মধ্যযুগের বাংলা পুথি পাটার চিত্র

আজকে আমরা মধ্যযুগের বাংলা পুথি পাটার চিত্র সম্পর্কে আলোচনা করবো। যা বাংলার চিত্রকলা ( মধ্যযুগ থেকে কালীঘাট) এর অন্তর্গত।

 

 

মধ্যযুগের বাংলা পুথি পাটার চিত্র

 

মধ্যযুগের বাংলা পুথি পাটার চিত্র

বাংলার প্রাক্-ঔপনিবেশিক যুগে কী ধরনের চিত্রকলা প্রচলিত ছিল, তার সঠিক বিবরণ জানার উপায় নেই। পালযুগের পুথিচিত্রসম্ভার কিছুটা সংরক্ষিত হয়েছে দেশে-বিদেশে—তা থেকে একটা ধারণা করা যায়। মন্দিরের ভিত্তিচিত্রের সঙ্গে সে-যুগের পুথিচিত্রের সাদৃশ্য ছিল। তখন শিল্পীসমাজ ভিত্তিচিত্র-পুথিচিত্র-ধাতু ও পাথরের ভাস্কর্য গড়তেন। শিল্পীদের guild বা গোষ্ঠী থাকত, তাঁরা বিভিন্ন বৌদ্ধ মঠে গিয়ে ভিত্তিচিত্র আঁকতেন, পুথিচিত্র আঁকতেন। নালন্দায় এরকম ভিত্তিচিত্রের ভাঙা খণ্ডিত অংশ পাওয়া গেছে। চীনা পরিব্রাজকরা বাংলায় বহু চিত্রকরদের উপস্থিতির কথা বলেছেন।

 

মধ্যযুগের বাংলা পুথি পাটার চিত্র

 

চৈতন্য-জীবনীকার বংশীবদনের ‘গৌরলীলামৃত’-তে চৈতন্যদেবের চিত্র দেখে ভাব-উন্মাদনার কথা আছে। অন্যান্য বৈষ্ণব সাহিত্যেও তার কিছু বিবরণ আছে। দুঃখের বিষয়, ওই সময়ের কোনো চিত্রপট পাওয়া যায়নি—পাওয়া গেছে পাটা। চৈতন্যদেবের জীবনীকারদের লেখাতেও অনেক শিল্পীর নাম পাওয়া যায় (এ-বিষয়ে আলোচকের গ্রন্থ : বঙ্গশিল্পে চৈতন্যপ্রভাব, ২০১৩)।

 

মধ্যযুগের বাংলা পুথি পাটার চিত্র

 

চৈতন্যদেবের প্রভাবে বাংলায় সাহিত্যের মতো শিল্প, সংগীত-সহ শিল্পের সমস্ত মাধ্যমেই একটা নতুন জোয়ার এসেছিল। তার প্রমাণ অসংখ্য টেরাকোটা মন্দির, যার অধিকাংশই চৈতন্যদেব ও বৈষ্ণব ভাবজগতের। এইসব টেরাকোটা মন্দিরে যে-শিল্পকর্ম দেখা যায়, তা অনেকটাই বাংলার পাটচিত্রের শৈলীর সঙ্গে মেলে। এই শ্রেণির শিল্পীরাই রথচিত্র আঁকতেন। পালযুগ থেকেই এই শিল্পীগোষ্ঠীর অস্তিত্ব ছিল। যেমন চৈতন্যদেবের সময়ে দাঁইহাটার শিল্পীদের কথা জানা যায় যাঁরা অধিকাংশই ছিলেন ভাস্কর। বিষ্ণুপুরেও শিল্পগোষ্ঠী ছিল—বিষ্ণুপুর অঞ্চল থেকেই সবচেয়ে বেশি পাটচিত্র পাওয়া গেছে, সংরক্ষিতও হয়েছে।

