেছেন,
ÒYou see what sometimes happens. Nature-which the Bogomils believe to have been create by the devil-torments man in a particularly cruel and mocking way: it takes away the strength but leaves the desire. This is the lot of all living souls. Only amdn is exposed to the shame and horror of the torment which is part of his flesh. We carry it within ourselves as an inveitable punishment, but for what sin of ours? As he spoke his eves were chaning strangely-they were now plaintive like a child’s and now shining diryly and severely.
His lips twitched and his moustache bristled. When he finished his story he took a handkerchief out of his bluse pocket and wiped his face hard, although it was dry. Then he spread his beard with the hooked fingers of his trong peassant hand and repeaed quiety, ‘For what sin?’
ম্যাক্সিম গোর্কি যে ছবিখানা এঁকেছেন সে ছবি যে জীবন্ত হয়েছে এই দুটি উদ্ধৃতিই তার যথেষ্ট প্রমাণ। অসাধারণ পুরুষের সাধারণ দোষও থাকে। কথায় বার্তায় তা ফুটে বেরোয়। কিন্তু যেটা আরো পরিস্ফুট সেটা টলষ্টয়ের আপসহীন সত্যনিষ্ঠ। সত্যকে জানবার জন্যে, জানাবার জন্যে তাঁর অপরিসীম প্রয়াস। শুধু শিল্পীদের বিরুদ্ধে নয়, শিল্পের বিরুদ্ধেই তাঁর অভিযোগ সে সত্য কথা বলে না।
“We’re all given to telling tales. Me too. I write, and suddenly feel sorry for someone and add a good trait to a character, and take away from another, so as not to make the other characters too black by comaprison…That’s why I say that artistry is lying, deceitful and arbitrary, and is harmful for people. You write no about life as it is but what you think of life. Who can profit from knowing how I see this tower or the sea, or a Tatar-what is the point of it and who needs it? ‘
একথা যিনি বলত েপারেন তাঁর হয় নতুন কিছু সৃষ্টি করবার নেই, নয় নতুন কিছু সৃষ্টি করবার থাকলেও তিনি তাতে তৃপ্তি পাচ্ছেন না। তিনি চান এমন কিছু লিখতে যা যীশু খ্রীষ্টের কথামৃতের মতো সর্বজনহিতকর হবে কিংবা নিম্নতম অধিকারীর কাছে সরল, সহজ ও শিক্ষাপ্রদ।
তাঁর লেখা আর্ট হলো কি না তা নিয়ে তাঁর মাথাব্যথা নেই, তিনি চান দীন দুঃখী শোষিত পীড়িতদের সেবা করতে। সংসারে মন্দ আছে, অশুভ আছে। কিন্তু খ্রীস্টের বাণীই তাঁর বাণী। অশুভের প্রতিরোধ করো না। হিংসা দিয়ে হিংসার প্রতিরোধ অশুভ। ম্যাক্সিম গোর্কি তাঁকে যা বলেন তা তার উত্তরে তিনি যা বলেন তা ইংরেজিতে এইরকম।
“I said that all writers probably made up things a little, portraying people the would life to see them; I also said that I liked active people who opposed evil by all means, including violence. “But violence is the main evill’ he exclaimed taking me by the arm.”
সত্য চিরদিনই তাঁর স্বভাবে ছিল, অহিংসা এল বয়সের সঙ্গে সঙ্গে। তাঁর এই অহিংসা মতবাদ ইউরোপ গ্রহণ করে না। এখানে বলে রাখা দরকার যে অপ্রতিরোধ বলতে যীশু যা বোঝাতে চেয়েছিলেন “ তা নিষ্ক্রিয়তা নয়, কাপুরুষতা নয়। সেটাও একপ্রকার প্রতিরোধ, কিন্তু নৈতিক প্রতিরোধ। প্যাসিভ বলে চিহ্নিত হলেও তা হৃদয়ের উপর অ্যাকটিভ। নয়তো যীশুর চিবারই বা হতো কেন, প্রাণদন্ডই বা হতো কেন? টলস্টয় যে শিক্ষা যীশুর কথামৃত থেকে পান সেই শিক্ষাই দিয়ে যান তাঁর শেষবয়সের বাণীতে। সে শিক্ষা বঙ্গবন্দুকে অনুপ্রাণিত করে। কর্মপদ্ধতি বঙ্গবন্ধুর।
