আজকের আলোচনার বিষয় : বাঙালির মধ্যযুগের চিত্রকলা। যা বাংলার চিত্রকলা ( মধ্যযুগ থেকে কালীঘাট) এর অন্তর্গত।
বাঙালির মধ্যযুগের চিত্রকলা
মধ্যযুগে বাংলার চিত্রকলার কী অবস্থা ছিল পরিষ্কার জানা যায় না। সংরক্ষণের অভাবে সে সময়কার চিত্রকলার নিদর্শন প্রায় বিনষ্ট হয়ে গেছে। রক্ষা পেয়েছে কয়েকটি পাটাচিত্র। উচ্চবর্ণের বাইরে শক্তিশালী শিল্পীগোষ্ঠী ছিলেন সূত্রধর সম্প্রদায়। এঁরা কাঠ ও পাথরের ভাস্কর্য তৈরি করতেন, টেরাকোটা মন্দির তৈরি করতেন, পাটাচিত্রও অঙ্কন করতেন! অনেকেই ভাস্কর উপাধি নিতেন বা পেতেন ।
জাত পটুয়ারা ছিলেন ধর্মে মুসলমান, আচরণে হিন্দু, এঁরা মূলত দীঘল পট বা জড়ানো পট আঁকতেন, এখনও আঁকেন। চৌকা পটও আঁকা হতো, মূলত সূত্রধর সম্প্রদায়ই তা আঁকতেন। শিল্পকর্মে জড়িত ছিলেন কুম্ভকার সম্প্রদায়। এছাড়া কর্মকার, কাংসকার, শঙ্খকার, তন্তুবায়, স্বর্ণকার সম্প্রদায়ও শিল্পকর্মে জড়িত ছিলেন। সামাজিক অবস্থান নিচে হলেও এঁরা সম্মান পেতেন। চিত্রকলা শুধু রাজা-জমিদার-বড়ো ব্যবসায়ী কেন্দ্রিক ছিল না। সব শ্রেণির মানুষ এই শিল্পকলা উপভোগ করতেন যেমন তাঁরা উপভোগ করতেন মঙ্গলকাব্য-জীবনী-আখ্যান, কাব্য-পদাবলী কীর্তন ও লোকসংগীত।
মধ্যযুগে বাংলার শিল্পকলা ছিল জনউৎসের। সেই অর্থে ‘মার্গ’, শিল্পকলার অস্তিত্ব পাল সেন যুগের পর অর্থাৎ ১৩ শতকের পর আর প্রায় দেখাই যায় না। চিত্রকলা প্রসঙ্গে আলোচনায় সমস্ত শিল্পকলা প্রসঙ্গটি টেনে আনতে হয় কারণ এগুলো ছিল পরস্পর সম্পর্কিত।
দুঃখের বিষয় বাংলার মধ্যযুগের চিত্রকলার বৃত্তান্ত নিয়ে কাজ হয়েছে সামান্য। শিল্পীদের পরিচিতিও বিশেষ জানা যায়নি। তবে নিঃসন্দেহে এ কথা বলা যায় মধ্যযুগে সর্বস্তরের মানুষ এখনকার চেয়ে আরও বেশি চিত্রকলাকে উপভোগ করতেন।
কয়েকজন শিল্পীর পরিচয় পাওয়া যায় সমসাময়িক সাহিত্যে — মঙ্গলকাব্য ও জীবনী সাহিত্যে। চৈতন্যদেবের নিম্ন কাষ্ঠ দিয়ে প্রথম দারুমূর্তি তৈরি করেন দাঁইহাটার নবীন ভাস্কর, আনুমানিক ১৫১৩-২০ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে, চৈতন্য পরিকর ও পদাবলীকার বংশীবদনের উদ্যোগে (কাননবিহারী গোস্বামী, ষষ্ঠপদ চক্রবর্তী)। এই মূর্তিটি বহু সংস্কারের মধ্যে দিয়ে এখনও নবদ্বীপে পূজিত হয়। এই অবয়ব উত্তরভারতীয় আদলে নয়, বাঙালি চেহারা, এই মূর্তি থেকেই সে আমলে চৌকা পটের অবয়ব গঠন কেমন ছিল অনুমান করে নিতে হবে।