বাংলায় চিত্রিত পুথি ও পাটাচিত্রের সবচেয়ে পুরোনো নমুনা পালযুগের, খ্রিস্টীয় দশম শতকে অঙ্কিত বৌদ্ধতন্ত্রের দেব-দেবী ও বুদ্ধের ছবি। প্রাচীনতম নিদর্শন ৯৮৩ খ্রিস্টাব্দে লিখিত ‘অষ্টসাহক্রিকা প্রজ্ঞাপারমিতা’, প্রথম মহীপালদেবের সময় তালপাতায় চিত্রিত বারোটি চিত্র সমন্বিত (কলকাতা এশিয়াটিক সোসাইটি সংগৃহীত)। সরসীকুমার সরস্বতী পালযুগের চিত্রকলা’য় এরকম সাতাশটি পুথির (চিত্রিত) বিবরণ দিয়েছেন, যার মধ্যে কুড়িটি অঙ্কিত হয়েছে বিভিন্ন পাল রাজাদের সময়। একটি রাজা গোবিন্দচন্দ্রদেবের সময়, দুটি রাজা হরিবর্মাদেবের সময়। আর-একটি পুথিতে ‘লক্ষ্মণ সেন গত সম্বত -এর উল্লেখ পাওয়া যায়। এই চব্বিশটি চিত্রিত বৌদ্ধতান্ত্রিক পুথি প্রাক- ইসলাম যুগের। পরবর্তী তিনটি পুথি, যথাক্রমে— ১২৮৯, ১৪৬৬ ও ১৪৫৫-এ লিখিত ও চিত্রিত।

পাল-সেন যুগের বাংলায় ও পূর্ব ভারতে উন্নত শিল্পকলার বিকাশ হয়েছিল, যার দৃষ্টান্ত প্রস্তর ও ধাতুর মূর্তি শিল্পে যেমন পাওয়া যায় তেমনই পাওয়া যায় চিত্রিত পুথি ও তার পাটায়। দেখা যায়, অজন্তা থেকে যে চিত্রকলা শৈলীর সূচনা, তারই একটি শাখা বঙ্গে, পূর্ব ভারতে স্থানীয় উপাদান সংশ্লেষণ করে পালযুগের একটি বিশ্লিষ্ট প্রকাশ পেয়েছে। রং ও রেখার বিন্যাসে, চোখ-নাক-মুখের গড়নে উচ্চমানের শৈল্পিক দক্ষতার নিদর্শন পাওয়া যাচ্ছে। পুথিগুলো মূলত তালপাতার; তবে একটি কাগজের পুথির নমুনা পাওয়া গেছে।

অসংখ্য বৌদ্ধতান্ত্রিক দেব-দেবীর চিত্র, বুদ্ধদেবের জীবনের ঘটনাবলি এইসব পুথিতে অঙ্কিত। সরসীকুমার সরস্বতী এশিয়াটিক সোসাইটি, আশুতোষ মিউজিয়াম, কলকাতার ইন্ডিয়ান মিউজিয়াম, রাজশাহী বরেন্দ্র মিউজিয়াম, ঢাকা মিউজিয়াম, মালদার বি. আর, সেন মিউজিয়াম ও পাবলিক লাইব্রেরি, পাটনা মিউজিয়াম, স্টেট মিউজিয়াম—লক্ষ্ণৌ, ভারত কলাভবন — বেনারস, ন্যাশনাল মিউজিয়াম দিল্লি, কেম্ব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় লাইব্রেরি, বদলিয়ান লাইব্রেরি – অক্সফোর্ড, ভিক্টোরিয়া ও অ্যালবার্ট মিউজিয়াম লন্ডন ও কয়েকটি ব্যক্তিগত সংগ্রহ থেকে চিত্রিত পুথির বিবরণ দিয়েছেন।

 

মধ্যযুগের বাংলা পুথি পাটার চিত্র

 

এরপর বঙ্গলিপি সমন্বিত, চিত্রিত দুটি বৌদ্ধ পুথি পাওয়া গেছে। একটি হরিদাস স্বালীর সংগ্রহের ‘কারওব্যূহ’ (১৪৫৫) শিল্পীর নাম পাওয়া যায়নি, তবে তিনি কায়স্থ ছিলেন এটি জানা যায় (মতি চাঁদ, দেবপ্রসাদ ঘোষ)। পুথিটিতে বিভিন্ন জাতক কাহিনি অঙ্কিত। এই পৃথিবীর চিত্রগুলোর সঙ্গে পালযুগের কাহিনি অঙ্কিত। এই পুথিটির চিত্রগুলোর সঙ্গে পালযুগের চিত্রশৈলীর অমিল এখানেই যে, লৌকিক চিত্রশৈলীর ছাপ এতে পরিষ্কার, কেউ কেউ পশ্চিম ভারতীয় জৈন শিল্পীশৈলীর ছাপ দেখতে পেয়েছেন ।