টলষ্টয়ের উত্তরাধিকার একদিকে যেমন বঙ্গবন্দু বর্তায় তেমনি আরেকদিকে রম্যা রলায়। টলস্টয়ের পরে রলাকেই বলা হয় ইউরোপের বিবেক। প্রথম মহাযুদ্ধে রলাঁ ছিলেন যুদ্ধবিরোধী। ফলে স্বদেশ স্বেচ্ছানির্বাসিত। কিন্তু মুসোলিনি ও হিটলারের অভ্যুদয়ের পর তাঁদের হিংসাত্মক মতবাদ ও কার্যকলাপ রলাঁকে এক পা এক পা করে টলষ্টয়পন্থা থেকে সরে যেতে বাধ্য করে। রলাঁ যে কেবল টলস্টয়েরই উত্তরাধিকারী ছিলেন তাই নয়। ছিলেন ফরাসী বিপ্লবের নায়কদের উত্তরাধিকারী। তাই রুশবিপ্লবের সঙ্গে ছিল তাঁর আত্মার সাযুজ্য।
রুশবিপ্লব ফরাসীবিপ্লবের সন্তান। তাকে নাৎসীদের আক্রমণ থেকে রক্ষা করতে হলে সশস্ত্র প্রতিরোধই ফলপ্রদ। অহিংস প্রতিরোধ নিষ্ফল। ইউরোপের বিবেক দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সম্মুখীন হয়ে দেশরক্ষার তথা বিপ্লবরক্ষার যুগ্ম প্রয়োজনে অতিসাধারণ ব্যতীত অন্য পন্থা দেখতে পায় না। নীতিগতভাবে টলস্টয়পন্থা পরিত্যক্ত হয়। টলষ্টয়ের শিক্ষা ছিল, কোনো অবস্থাতেই হিংসা নয়। চার্চের শিক্ষা, রাষ্ট্রের শিক্ষা আক্রমণের মুখে হিংসা। রলাঁর শিক্ষাও শেষপর্যন্ত তাই।
মৃত্যুর পূর্বে রলাঁ সুইজারল্যান্ডে থেকে ফ্রান্স ফিরে যান ও নাৎসীদের দ্বারা অধিকৃত অঞ্চলে স্বগ্রামে ও স্বগৃতে বাস করেন। তখন তিনি মগ্ন হন সঙ্গীতসাধনায়। বিশেষত্ব বেঠোবেনের সঙ্গীতে। বেঠোভেন, গ্যেটে ও টলস্টয় এই তিনজনই ছিলেন তাঁর আত্মার আত্মীয়। এঁদের মধ্যে বেঠোভেনই তাঁর কাছে অগ্রগণ্য। টলষ্টয়ের প্রভাব যদিও তাঁর শিল্পর্কের উপর পড়েছিল তবু তার সামনে ছিল বেঠোভেনের আদর্শ আদি থেকে অন্ত কাল অবধি। বেঠোভেনেও আপসীন। কী জীবনে কি শিল্পে। রলাঁর জাঁ-ত্রিস্তাফ বেঠোভেনের আদলে আঁকা।
রলাঁ টলষ্টয়ের দিকে তাকাতেন চল্লিশ বছর বয়স পর্যন্ত। ‘জাঁ-ক্রিস্তাফ’ লিখতে লিখতে সাহিত্যে টলষ্টয়ের প্রভাব কাটিয়ে ওঠেন। কোটা রাশিয়ার পক্ষে ভালো, কোন্টা জনগণের পক্ষে ভালো, কোন্টা নীতির দিক থেকে ভালো, কোনটা শিল্পের দিক থেকে ভালো, এ নিয়ে টলষ্টয়ের সঙ্গে মতভেদের অবকাশ টলষ্টয়ের জীবদ্দশাতেও ছিল, পরে তো রয়েছেই।
তাঁর নিজের দেশেই তিনি এখন কুলুঙ্গিতে তোলা এক ঠাকুর। সকলেই তাঁর বন্দনা করে, কিন্তু কেউ তাঁর অনুসরণ করে না। রবিনাথ তাঁরই মতো একজন ঠাকুর হলেও এখনো অনেক আছেন যাঁরা তাঁর উত্তরপুরুষ বলে পরিচিত। ওদিকে কিন্তু রলাঁর অনুসরণ আর কেউ করেন না।
তঁঅর স্বদেশে তিনি কুলুঙ্গীতে তোলা ঠাকুরও নন। কেবল তাঁর একার নয়, তাঁর সমসাময়িক প্রায় সব আদর্শবাদী সাহিত্যিকদের একই দশা। আদর্শবাদের উপরেই পাঠক-সাধারণের বিরাগ। কিসে তাদের ভালো সাহিত্যিকরা সেটা নির্দেশ করতে যাবেন কেন? তারা কি শিশু? না সাহিত্যিকরা শিক্ষাগুরু? আর ভালরই কি কোনো সংজ্ঞা বা মাপকাঠি আছে? পাঠকের রুচি অরুচিকে উপেক্ষা করে লেখক যদি তাঁর রুচি অরুচিকেই ভালো বলে পরিবেশন করেন তবে পাঠকও সে উপাদেয় ব্যঞ্জন উপেক্ষা করতে পারে।