হালিশহর নিবাসী নয়ন ভাস্কর ‘বিশ্বকর্মা সাদৃশ” মহাসম্মানে সম্মানিত ছিলেন একাধিক বৈষ্ণব গ্রন্থে এঁর উল্লেখ আছে। খেতুরি উৎসবে (ষোলো শতকের শেষে) তিনি উপস্থিত ছিলেন। সম্প্রতি হালিশহরে গিয়ে অনেক অনুসন্ধান করে এঁর সম্পর্কে আর কোনো তথ্য পাইনি। এর কিছু পরে বৈষ্ণব গ্রন্থগুলোয় বংশীধর ভাস্করের সম্মানিত হওয়ার উল্লেখ পাওয়া যায়।
কিছুদিন আগে গণেশ পাইন আলোচকের সঙ্গে আলোচনায় বলেছিলেন—মধ্যযুগে বাঙালি কাব্য সংগীত চর্চায় যতটা মনোনিবেশ করেছিল চিত্রকলায় তা করেনি। তাঁর অভিমত ভেবে দেখার মতো। বাঙালির মধ্যযুগের চিত্রকলাকে আরও গভীর ভাবে দেখলে, বিশেষ করে ঐতিহাসিক ও সামাজিক প্রেক্ষিতে বিচার করলে এর উত্তর পাওয়া যাবে। ঊনিশ শতকে বৃহদংশ শিক্ষিত বাঙালির দেশজ শিল্পসাহিত্যের প্রতি অবজ্ঞা ও পশ্চিমের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বিচারে এ বিষয়ের চর্চা রুদ্ধ হয়ে গিয়েছিল। ঔপনিবেশিক শিল্পচিন্তার বাইরে যেতে পারলে আমরা এ গুণাগুণ যথার্থভাবে জানতে পারব।
সুলতানি আমলে পারস্যের চিত্রকলা, পুথিচিত্রণ বাংলায় এসে পৌঁছেছিল। চিনা পরিব্রাজক মাহুয়ান লিখে গেছেন তিনি বাংলার নানা শহরে পেশাদারি শিল্পীদের দেখেছেন (অশোক ভট্টাচার্য, মমতাজুর রহমান তরফদার)৷ তবে পারস্য রীতির চিত্রকলা সুতলানের দরবার বা উচ্চবিত্ত প্রশাসক সম্প্রদায়ের বাইরে জনসাধারণের কাছে সম্ভবত পৌঁছয়নি। এ পর্যায়ে উৎকৃষ্ট চিত্র ইস্কান্দার নামা (১৫৩১-৩২), নসরত শাহের পৃষ্ঠপোষকতায় হামিদ খানের অনুলিপি।
অন্তত পঞ্চদশ শতক পর্যন্ত বৌদ্ধতান্ত্রিক চিত্রকলা প্রচলিত ছিল। সেই বৌদ্ধতান্ত্রিক পুথিচিত্রের কিছু শৈলী পঞ্চদশ শতকের প্রাক্-চৈতন্যদেব বৈষ্ণব সাহিত্যের চিত্রিত পুথির পাটায় দেখা যায়। তবে দীর্ঘ আয়ত আকর্ণ বিস্তৃত চক্ষু জৈনচিত্রের অবদান।
পূর্বাঞ্চলে বিলীয়মান বৌদ্ধতান্ত্রিক চিত্রকলার ২টি পঞ্চদশ শতকীয় নমুনা পাওয়া গিয়েছে— ১. কালচক্রতন্ত্র পুথিচিত্র, ১৪৪৬, আরা-বিহার থেকে সংগৃহীত কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় লাইব্রেরিতে সংরক্ষিত। ২. কারগুব্যূহ পুথিচিত্র, ১৪৫৫, মুম্বাই-এর হরিদাস স্বালীর সংগ্রহে সংরক্ষিত। এই দুটি পুথির চিত্রে পূর্ববর্তী পাল যুগের চিত্রকলার সঙ্গে কিছু বিন্যাসগত পার্থক্য গবেষকরা দেখিয়েছেন।