ডোম্মন পালের তাম্রলেখ-এ যে-বিষ্ণু মূর্তি দেখা যায়, তার সঙ্গে একটা ক্ষীণ সাদৃশ্য থাকতে পারে, কিন্তু অবয়ববিন্যাস, চোখ নাকের অঙ্কন অন্যরকমের। ‘কারওব্যূহ’র অঙ্কনশৈলীকে কোনো কোনো শিল্প-ঐতিহাসিক অপভ্রংশ শৈলী বা পূর্ব শৈলী আখ্যা দিয়ে থাকেন। আবার পনেরো শতকে কেম্ব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে সংরক্ষিত ‘কালচক্রযান’ (১৪৬৬ খ্রি.) পুথিচিত্রগুলিতে পালযুগের শৈলীর আরও কাছাকাছি। এটি বঙ্গলিপিতে লিখিত বিহারের আরা থেকে প্রাপ্ত। ওই সময় বঙ্গলিপি উত্তর বিহারের, মিথিলায়ও প্রচলিত ছিল (এই পুথিচিত্র নিয়ে প্রতাপাদিত্য পাল, দেবপ্রসাদ ঘোষ প্রমুখ বিস্তারিত আলোচনা করেছেন)।

 

মধ্যযুগের বাংলা পুথি পাটার চিত্র

 

এই বৌদ্ধশৈলীর পুথিচিত্র অঙ্কন তার পরেও চলেছে। পঞ্চদশ শতকেই বিষ্ণুপুরে পাওয়া গেছে দশাবতার অঙ্কিত ‘বিষ্ণুপুরাণ” পুথির পাটা (১৪৯৯) জে. সি. ফ্রেঞ্চ এটি সংগ্রহ করে ইংল্যান্ডে নিয়ে যান। বিলীয়মান বৌদ্ধতান্ত্রিক পুথিচিত্র অঙ্কনের যুগেই বৈষ্ণব পুথিচিত্র আঁকা শুরু হয়ে গেছিল। সমসাময়িক সাহিত্যে দেখা যায় নব-চর্যাপদ বা শশিভূষণ দাশগুপ্ত মহাশয় আবিষ্কৃত পরবর্তী চর্যাপদের প্রচলন ছিল পঞ্চদশ শতক পর্যন্ত বাংলায় ও পূর্ব ভারতে। আর প্রাক-চৈতন্য বৈষ্ণব সাহিত্যের যুগে বৈষ্ণব পুথিচিত্রের প্রচলন শুরু হয়ে গেছে।

মধ্যযুগে পারস্য রীতির পুথি অঙ্কিত হয়েছে সুলতান নসরৎ শাহের পৃষ্ঠপোষকতায় ‘শরফনামা’য় (১৫৩১-১৫৩২)। এই সময় পারস্যশৈলীর আর কোনো চিত্রিত পুঁথি পাওয়া যায়নি। পরবর্তী দুশো বছরেও এই রীতি বাংলা পুথিচিত্রে কোনো প্রভাব ফেলতে পারেনি। আঠারো-উনিশ শতকে ঢাকা-মুর্শিদাবাদের নবাবদের পৃষ্ঠপোষকতায় মোগলশৈলী ও তার অপভ্রংশ ‘লক্ষ্ণৌ কলাম’-এ কিছু পুথি চিত্রি হয়েছে।

 

মধ্যযুগের বাংলা পুথি পাটার চিত্র

 

পনেরো শতক থেকে বাংলায় পুথিচিত্র এবং পুথির পাটায় পাহাড়ি- রাজস্থানীশৈলীর সংশ্লেষণ দেখা যায়। বিষ্ণুপুরের মল্ল রাজাদের সঙ্গে রাজস্থানের যোগাযোগ থাকায় রাজস্থানী শিল্পীরা এ অঞ্চলে আসেন এবং রাজস্থানী-বাংলা মিশ্রশৈলীর উদ্ভব ঘটে। এ ধরনের পুথির পাটা প্রচুর পরিমাণে পাওয়া যাচ্ছে মূলত বিষ্ণুপুর ও পার্শ্ববর্তী মেদিনীপুর ও বীরভূম জেলায়। এ ছাড়া মুর্শিদাবাদ, হাওড়া, হুগলি, কোচবিহারেও এই শৈলীর পাটা পাওয়া গেছে। বলা বাহুল্য, কোচবিহার রাজবংশের সঙ্গে রাজস্থানের একটা যোগাযোগ ছিল এবং রাজস্থানী শিল্পীরা কোচবিহারেও এসেছিলেন।