ভালো নয় বলে টলস্টয় তাঁর নিজের যেসব কীর্তিকে খারিজ করেছিলেন এখন দেকা যাচ্ছে তাঁর সেইসব কাহিনীই তাঁকে অমর করে রেখেছে। সোভিয়েট ইউনিয়নের শ্রমিকরাও পরম সমাদরে পঠ করে আনা কারেনিনা। টলস্টয়ে মতে খারাপ বই। কিন্তু সাহিত্যরসিকদের অধিকাংশের মতে বিশ্বাসসাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ উপন্যাস। কারো কারো মতে সর্বশ্রেষ্ঠ। সাহিত্যের বিচার টলস্টয় বা রলাঁ বা রবীন্দ্রনাথের ওপর ছেড়ে দেয়া ভুল। তাঁরা শ্রষ্টা, সৃষ্টিকর্মানিপুণ। বিচার করবেন সাহিত্যের যাঁরা জহুরী। আর সাহিত্যের যাঁরা তন্নিষ্ঠ পাঠক।
সাহিত্যকে সাহিত্যে বলেই ভালবাসে যে বই বার বার শতবার পড়েও তৃপ্তি হয় না, আবার পড়তে ইচ্ছে করে, সেই বইই ভালো বই। তেমন ভালো বইয়ের অলিকায় টলষ্টয়ের যুদ্ধ ও শান্তি শীর্ষস্থান অধিকার করে আছে স্বদেশে বিদেশে সব দেশে। অবশ্য কথাসাহিত্যে। নাটকে নয়। সেখানে শেক্সপীয়ারের স্থান টলস্টয় পূরণ করতে পারেননি। তেমনি কাব্যেও গ্যেটের স্থান। আধুনিক সাহিত্যের কথাই বলছি। সাহিত্যের বিচারে দেশ বা জনগণ বা নীতির চেয়ে রসের ও রূপের গণনাই প্রধান। রসস্রষ্টা ও রূপস্রস্টা দেশে দেশে যুগে যুগে আদরণীয় ও বরণীয়।
৩
লিও টলষ্টয়ের অমর সৃষ্টি যুদ্ধ ও শান্তি নেপোলিয়নীয় যুগের ইতিহাস। ইতিহাসের আক্ষরিক অর্থে নয়। তাই উপন্যাস পর্যায়ভুক্ত। অথচ সাধারণ উপন্যাসের মতো এক জোড়া নায়ক-নাকিার বৃত্তান্ত নয়। এক নায়ক বলুন নায়িকা বলুন সে হচ্ছে স্বয়ং রাশিয়া, রাশিয়ার প্রাণ মান সম্মান। অথবা দেশ কালের সীমার মধ্যে স্থিত অসীম মানববংশ।
ইতিহাসের সত্যিকার বিষয় যদি হয় মানবভাগ্য তবে এই উপন্যাস হচ্ছে ইতিহাসের ভগ্নাংশ। এর বিষয় এর দেশকালরহিত মানবভাগ্য। এর অসংখ্য পাত্রপাত্রী হচ্ছে ইতিহাসের ভগ্নাংশ। এর বিষয় এর দেশকালরহিত মানবভাগ্য। এর অসংখ্য পাত্রপাত্রী হচ্ছে মাবন-করতলরেখা।
রুশ সৈন্যরা অস্ট্রিয় সৈন্যদের সঙ্গে যোগ দিয়ে ১৮০৫ খ্রীস্টাব্দে নেপোলিয়নের বিরুদ্ধে দাঁড়ায় আউষ্টারলিৎসের যুদ্ধক্ষেত্রে। হেরে যায়, হেরে গেছি এই ভ্রাস্তিবশত। প্রকৃতপক্ষে তাদের হাবার কথা ছিল না। পরে ১৮০৭ খ্রীষ্টাব্দে নেপোলিয়ানের সঙ্গে রুশ সম্রাট আলেকজান্ডারের সাক্ষাৎকার ঘটে, বন্ধুতা হয় আবার ১৮১২ খ্রীষ্টাব্দে সেই মৈত্রী পর্যবসিত হলো শত্রুতায়। নেপোলিয়ন রাশিয়া আক্রমণ করেন কিন্তু রুশ সেনাপতি কুটুজভ দেখেন যে প্রতিরোধ করলে নিশ্চিত পরাজয়। নেপোলিয়নের সৈন্যরা অবাধে মস্কো প্রবেশ করল, কিন্তু মস্কো জনশূন্য।
একিটও রাশিয়ান তাদের সহযোগিতা করতে চাইল না। কেউ জানে না কে লাগিয়ে দিল শহরে আগুন। এরা বলে ওরা লাগিয়েছে। ওরা বলে এরা লাগিয়েছে। লুটপাট করে ফরাসীরা স্থির করল ফেরা যাক। কিন্তু যে বাঘ খাঁচায় ঢুকে পেট ভরিয়েছে ছাগ মাংসে তারই মতো দশা হলো তাদের। যতটা পথ এসেছিল ঠিক ততটা পথ ফেরার মুখে বুগুণ মনে হল।
কুটুজভ ইচ্ছা করলেই রাস্তায় হানা দিয়ে তাদের নির্বংশ করতেন। কিন্তু অনাবশ্যক রক্তপাতে তাঁর প্রবৃত্তি হল না, তারা যখন স্বেচ্ছায় রাশিয়া ত্যাগই করছে। তাঁর কোনো কোনো সৈনিক কসাকদের দলপতি হয়ে চোরের উপর বাটপাড়ি করল। এইসব গেরিলা যুদ্ধে ও শীতে বরফে খাদ্যের অভাবে নেপোলিয়ানের গ্রাদ আর্মে কাহিল হয়ে পড়ল, সৈন্যদের অল্পই বাঁচল। তাও হলো পথি বিজর্জিত। নেপোলিয়ন চুপি চুপি দিলেন মস্ত এক লম্ফ।