আঙ্গিক ব্যাখ্যা করা রৈখিকতা, নাসার তীক্ষ্ণতা, বৃহৎ বেরিয়ে আসা চক্ষু এই উপাদানগুলো, পূর্ববর্তী পালযুগের পুথিচিত্র থেকে ভিন্ন। জে সি ফ্রেঞ্চ সাহেব বিষ্ণুপুর থেকে ‘বিষ্ণুপুরাণ’ পুথির পাটা (১৪০৯) সংগ্রহ করেছিলেন, পুথির প্রচ্ছদ পাটায় অঙ্কিত ‘দশাবতার’। তিনিই বলেছেন, “This drawing processes a certain mysterious vitality and savage inventiveness of design. ” পূর্বভারতের আরেকটি পুথির পাটা ‘পিঙ্গলতাতিভ ব্যাখ্যা’ (মৈথিলী-সরলা হস্তলিপিতে) ১৪৯১-৯২ রামদত্ত/অঙ্কিত ব্রিটিশ লাইব্রেরি, লন্ডনে সংরক্ষিত। একটা পাটা কৃষ্ণসহ গোপীচিত্র আরেকটি বিষ্ণুর দশাবতার। দেখা যাচ্ছে তিন ধরনের চিত্রের প্রচলন ছিল ওই পঞ্চদশ শতাব্দীতে। বাংলায় সহজিয়া বৌদ্ধদের অস্তিত্ব ছিল, নবচর্যাপদও রচিত হয়েছে কাছাকাছি সময়ে।
আর বৈষ্ণব চিত্রকলার প্রবাহও চলছে। মূলত যার অবলম্বন প্রাক- চৈতন্য বৈষ্ণব সাহিত্য পুরাণ আর লৌকিক পটচিত্র।
‘প্রাতে চলে আইলাপ্রভু কানাই-এর নাটশালা। দেখিল সকল তাঁহা কৃষ্ণচিত্ৰ লীলা ॥’—চৈতন্যচরিতামৃত, মধ্য ১/২-২৭।
চৈতন্যদেব কানাই-এর নাটশালায় চিত্রপট শোভিত পথ পরিক্রমা করেছেন। এছাড়া বিভিন্ন চৈতন্য জীবনীগ্রন্থে তাঁর চিত্রপট দর্শনের বিবরণ রয়েছে। সংগীত-নাটক-সাহিত্যের মতো চৈতন্যদেব শিল্পকলারও অনুরাগী ছিলেন।
ড. কাননবিহারী গোস্বামীর সঙ্গে আলোচনায় জেনেছি এক সময়ে কিছু কিছু বৈষ্ণব পাটবাড়ি ছিল চিত্র সমৃদ্ধ । তাঁর আবিষ্কৃত ও সম্পাদিত চৈতন্যদেবের প্রথম জীবনীগ্রন্থ ‘গৌরলীলামৃত’, বংশীবদন রচিত-এ দেখা যাচ্ছে একজন ভাস্কর শ্রীবাসের ‘গোদহলীলা’ পট দেখালে গৌর- নিতাই দু’জনেই ‘গোপলীলানুকরণ’ করে নৃত্য করেছিলেন। গৌরাঙ্গ একটি ‘চিত্রগৃহে বিশ্রাম নিলেন। এই সমস্ত পাঠে অনুমান করা যায় পটচিত্র গৌড়বঙ্গের অনেক জায়গায় প্রচলিত ছিল এবং ‘চিত্রাগৃহ’-ও ছিল। ‘কৃষ্ণকীর্তনেও চিত্রপটের উল্লেখ আছে। শ্রীরূপ রচিত ‘ললিতমাধব’-এর নবমাঙ্কে ব্রজলীলা চিত্রপট দর্শনের উল্লেখ রয়েছে।