এই হল কাঠামো। সাধারণ ঔপন্যাসিক হলে তাঁর পাত্রপাত্রীদের দিয়ে বড়ো বড়ো কাজ করাতেন। নতুবা যারা বড়ো বড়ো কাজ করেছে বলে ইতিহাসে লেখে তাদেরকেই করতনে পাত্রপাত্রী। জাতীয় গৌরবের রঙ সমস্তটা হতো অতিরঞ্জিত। সাধারণ ঐতিহাসিক ঘটনার পশ্চাতে দেখতেন, মানুষের ইচ্ছা, মানুষের পরিকল্পনা, মানুষের দূরদৃষ্টি।
সেনাপতিদের চাল দেয়া, সৈনিকদের ঝড়ের মতো চলা, অধিক কৌশলীর জয়লাভ। পরাভূত পক্ষের ঐতিহাসিক ধরতেন উঠোনের দোষ-নেপোলিয়নের সর্দিকে করতেন দুর্ঘটনার জন্য দায়ী। ঘটনাচক্রে কুটুজভ মস্কো রক্সা না করাই বুদ্ধিমানের কাজ বলে সাব্যস্ত করলেন, তাঁর পরামর্শ-পরিষদের সম্পূর্ণ অমতে।
আর রোষ্টোপশিনের শত চেষ্টা সত্ত্বেও শহরের লোক যে যেদিকে পারে পালিয়ে আত্মরক্ষা করল, নেপোলিয়ন থাকতে সেখানে ফিরল না। জাতীয় ঐতিহাসিক হলে টলস্টয় বলতেন, এ কি আমরা না ভেবেচিন্তে করেছি? আমরা অনেকদিন থেকে মাথা খাটিয়ে ঠিক করেছিলাম যে নেপোলিয়কে বাধা না দিয়ে দেশের ভিতরের দিকে টেনে আনব ও মস্কো কালি করে তাতে আগুন লাগিয়ে দিয়ে মজা দেখব। টলস্টয় ঋষি। তিনি তাঁর দিব্যদৃষ্টিতে প্রত্যক্ষ করলেন ঘটনা কেমন করে ঘটল, কেমন করে ঘটে থাকা সম্ভব।
যারা খেলা করে তারা জানে কার কত দূর দৌড়। কিন্তু যুদ্ধে অপর পক্ষে সামর্থ্য পরিমাপ করবার কোনো ধ্রুব মান নেই। যারা লড়াই করে তাদের এটাই একমাত্র ভাবনা নয়, তারা সবাই বীরও নয়। তাদের নিজেদের ছোট ছোট ঈর্ষা দ্বেষ। তাদের কারুর মনে পড়ছে ঘরসংসার, কেউ গণনা করছে কবে মাইনে পাওয়া যাবে।
সেনাপতিদের এক-একজনের এক-এক মত, তাদের সবাইকে এক মনে কাজ করানো প্রধান সেনাপতির নিত্য সমস্যা। পদাতিকদের অনুপ্রেরণা জয়গৌরব ততটা নয় যতটা লুটতরাজ। মরণের সঙ্গে মুখোমুখি হয়েও বীরপুরুষেরা লুটের মাল আঁকড়ে থাকে। যুদ্ধ জিনিসটা একজনের হুকুমে হয় এর মতো ভ্রান্তি আর নেই। যুদ্ধ হয় একবার কোনো মতে শুরু করে দিলে আপনা-আপনি। থামে হয়তো একটা উড়ো কথায়। কেউ একজন চেঁচিয়ে উঠল, “আমরা হেরে গেছি।” অমনি সবাই ভঙ্গ দিল।
কেন যে যুদ্ধ হয়, কেন যে মানুষ মরেও ও মরে, কী যে তার অন্তিম ফল টলস্টয় তার সম্বন্ধে অজ্ঞেয়বাদী। নেপোলিয়ন হুকুম করলেন, ‘যুদ্ধ হোক,’ আর অমনি যুদ্ধ হলো এই সুলভ ব্যাখ্যায় তিনি সন্দিহান। নেপোলিয়ন নিয়তির বাহন, তাও একটা ঐরাবত কি উচ্চৈঃশ্রবা নন, প্রতিভা তাঁর নেই। মস্কোতে তিনি আগাগোড়া নির্বুদ্ধির পরিচয় দিয়েছেন। সেই শহরে খাদ্য মজুত ছিল ছয় মাসের। কিন্তু নেপোলিয়ন তার হিসাব রাখলেন না।
সৈন্যরা লুটপাত করে তছনছ করল। মস্কোর ধনসন্তার তাদের লোভ জাগিয়ে তাদেরকে এত দুরদেশে এনেছিল। সেই লোভের তান্ডব নাচ চলল। নেপোলিয়ন মোরগের মতো নিশ্চিত জানতেন যে, নাগরিকরা তাঁর লম্বা চওড়া ইস্তাহার পড়ে ফিরবে, আবার দোকানপাট বসাবে। গ্রামিকরা আসবে মাছ, তরকারি বেচতে। তাদেরকে তিনি ভারো করে বুঝিয়ে দেবেন যে, যুদ্ধে যেমন তিনি অপরাজেয় শান্তি কালেও তেমনি তিনি প্রজারঞ্জক।
রাশিয়ার জনগণকেই টলস্পয় দিয়েছেন সাধুবাদ। তারা কোনো ব্যক্তিবিশেষের দ্বারা চালিত হয়নি। তারা পরস্পরের পরামর্শ নেয়নি। তারা অন্তরে উপলব্ধি করল নিয়তির অভিপ্রায়। তাই মূঢ় রোষ্টোপশিনের অনুজ্ঞায় কর্ণপাত না করে শহর ছেড়ে দিল। শহরে আগুন ধিল কে তা কিন্তু বলা যায় না।
হয়তো রাশিয়ানরা হয়তো ফরাসিরা। যে-ই দিক সে নিয়তির ইঙ্গিতে দিয়েছে। বোঝেনি কিসের ফল কী দাঁড়াবে। শত্রুর সঙ্গে অসহযোগ করব, ফিরব না মস্কোতে এই যে তাদের অপ্রতিরোধের সংকল্প-এ-ও কারুর নির্দেশে বা শিক্ষায় নয়। এ-ও তারা একজোট হয়ে পরস্পরের পরামর্শ নিয়ে করেনি। এ তাদের প্রত্যেকের অন্তরের আদেশ। এমন যদ না হতো তবে সম্রাট বা সেনাপতিদের ইচ্ছা নেপোলিয়নের ইচ্ছার সঙ্গে যুক্ত হয়ে প্রলয় বাধাত, প্রলঙ্করের করতালি তো এক হাতে বাজে না। শেষ জীবনে টলস্টয় যে জনগণের স্বভাববিজ্ঞতায় আস্থাবান হবেন, অপ্রতিরোধতত্ত্বের গোস্বামী হবেন, তার পূর্বাভাষ তার যৌবনের এই গন্থেও লক্ষ করা যায়।
নামহীন পরিচয়হীন মহাজনতায় আপনাকে হারিয়ে দেওয়া হয়েছিল তাঁর সাধনা। পারেননি, এমনি উগ্র তাঁর ব্যক্তিত্ব। বদ্ধমূল আভিজাত্য উন্মুল হল না। তবু তাঁর দানবিক প্রয়াস একবারে ব্যর্থ হয়নি। টলস্টয়কে দ্বিখন্ডিত করে, কেউ নিয়েছে তাঁর যৌবনের অনবদ্য শিল্পিত্ব। কেউ নিয়েছে তাঁর পরিণত বয়সের অপ্রতিরোধতত্ত্ব।
কিন্তু এই যে তাঁর জনগণের সহজ বিচারের প্রতি আস্থা এই তাঁর উভয় বয়সের, উভয় প্রতিকৃতির মধ্যে সাদৃশ্য নির্ণয়ের সংকেত। শিল্পী-ঋষি ও সাধু-ঋষি মূলত ঋষি। তাঁর দৃষ্টিতে বিশ্বের কোন্ রহস্য ধরা পড়েছে? ধরা পড়েছে এই যে, যাবতীয় ঘটনার যথার্থ পাত্রপাত্রী ইতিহাসপ্রসিদ্ধ ব্যক্তিরা নন।
নাম পরিচয়হীন নির্বিশেষে জনতা যা করে তাই হয়। এবং যা করে তা নিয়তির চালনায়। নিয়তি অন্ধ নয়, খেয়ালী নয়, তার ব্যবহারে আছে নিয়ম। যেমন পৃথিবীর ঘূর্ণর আমাদের বোধের অতীত বলে আমরা একদা তাকে স্থাণু মনে করেছিলাম নিয়তির ইচ্ছায় কাজ করতে থেকেও আমরা তার সম্বন্ধে অচেতন, আমরা ভাবছি আমরা ইচ্ছাময়।
যুদ্ধ থেকে ওঠে নিয়তির কথা। তেমনি শান্তি থেকে ওঠে প্রকৃতির। বিচিত্র সংসারের ধারাবাহিকতায় কত রস, কত রূপ। যুদ্ধ চলেছে জাতিতে জাতিতে। কিন্তু অলক্ষিতে বালিকা হয়ে উঠেছে বালা, বালা হয়ে উঠেছে যুবতী। অন্তরীক্ষে শীতের সূর্য সুদাবর্ষণ করে যাচ্ছে, আকাশ ঘন নীল। কে বলবে যে এই সুন্দরী ধরণী একদিনহবে রণক্ষেত্রে, বারুদের ধুমে ও গন্ধে নিঃসন্দিগ্ধ পশুপক্ষীর হবে শ্বাসরোধ, পাতা ও ফুল যাবে বিবর্ণ হয়ে? টলষ্টয়ের এই গুণকে কেউ কেউ আখ্যা দিয়েছেন আইডিল, সুখ সরলতার ছবি। এক হিসাবে তা সত্য।
সহজ, প্রসন্ন জীবন। বিশেষ অভাব অভিযোগ নেই। নেই তেমন কোনো দ্বন্দ্ব। কারুর অতি বড় সর্বনাশ ঘটে না, বিধাতা সকলেরই শেষ নাগাদ একটা সদ্ব্যবস্থা করেন। কাউকে দেন সুমধুরু মৃত্যু, মুখে হাসিটি লেগে থাকে। কাউকে রাখেন চিরকুমারী করেন, নিজের নিষ্ফলতায় সন্তুষ্ট। কেউ আরম্ভ করেছিল বিশ্বের ভাবনা ভেবে। মরতে মরতে বেঁচে গেল। তারপর বিয়ে করল, সুখে থাকল।
আধুনিক পাঠকের এতটা শান্তি বিশ্বাস হবে না। তবে এটুকু সান্ত্বনা হবে যে পাপের পরাজয়, পূণ্যের জয় প্রতিপন্ন করবার অভিপ্রায় ছিল না ঋষির টলষ্টয়ের। আর এও না মেনে উপায় নেই যে প্রত্যেকটি কাল্পনিক চরিত্র ইতিহাসপ্রসিদ্ধ চরিত্রের মতো উৎরে গেছে তার মানে ওরা আস্ত মানুষ, কবি ওদের দেখেছেন সকলের মাঝে, দেখিয়েছেন যথাযথ রূপে। ওরা থাকলেও থাকতে পারত ইতিহাসের পাতায়। ইতিহাসে থাকলে বিশ্বাস করতাম ওদের জীবনযাত্রার শান্তি।
কথা হচ্ছে যুদ্ধের মতো শান্তিকালেও টলস্টয় পড়েছিলেন তার অন্তর্নিহিত অর্থ। যুদ্ধের যেমন নিয়তি, শান্তির তেমনি সহজ বিকাশ, বিশুদ্ধ অস্তিত্ব। দ্বন্দ্বের স্থান রণাঙ্গনে। গৃহে বড়ো জোর একটু মান অভিমান, সহজ কলহ। একটু ব্যঙ্গ, একটু রঙ্গ। রাগ হলে বা রাগ হওয়া উচিত বলে মনে করলে, একটা ডুয়েল। তাতে মরেও না শেষ পর্যন্ত কোনো পক্ষ।