ভাস্কর-সূত্রধর সম্প্রদায় যেমন পটচিত্র এঁকেছেন বহুযুগ ধরে, জাত পটুয়ারাও দীঘল পট এঁকে আসছেন। মধ্যযুগে বিভিন্ন শিল্পী সম্প্রদায়ের চিত্রকররা নানা রকমের চৌকা পট আঁকত। বিষ্ণুপুরের ফৌজদার সম্প্রদায়, শান্তিপুর-কৃষ্ণনগরের কুম্ভকার সম্প্রদায়ের অনেক আঁকা মিউজিয়ামগুলোতে রক্ষিত আছে। বর্ধমানের পূর্বস্থলীর নিকটবর্তী মেরতলা গ্রামে অসাধারণ সাদাকালো চৌখাপট আঁকা হতো, সুধাংশু রায় এগুলোর মধ্যে কিউবিজম এর পূর্বভাস দেখেছেন। এই দুই গোষ্ঠীরই পরম্পরাগত শিক্ষা ছিল।
জাত পটুয়াদের কাজ অনেকটা লোকায়ত উৎসের আর ভাস্কর-সূত্রধর বা কুম্ভকারদের পটে নকশা, সূক্ষ্ম কারুকাজের প্রাধান্য ছিল। বাংলার টেরাকোটা মন্দিরগুলোতে এসব পটেরই ভাস্কর্যরূপ দেখা যায়। কুম্ভকার শিল্পীরাও পট আঁকতেন, কালীঘাট পটের সূচনা করেন তাঁরাই। এখনও প্রতিমার চালচিত্র তাঁরা এঁকে থাকেন। কর্মকার বা স্বর্ণকার শ্রেণির শিল্পীদের ধাতুর পাতে ও ধাতুর রথে খোদাই করা এচিং-এর নমুনা কিছু পাওয়া গেছে।
শ্রীহরিদাস দাস ৭টি প্রাচীন চৈতন্য ও বৈষ্ণব চিত্রের উল্লেখ করেছেন— ১. শ্রী বিশাখা দেবীকৃত শ্রীমন-মদনগোপালের চিত্রপট, ২. রাধাকুণ্ডে মা জাহ্নবার ঘাটে শ্রীমন মহাপ্রভুর চিত্রপট, ৩. কুঞ্জঘাটার রাজবাড়িতে সপার্ষদ মহাপ্রভুর চিত্রপট, ৪ পুরীর রাজবাড়িতে পূর্ণাকৃতির চৈতন্যদেব, ৫. বম্বে ভোঁসলা হাউসে (বর্গির বাংলা হইতে লইয়া যায়), ৬. শ্রীধারাকুণ্ডে শ্রীমদ্দাস গোস্বামীর ভজনকুটিরে রসরাজ মহাভাব চিত্র-দিল্লিশ্বর মুসলমান সম্রাটের আদেশে উৎকলীয় সামন্তরাজের চিত্রকর-কর্তৃক সাক্ষাদৃষ্ট শ্রীগৌরাঙ্গের অবিকল চিত্র। ৭. শ্রী চৈতন্য সংকীর্ণ-শ্রীনিবাস আচার্যপ্রভুর গৃহে ছিল, খ্রিস্টীয় সপ্তদশ শতকের মধ্যভাগে ইহা নির্মিত, এঁড়েদহে ঠাকুরবাড়িতে বর্তমানে বিদ্যমান। (হরিদাস দাস : শ্রী শ্রী গৌড়ীয় বৈষ্ণব অভিধান)। এর মধ্যে অনেকগুলো চিত্রের সন্ধান বা আলোকচিত্র আমি পাইনি। তবে এটা বিস্ময়কর নয় যে চৈতন্যদেবের জীবিতকালেই তাঁর চিত্র অঙ্কিত হয়েছিল।
মুর্শিদাবাদে কুঞ্জঘাটার রাজবাড়ির চিত্র অনেক সংকলনে মুদ্রিত হয়েছে। এটি তেল রঙের, চৈতন্যদেব, রঘুনাথ পণ্ডিত ও উৎকল-রাজ প্রতাপ রুদ্র-কে নিয়ে অঙ্কিত। প্রতাপ রুদ্র চৈতন্যকে ষাষ্টাঙ্গে প্রণাম করছেন। ছবিটি উৎকৃষ্ট ও দক্ষ চিত্রকরের আঁকা। দীনেশচন্দ্র সেন বলেছিলেন ছবিটি চৈতন্যের জীবিতকালেই আঁকা। কিন্তু সম্ভবত তা নয়। এটি তাঁর মৃত্যু পরবর্তীকালীন। চিত্রটি মূল চিত্রের একটি উৎকৃষ্ট কপি।