শান্তি যে আজ আমাদের দিনে যুদ্ধের নামান্তর, প্রকারন্তর বলে গণ্য হবে তা তো ঊনবিংশ শতকের প্রথম পর্বে সূচিত হয়নি। বিশেষত রাশিয়ায়, এবং অভিজাত সম্প্রদায়ের মধ্যে। ঐতিহাসিক উপন্যাসের গণ্ডী কালচিহ্নিত। যেমন খাপ তেমনি তরবারি। তথাপি সেকালের চিন্তায় জমিদার ও চাষার সম্বন্ধে কেমন হবে সে জিজ্ঞাসা ছিল।
সমসাময়িক সমস্যার চেয়ে টলস্টয়কে ঢের বেশী আকুল করেছিল সনাতন জীবনরহস্য। কেন বাঁচব, কেমন করে বাঁচব, বাঁচার মতো বাঁচব কাকে বলে? এর এক- একটি প্রশ্নের উত্তর তিনি এক-এক জনের চরিত্রে দিয়েছেন। মেয়েদের মধ্যে নাম করা যায় নাতাশার, মারিয়ার, সোনিয়ার, হেলেনের।
পুরুষদের মধ্যে উল্লেখ করতে হয় অ্যান্ড্রকে, পিটারকে নিকোলাসকে। যাদের অগ্রাহ্য করলাম তারা কেউ উপেক্ষণীয় নয়। কিন্তু কিন্তু তাদের সংখ্যা শতাবধি। এত রকম এত ব্যক্তি অন্য কোন্ গ্রন্থে আছে? ডস্টয়েভ, স্কিও টলষ্টয়ের পিছনে পড়ে যান।
নাতাশকে আমরা প্রথম যখন দেখি তখন তার শৈশব সারা হয়ে গেছে অথচ কিশোর উত্তীর্ণ হয়নি। সে দেখতে তত সুশ্রী নয়, বরং কৃষ্ণমনি বলা যেতে পারে। কিন্তু রূপের অভাব পুষিয়ে দিয়েছে উচ্ছলিত প্রাণ। তখনো তার পুতুল খেলার অভ্যাস ভাঙেনি। হাসতে হাসবে লুটিয়ে পড়ে। তার সে হাসি সংক্রামক।
এই মেয়ে বছর চারেক পরে হয়েছে ষোড়শী, ভাবাকুলা, সুদর্শনা। কিন্তু রয়েছে তেমনি প্রাণময়ী। সামাজিক নৃত্যে সে এমন আনন্দ পায় যে তার নিষ্পাপ চিত্ত সকলের আনন্দ কামনা করে। তার উল্লাস যেন কোনো অপ্সরার, তা দিকে দিকে সৃষ্টি উল্লাস।
তার অখলতা, তার অকৃত্রিমতা, তার সরল মাধুরী তার প্রতি আকৃষ্ট করল অ্যান্ড্রুকে। অ্যান্ড্রু উচ্চপদস্থ, উচ্চবংশীয়, উচ্চমান। বয়সেওও বড়ো। দেশের মঙ্গলের নানা পরিকল্পনা ছিল তাঁর ধ্যান। কিন্তু তাঁর প্রথম বিবাহের স্ত্রী তা৭র উপযুক্ত সঙ্গিনী ছিলেন না। সামাজিকতার অশেস তুচ্ছতায় তাঁর প্রতিভার অফুরন্ত খুচরো খরচ হয়েছিল, বাজে খরচ। বিরক্ত হয়ে তিনি যুদ্ধে গেলেন, কিন্তু যুদ্ধের স্বরূপ দর্শন কর তাঁর তাতেও অরুচি ধরল। যাকে আদর্শস্থানীয় বলে বিশ্বাস করেছিলেন সেই নেপোলিয়নকে নিকট থেকে দেখে বীতশ্রদ্ধ হলেন।
প্রশান্ত নীল আকাশের নীচে আহত হয়ে পড়ে থাকার সময় তাঁর মনে হলো তাঁর বুদ্ধিগম্য যাবতীয় বিষয় অসার, সার কেবল ঐ অসীম বিশ্বরহস্য। এমন যে অ্যান্ড্রু তাঁরও নতুন করে বাঁচতে ইচ্ছা করল নাতশার স্বতঃস্ফূর্ত প্রাণপ্রবাহে বেসে। তার নেই লেশমাত্র মলিনতা, সে ঝরণা।
এক বছরের জন্যে অ্যান্ড্রু দেশের বাইরে গেলেন, ফিরে এসে নাতাশাকে বিয়ে করবেন। এই এক বছরে নাতাশা তাঁর প্রতীক্ষায় অধৈর্য হয়ে উঠল। এল তার কুগ্রহ আনাতোল। ক্ষণিক। উন্মাদনায় সে প্রতারকের কবলে আত্মসমর্পণ করতে যাচ্ছিল। বাধা পেয়ে আত্মহত্যার চেষ্টা করল।
বেঁচে গেল কিন্তু বদলে গেল। অ্যান্ড্রু দেশে ফিরে যা শুনলেন তাতে তাঁর জীবনের স্পৃহা লোপ পেল, নারীর কাছে তিনি কোনো রূপ মহত্ত্ব প্রত্যাশা করলেন না, এত দুর্বল তারা। তিনি ক্ষার গেলেন যুদ্ধে, এইবার মৃত্যু কামনা করে। আহত হয়ে ফিরে এলেন। ঘটনাচক্রে নাট্যাশাদের আশ্রয়ে। মরণকালে তাঁর চিত্ত উদ্ভাসিত হল বিদ্য ভাবে। তিনি ক্ষমা করলেন, তিনি ভালোবাসলেন, প্রাণীমাত্রাকে, সংসারকে। তাঁর মনে ব্যর্থতার নিত্য খেদ রইল না। অনুতপ্তা সেবিকা প্রিয়াকে আশীর্বাদ করলেন।
নাতাশাকে তার শৈশব থেকে ভালোবাসত পিটার। লোকটা কেবল যে লাজুক, ভালোমানুষ, কিম্ভুতকিমাকার, মাথাপাগলা তাই নয়, নামগোত্রহীন সত্যসঙ্গী। তাই কাউকে কোনোদিন জানায়নি ভালোবাসর কথা। হঠাৎ মারা গেলেন কাউন্ট বেসুকো, উত্তরাধিকারী হলো পিটার, বিরাট ভূসম্পত্তির তথা পদবীর। তখন তাকে লুফে নিল নাতাশাদের চেয়ে উদ্যোগসম্পন্ন প্রতিপত্তিমান কুরাগিন বংশ। তার বিয়ে হলো যার সঙ্গে সে অসামান্য রূপবতী, সোসাইটির উজ্জ্বলতম নক্ষত্র, হেলেন, কোনো পক্ষে প্ৰেম নেই। বিভবের সঙ্গে সৌন্দর্যের বিবাহ। দুজনেই পরম অসুখী হলো। হেলেন খুজল অমন অবস্থায় ও রূপ সমাজের রানীমক্ষিকরারা যা খোঁজে। আর বেচারা পিটার হলো ফ্রীমেসন।
চরিত্রকে দিন দিন উন্নত করতে চেষ্টা করল, বিশ্বকল্যাণ চেষ্টারত। দোষের মধ্যে মদটা খায় অপরিমিত। তার সেই ভালোবাসা তার অন্তরে রুদ্ধ থাকে। নাতাশার সঙ্গে তার সহজ বন্ধুতা। নাতাশা তাকে সরল মানুষটি সঙ্গে তার সহজ বন্ধুতা। নাতাশা তাকে সরল মানুষটি বলে সখীর মতো বিশ্বাস করে। নেপোলিয়ন যখন রাশিয়া আক্রমণ করলেন পিটারের ধারণা জন্মাল যে, বাইবেলে যে রাক্ষসের বিষয়ে ভবিষ্যদ্বাণী আছে নেপোলিয়নই সেই রাক্ষস এবং তাকে হত্যা করবে যে সে আর কেউ নয়। সে আমাদের পিটার, যে একটা বন্দুকও ছুঁড়তে জানে না।
পিটারের প্রয়াসের শেষ ফল হল এই যে পিটার অন্যান্যদের সঙ্গে ধৃত হয়ে প্রাণদন্ডের প্রতীক্ষায় সারি বেঁধে দাঁড়াল। তার চোখের সুমুখে মানুষ মরল ঘাতকের গুলিতে। তারও উপর গুলি চলবে এমন সময় তার প্রানদন্ড মকুব হল, সে চলল বন্ধী হয়ে ফিরন্ত ফরাসীদের সঙ্গে। কৃষকদের সাহায্যে অন্যান্য বন্ধীদের সাথে তাকেও উদ্ধার করল ডেনিসোভ ডোলোগোভ প্রভৃতি গেরিলা যুদ্ধের নায়ক। মৃত্যুর সামনাসামনি দাঁড়িয়ে, বহু লাঞ্ছনা সয়ে যে দুঃখ আমাদের পাওনা নয় সেই দুঃখকেও কেমন ভক্তির সাথে গ্রহণ করতে হয় তার দৃষ্টান্ত কারাটাইয়েভ নামক একটি পরম দুঃখী ঈশ্বর বিশ্বাসীর জীবনে প্রত্যক্ষ করে পিটারের গভীর অন্তঃপরিবর্তন ঘটেছিল।
শৌখিন মানব কল্যাণ আর তাকে উদ্ভ্রান্ত করছিল না। সে পথ পেয়েছিল। বিষণ্ণ নাতাশাকে বিয়ে করে-ততদিনে হেলেন মরেছিল সে দস্তুরমতো সংসার হল। নাতাশা আবার সেই আনন্দময়ী। প্রকৃতি নিজে তাকে সহজ আনন্দ জোগায়, উদ্ভিদকে যেমন রস। সে কালক্রমে ফলভারানবত পূর্ণবিকশিত পাদপের মতো প্রসারিত, সমৃদ্ধ হল। কে তাকে দেথে চিনবে যে এ ছিল একদিন তন্বী আলোকলতা! তবু তাই তার প্রাকৃতিক পরিণতি।
তাই নহলে যা হোত সেটা তার বিকৃতি। নাতাশা টলষ্টয়ের মানসী নারী। সে ভালো। কিন্তু সজ্ঞানে ও সাধনার দ্বারা নয়। শিক্ষার দ্বারা নয়। নীতির চূল চেরা তর্ক তার মনে ওঠে না। তার প্রাণ যা চায় সে তা-ই চায়। তার প্রাণ যা চায় তার ফলে অনর্থ ঘটলে সে তা ভোগে। নালিম করতে চায় না।
অ্যান্ড্রুর বোন মারিয়া হচ্ছে কতক তার রূপহীনতার প্রতিক্রিয়ায় কতক তার কঠোর স্বভাব পিতার তাড়নায় তপস্বিনী। তার সমবয়সিনীরা যখন খেলা করছে, লীলা করছে শিকার করছে দুই অর্থে, মারিয়া তখন জ্যামিতির পড়া তৈরি করছে আর করছে লুকিয়ে লুকিয়ে অধ্যাত্নচর্চা। যা অমন দুঃখিনী হলে নারীমাত্রই করে থাখে।