এঁড়েদার চৈতন্য সংকীর্তনের চিত্রটিও সপ্তদশ শতকের বলে কথিত, একটি অপূর্ব ছবি। রামকৃষ্ণদেব এই ছবিটি দেখে অভিভূত হতেন এবং কয়েকবার ছবিটি দেখতে যান। শ্রীনিবাস আচার্যের গৃহে আগে ছিল বলে হরিদাস দাস উল্লেখ করেছেন, এই তথ্যের ভিত্তিতে এবং দীনেশচন্দ্র সেনের অভিমত অনুসারে এটি প্রাচীন বলেই মনে হয় এবং এই চিত্রটি সপ্তদশ বা অষ্টাদশ শতকের বঙ্গীয় চিত্রকলার একটি অবিস্মরণীয় উদাহরণ।
কমলকুমার মজুমদার এই সংকীর্তন চিত্রটির মনোজ্ঞ আলোচনা করেছেন ‘বঙ্গীয় গ্রন্থচিত্রণে।
ষোলো থেকে উনিশ শতক পর্যন্ত প্রাপ্ত কয়েকটি পুথির পাটার বৈষ্ণব ভাবধারা প্রাধান্য পেয়েছে। এগুলোতে দশাবতার, কৃষ্ণের বিবিধলীলা, পৌরাণিক কাহিনি, চৈতন্যলীলা, রামায়ণ, মহাভারতের দৃশ্যকল্পের সংখ্যাধিক্য দেখা যায়। এগুলো সংরক্ষিত আছে বিষ্ণুপুরের যোগেশচন্দ্র পুরাকৃতি ভবন, আশুতোষ মিউজিয়াম, বিশ্বভারতী কলাভবন, হাওড়ার আনন্দ নিকেতন কীর্তিশালা, গুরুসদয় মিউজিয়াম, বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদে।
বাঁকুড়া-বিষ্ণুপুর তৎসন্নিহিত মেদিনীপুরে এ ধরনের পাটা সর্বাধিক পাওয়া গেছে। যেহেতু পুথি থেকে খুলে পাটাগুলো আলাদাভাবে সংগৃহীত হয়েছে অধিকাংশ ক্ষেত্রে লিপিকাল ও অঙ্কনকাল সঠিক জানা যায় না। পাটাচিত্রে বাংলার লোকায়ত শিল্পের সঙ্গে ওড়িশি ও রাজপুত চিত্রকলার মিশ্রণ ঘটেছে এবং জৈন চিত্রকলার ছায়া পড়েছে। এছাড়া বীরভূম, হাওড়া, হুগলি, মুর্শিদাবাদ, কোচবিহার অঞ্চলেও বহুসংখ্যক পাটাচিত্র পাওয়া গেছে।
বীরভূমের একটি সপ্তদশ শতকের পাটায় মূর্ছিত চৈতন্যদেবকে রাজা প্রতাপ রুদ্রের পদসেবার চিত্রটি পুথিচিত্র পরম্পরার উজ্জ্বল উদাহরণ’ (অশোক ভট্টচার্য)।
তুলনায় শাক্ত ও শৈব চিত্রাবলি অল্প। মুর্শিদাবাদ থেকে প্রাপ্ত ষোড়শ-সপ্তদশ শতকের বহুভুজা ভয়ংকরী কালীমূর্তি শাক্ত-তান্ত্রিক ভাবধারার চিত্র। মেদিনীপুরের একটি পাটায় নন্দীর পিঠে শিব শিঙা ফুঁকতে ফুঁকতে চলেছেন, পাশে ভৃঙ্গি—এটি অষ্টাদশ শতকের, দুটিই আশুতোষ মিউজিয়ামের সংগ্রহ। পূর্ব বাংলার পাটা চিত্রের বিবরণ সংগ্রহ করা যায়নি।
পুরনো দুটি পুথি ১. ভগবৎ পুরাণ সরসীকুমার সরস্বতী সংগ্রহ, ১৬৮৯-৯০-এ রচিত ও অঙ্কিত। এতে ১৫৮টি শ্রীকৃষ্ণজীবনী সংক্রান্ত অবয়ব চিত্র আছে। ২. মহিষাদল রাজবাড়ি থেকে সংগৃহীত ‘রামচরিতমানস’-এর চিত্রিত পুথি (১৬৯৪-১৭৭৫ সাল পর্যন্ত অঙ্কিত)।
এর বিশেষত্ব হলো স্বচ্ছ গুয়াশ পদ্ধতির অঙ্কন, ইংরেজ আগমনের আগেই এই রীতি বাঙালি শিল্পীদের আয়ত্তে ছিল। পুথিটি এখন আশুতোষ মিউজিয়ামের সংগ্রহশালায়। এগুলো বহড়ুর দেওয়ালচিত্র বা কালীঘাটের পটের পূর্বভাষ। আঠারো শতকে নির্মিত গুপ্তিপাড়ার বৃন্দাবনচন্দ্রের মন্দিরে অলঙ্করণ ও ফ্রেস্কো দর্শনীয় ।
জয়দেবের গীতগোবিন্দের চিত্রিত পুথি একটি বিশিষ্ট দৃষ্টান্ত। বঙ্গাক্ষরে রচিত এই পুথির শিল্পী জিয়াগঞ্জের কৃষ্ণচন্দ্র শর্মা, চুঁচুড়ার রামপ্রসাদ মণ্ডলের সংগ্রহে রক্ষিত। পুথিটি ৩৭টি পৃষ্ঠা চিত্রিত যার মধ্যে কৃষ্ণলীলা, নিসর্গচিত্র রয়েছে। মনে হয় কাংড়া শৈলী ও উড়িষ্যার পুথিচিত্রের মিশ্রিত শৈলী সেই সঙ্গে মুর্শিদাবাদি সোনার ও কমলা রঙের ব্যবহার। এশিয়াটিক সোসাইটিতে সংরক্ষিত চিত্রিত ‘চৈতন্যভাগবত’- এর পুথি ৫৮ পৃষ্ঠা চিত্রিত ঊনিশ শতকের।
আঠারো শতক মুর্শিদাবাদ অঞ্চলে বঙ্গীয় চিত্রকলার একটি কেন্দ্র হয়ে দাঁড়িয়েছিল। রাজস্থান-উত্তরে ভারতের অনুচিত্র শিল্পীরা যাঁদের একটি দল সম্ভবত আগেই বিষ্ণুপুরে এসেছিলেন, তাঁরা ও উত্তর ভারতীয় মোগল ঘরনার চিত্রশিল্পীরা প্রথমে ঢাকায় পরে মুর্শিদাবাদে এসেছিলেন। এই মোগল শৈলীর শিল্পীরা মুর্শিদাবাদে অনেক ছবি এঁকে গেছেন যা নিয়ে কিছু নিবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে। এঁদের একই অঞ্চলে অবস্থানের প্রমাণ পাওয়া যায়, এর সঙ্গে মিশল বঙ্গীয় পটচিত্রকলার ঐতিহ্যবাহী চিত্রকররা (যাঁদের পূর্বপুরুষদের পট কানাই-নাটশালায় দেখা গেছে)। এই ত্রিসঙ্গমে নতুন বঙ্গীয় শিল্পধারার উদ্ভব হয়। নসীপুর এরকম একটি কেন্দ্র হয়ে উঠেছিল।
নসীপুর থেকে সংগৃহীত রাজ্যপ্রত্নতত্ত্ব বিভাগের বেহালা সংগ্রহশালায় সপার্ষদ চৈতন্যদেবের বেড়া নৃত্যের এক অনুচিত্র আঙ্গিকের চিত্র আছে। অবয়বগুলো ছোটো ঘননিবন্ধ, মুখে অভিব্যক্তি, নৃত্যের ভঙ্গি, দেশীয় গুয়াশ পদ্ধতিতে আঁকা। সোনার রেখা দিয়ে অবয়বগুলোকে হাইলাইট করে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এই চিত্রের শিল্পী কিষাণগড় থেকে এসেছিলেন আনুমানিক ১৭৫০ সালে।
এসময়কার আরেকটি অনুচিত্র কলকাতার ভারতীয় সংগ্রহশালায় রয়েছে ‘চৈতন্যদেব ও কুকুর’।