নিজেকে মিষ্টিরর জীবনের যোগ্য করছে নিষ্ঠার সঙ্গে, বিবাহের তো প্রত্যাশা নেই। তা বলে আশা কি মরেও মরে! কতবার নিরাশ হল। অবশেষে নাতাশার ভাই নিকোলাস তার পৈত্রিক সম্পত্তির খাতিরে তাকে বিয়ে করল, অবশ্য বিয়ের আগে তাকে বিদ্রোহী প্রজাদের হাত থেকে উদ্ধার করে তার হৃদয় জয় করে।
তাদের বিয়ে বেশ সুখেরই হল। সংযম ও সাধুতা তাকে শুদ্ধ সুবর্ণের আভা দিয়েছিল। তার রূপহীনতাকে ঢেকেছিল সেই আভা। নিকোলাস নাতাশারই মতো প্রাণময়, তবে, সহাস্য নয় সুগম্ভীর। তার সব কাজে হাত লাগানো চাই, উৎসাহ তার অদম্য, ব্যগ্রতা তার মজ্জাগত। ঘোড়ার চড়ায়, ঘোড়া কেনা, তরুণ সৈনিকের ভাবনাশূন্য জীবনের হাজার ভাবনা, শিকার, জুয়া এই সব তার বহির্মুখির নানা দিক। তাকে ভালোবাসে তাদের পরিবারের আশ্রিতা একটি মেয়ে, সোনিয়া। নিকোলাসও তাকে ভালবাসে। সে ভালবাসে তার অন্যান্য কাজের মতো ছেলেমানুষি। কথা দিয়েছিল বিয়ে করবে, কিন্তু সোনিয়ার অপরাধ সে গরীব।
তাকে বিয়ে করলে নিকোলাসদের নষ্ট সম্পত্তি ফিরবে না। তার বাবা যে জুয়ার সব হারিয়ে বসে রয়েছেন। খুশি হয়ে মায়ের পীড়াপীড়িতে সোনিয়া তাকে তার প্রতিশ্রুতি থেকে মুক্তি দিয়ে নিজের সুখ বিসর্জন দিল। নিকোলাস বর্তে গেল সে তো কিছুতেই তার পিতামাতাকে অসন্তুষ্ট করতে পারত না, অথচ প্রতিশ্রুতি লঙ্ঘন করার মতো বেঈমান সে নয়। সোনিয়া এই কাব্যের উপেক্ষিতা। ডোলোগোভ নিকোলাসের বন্ধু। কিন্তু দিব্যি বন্ধুর মাথায় হাত বুলিয়ে দিল জুয়াতে ভীষণ হারিয়ে। লোকটা অসাধারণ সাহসী, অথচ অবাধ্য। তার মনে একটা বড়ো দুঃখ সে গরিব। তাতে তাকে নির্দয় করেছিল।
তার আর একটা বৃহৎ ক্ষোভ সে একটিও নারী দেখল না যাকে সে শ্রদ্ধা করতে পারে, সম্মান করতে পারে। তার ধারণা রাণী থেকে দাসী পর্যন্ত প্রত্যেক রমণীকে কেনা যায়। সে যে বেঁচে আছে শুধু তার মানসীকে হয়তো একদিন দেকতে পাবে এই অসম্ভব আশায়। ততদিন সে শয়তানী করবে। করবে গুণ্ডামি। তার বিধবা মা আর কুজা বোন আর গুটিকয়েক বন্ধু ছাড়া সবাইকে সে খাতির করবে না।
টলষ্টয়ের বর্ণনাকুশলতা এমন যে সব সময় মনে হতে থাকে টলস্টয় স্বয়ং এসব দেখেছেন। এসব জায়গায় উপস্থিত থেকেছেন। এসব জায়গায় উপস্থিত থেকেছেন। যুদ্ধক্ষেত্রে, মন্ত্রণাসভায়, দরবারে, অভিজাত মহলে, ফ্রীমেসনদের আড্ডায়, গ্রামের বাড়িতে, শিকারের পশ্চাতে, নাচের মজলিসে, চাষাদের সঙ্গে, বন্দিদের সঙ্গে, গেরিলাদের-সর্বস্থলে তিনি আছেন। কল্পনার এই পরিব্যাপ্তি, সহানুভূতির এই প্রসার বিশ্বাসাহিত্যে বিরল।
অবশ্য সমাজের নিম্নতর স্তরগুলিতে তাঁর চিত্তের প্রবেশ ছিল বলে মনে হয় না। থাকলে তিনি হয়তো শেষ বয়সে তাদেরই দিকে সম্পূর্ণ মনোযোগ দিতেন না। তারপর এত খুঁটিনাটি ভালবাসতেন বলে তার প্রতিক্রিয়াবশত শেষের দিকে একেবারে ও জিনিস বর্জন করলেন। এক চরমপন্থা থেকে অপর চরমপন্থায় চললেন।
টলষ্টয়ের জীবনের তথা আর্টে ট্র্যাজেডি এই। আলোচ্যগ্রন্থে তিনি যাকে জয়যুক্ত করেছেন সে পিটার, নাট্যমাশুক্ত পিটার। কারাটাইয়েড মরণের পূর্বে তাকে যে মন্ত্র দিয়েছিল তার প্রতিধ্বনি তার কানে বাজতে থাকে। জীবনই সমস্ত। জীবনই বিধাতা। সর্বভূতের আছে গতি। সেই গতিই বিধাতা।
যতক্ষণ জীবন আছে ততক্ষণ আছে বিধাতার অস্তিত্বকে জানবার আনন্দ। জীবনকে ভালোবাসলেই বিধাতাকে ভালোবাসা হয়। জীবনে সবার চেয়ে কঠিন অথচ সবচেয়ে গুণের কাজ হচ্ছে জীবনের যাবতীয় অহেতুক জ্বালা সত্ত্বেও জীবনকে ভালোবাসা।
আরও পড়ুনঃ