নসীপুরে প্রাপ্ত আরও দুটি চৈতন্যবিষয়ক গুয়াশ চিত্র রাজ্য প্রত্নতত্ত্ব সংরক্ষণশালায় আছে । ১. ষড়ভুজ শ্রীচৈতন্য ডানদিকে করজোেড় প্রতাপ রুদ্র, বামে বাসুদেব সার্বভৌম, ছবিটি অষ্টাদশ শতকের শেষার্ধে দেশি গুয়াশ পদ্ধতিতে আঁকা। উত্তরভারতীয় অনুচিত্রে শৈলীর প্রাবাল্য থাকলেও বাংলা ঐতিহ্যের পটচিত্রের সঙ্গেও কিছু সাদৃশ্য আছে। চৈতন্যদেবের ষড়ভুজের মধ্যে দুটি হাত সবুজ রঙের তীর ও ধনুক ধরা (রামচন্দ্র), দুটি হাত নীল, হাতে মুরলী (কৃষ্ণ), দুটি হাত পীতাভ দণ্ড ও করমণ্ডল চৈতন্যদেবের। হালকা নীল পটভূমি নিচে সবুজ ঘাস, ছোটো ছোটো গুল্ম-গাঢ় সবুজের। ২. এই একই শৈলী ও সময়ে আঁকা গৌরনিতাই চিত্র।
চৈতন্যদেবের প্রভাব শুধু উচ্চবর্ণের চিত্রকর ভাস্করদের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। বাংলার পটুয়ারাও চৈতন্যদেবকে অবলম্বন করে পট এঁকেছেন, কৃষ্ণভক্ত চৈতন্যদেবের কৃষ্ণভক্তিবাদ প্রচার করার ফলে অঙ্কিত হয়েছে শত শত কৃষ্ণলীলা, রাসলীলা, চৈতন্যলীলা পট, মন্দিরে দেওয়াল চিত্র অঙ্কিত হয়েছে, রথ চিত্রিত হয়েছে। অষ্টাদশ শতকের ধর্মমঙ্গল কাব্যের কবি মানিক গাঙ্গুলী অচ্যুত চিত্রকর নামক এক চিত্রকরের দেওয়াল লিখনের নৈপুণ্য বর্ণনা করেছেন। চিত্রশিল্পের কৃষ্ণলীলার আধিক্য চৈতন্য প্রভাবের কথাই স্মরণ করে।
‘আজ্ঞা পায়্যা আনন্দে অচ্যুত চিত্রকর। / চপলে নির্মাণ করে চারিদ্বার ঘর । / উত্তর দুয়ারে লেখে কৃষ্ণ অবতার । / দান ছলে মনোভঙ্গ হইল রাধার । কোনখানে পুতনাবধ কেশীবধ কোথা। কৃষ্ণ গেল মথুরায় কংসের বিতথা ”
একটু লক্ষ করলে দেখা যাবে, কৃষ্ণের ব্রজলীলার ছবিই চিত্রকরদের আঁকা ছবিতে গুরুত্ব পেয়েছে (জাহ্নবীকুমার চক্রবর্তী)। আঠারো উনিশ শতকে পশ্চিমবঙ্গের অনেক মন্দিরেই দেওয়ালচিত্র বা ফ্রেস্কো অঙ্কিত হয়েছে।
চিত্রকলায় পারদর্শী সূত্রধর শিল্পীদের সম্পর্কে কবিকঙ্কন চণ্ডীতে মুকুন্দরামের উল্লেখ, ‘ছতারপুরের মাঝে চিঁড়া কুটে মুড়ি ভাজে কেউ চিত্র করায় নির্মাণ । ……হুদ্দারার চৌকাঠে সূত্রধর চিত্র গঠে সব সমান কপাট।’
চিত্রকররা আদৃত ছিলেন, উপেক্ষিত হলে মঙ্গলকাব্য- জীবনীকাব্যগুলোতে তাঁদের উল্লেখ পাওয়া যেত না। বিষ্ণুপুর মধ্যযুগের শিল্পকলার একটি কেন্দ্র ছিল। যেমন উৎকৃষ্ট টেরাকোটার মন্দির তৈরি হয়েছে, আঁকা হয়েছে পটচিত্র। অনেকগুলো পুথির পাটা রক্ষা পেয়েছে। এখানে বাংলার লোকায়ত শৈলী, উড়িষ্যার শৈলী ও রাজপুত শৈলীর মিশ্রণ ঘটেছে। এই পাটাচিত্রে বিষ্ণুপুরী শিল্পীদের দক্ষতা অসাধারণ। টেরাকোটাগুলো দেখলে বোঝা যায় একই শিল্পীগোষ্ঠী এগুলোর স্রষ্টা।
ফৌজদার চিত্রকররা চৌকা পট ও দশ অবতার তাসের জন্য বিখ্যাত ছিলেন, এখনও দু-একজন আছেন। দীনেশচন্দ্র সেন তাঁর ‘বৃহৎ বঙ্গ (১৩৪২)-এ বহুসংখ্যক শিল্পকলার উপাদানের প্রতি আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন। অজিত ঘোষ পট প্রসঙ্গে রামকেলির ‘তসবির’ আঁকিয়েদের কথা বলেছেন। এঁরা অনেক উন্নত মানের পট এঁকে গেছেন। নিত্যানন্দ ও চৈতন্য পরিকরদের কিছু চিত্র বীরভূমের একচাকার নিত্যানন্দ জন্মস্থান সেবামণ্ডলে আছে। এগুলো পূর্ববর্তী কোনো চিত্রের অনুকৃতি বলে মনে হয়। হরিদাস ঠাকুরের একটি চিত্র কুঞ্জঘাটায় আছে, এটিও মূল বলে প্রচলিত কিন্তু অনুকৃতি মনে হয়।
মেদিনীপুর জেলায় বীণপুর থানায় রামগড়ের রাজবাড়িতে বেশ কিছু পুথির পাটা ছিল। সুধাংশুকুমার রায় এগুলো সম্পর্কে জানিয়েছেন ‘গুজরাট থেকে আগত এখানকার রাজবাড়ির পূর্বপুরুষ বৈষ্ণবসাধক প্রভু শ্যামানন্দের কাছে বৈষ্ণবধর্মে দীক্ষিত হওয়ার ফলে কালক্রমে কায়ে চৈতন্য, বাঙালি-গুজরাটি আর্টের জন্ম দিয়েছে।’ তাঁর কথায়, গুজরাটি বা প্রাদেশিক রাজস্থানি চিত্রকলার প্রভাব এখানে ক্রিয়াশীল হওয়ায় ‘রামগড় স্কুলের পুথির পাটা আর্টের রহস্যময় অনন্য সৃষ্টি বাংলায় সম্ভব হয়েছিল।’ এগুলি আঠারো শতকের মধ্যভাগ থেকে উনিশ শতকের।
রামপ্রসাদ সেনের মৃত্যুর পর হালিশহরের এক পটুয়া, ভোলা পুটয়া, রামপ্রসাদ ও তাঁর স্ত্রীর প্রতিকৃতি দিয়ে একটি সরাপট আঁকেন। দীনেশচন্দ্র সেন সেই পটের লাইন ড্রইং কপি করিয়েছিলেন—তার অসংখ্য অনুকৃতি আজও পাওয়া যায়।
এই পর্বেই যুগসন্ধির চিত্রকলা কালীঘাটের পটের উদ্ভব, তা পৃথক আলোচনার বিষয়।
অষ্টাদশ শতকে ইংরেজ চিত্রকরদের সান্নিধ্যে আসতে শুরু করেন দেশীয় শিল্পীরা, সূচনা হয় কোম্পানি স্কুলে বাঙালি শিল্পীদের যাত্রা। এ পর্বের তিন শিল্পীর নাম পাওয়া গেছে জৈনুদ্দিন (সম্ভবত আগে মোগল কলমের শিল্পী ছিলেন), ভবানী দাস ও রাম দাস। আঠারো শতকে কলকাতায় চাষা ধোপাপাড়ায় শশী কয়াল অঙ্কিত জলরঙে মিনিয়েচার ও বিলিতি জল রং মিশ্র ছবি ‘শ্রীকৃষ্ণের গোবর্ধনগিরি ধারনের’ ছবি। ছবিটি দীনেশচন্দ্র সেন সংগ্রহ করেছিলেন।
আরও দেখুনঃ