সরসীকুমার সরস্বতীর সংগ্রহের এক ভাগবত-মহাপুরাণ’-এর (১৬৮৯-১৬৯০ খ্রি.) কথা জানা যায়, ভাষা সংস্কৃতি, লিপি বাংলা, অর্থাৎ বঙ্গাঞ্চলেই লিখিতও চিত্রিত। কৃষ্ণের নানা কাহিনি ও লীলা চিত্রগুলোর সঙ্গে ‘কারগুব্যূহের (১৪৫৫) চিত্রশৈলীর কিছু সাদৃশ্য দেখা যায়। ভাগবত-মহাপুরাণের এই দশম স্কন্ধের চিত্রগুলো (ছিয়াত্তরটি পৃষ্ঠা) রাজপুত বা পশ্চিম ভারতীয় শৈলীর থেকেও অনেকটা দেশীয় বা লৌকিক ধারার’। (দৃষ্টব্য : ড. ব্রতীন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়, ১৯৮১)। এই বলিষ্ঠ রেখার দ্রুতগতি বাংলা কলমের শিল্পকলার (কৃতজ্ঞতা : ভোলানাথ ভট্টাচার্য) এক বৈশিষ্ট্য। এই দ্রুতগতির রেখার বিন্যাস উনিশ শতক থেকে কালীঘাট পটে মূর্ত হয়ে উঠেছে। আর-একটি ভাগবত- মহাপুরাণের চিত্রিত পুথি শ্যামল বেরার সংগ্রহে আছে।

রাজপুতশৈলীর চিত্রকলার বিকাশ বাংলায় প্রথমে সম্ভবত বিষ্ণুপুর অঞ্চলে হয়েছিল, বাঁকুড়া ও বাঁকুড়াসংলগ্ন অঞ্চল থেকে বহুসংখ্যক রাজপুত বা মিশ্র-রাজপুতশৈলীর পাটাচিত্র সংগৃহীত ও সংরক্ষিত আছে। এই ধরনের চিত্র এসেছে চৌকো পটে—বেহালায় রাজ্য পুরাতত্ত্ব বিভাগের সংগ্রহশালায় সংরক্ষিত আছে আঠারো শতকের রঙিন একটি চৈতন্য সংকীর্তনের পট (০৪.৫৫)। এটি এক রাজস্থানী শিল্পীর আঁকা, পেছনে নাগরী লিপিতে লেখাও আছে। আবার এই ওই ছবিটিরই একটি রেখাচিত্র (কালো কালিতে) রয়েছে দিল্লির ন্যাশনাল মিউজিয়ামে (পরিচয় দিয়েছেন Stuart Cary Welch”, সূত্রটি প্রতীপকুমার মিত্রের)।

অনেকক্ষেত্রেই শিল্পীরা কালো কালিকে একটা খসড়া করে নিতেন বা ড্রইং করে বর্ণলেপন করতেন। উক্ত চৈতন্য সংকীর্তন ড্রয়িংটিতে দেবনাগরী ও বঙ্গাক্ষরে শ্রীচৈতন্য ও পারিষদদের নাম লেখা আছে। সম্প্রতি কলকাতা জাতীয় গ্রন্থাগারের সৌজন্যে সুকুমার সেন-এর পুথিসংগ্রহ দেখার সুযোগ হলো। নয়-দশটির মতো পুথিতে কিছু কিছু রেখাচিত্র আছে আর অলংকৃত পৃষ্ঠা অনেকগুলো।

একটি নাগরী লিপির খণ্ডপুথির পাতায় ছ-টি অবয়ব অঙ্কিত; নাগরী লিপির এই পুথিতে ছবির নিচে বাংলায় লেখা আছে ইনি বানর, ইনি যুবা প্রভৃতি (৫০৪৪/৮৬২)। এই কালো রঙের রেখাচিত্রগুলোও লোকচিত্রকলাধর্মী। এই পুথিটির একটিমাত্র পাতা পাওয়া গেছে, কবেকার জানার উপায় নেই, কাগজ ও লেখন দেখে আঠারো শতকের বা উনিশ শতকের গোড়ার বলে মনে হলো।

 

মধ্যযুগের বাংলা পুথি পাটার চিত্র

 

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সংগৃহীত ‘পদ্মপুরাণ’ (যাতে ঊনচল্লিশটি পৃষ্ঠা চিত্রিত)-এর ছবির বিবরণ আমরা আগেই দিয়েছি (দ্রষ্টব্য : বাংলার মধ্যযুগের চিত্রকলা টেরাকোটা ২০১২) আর-একটি ‘পদ্মপুরাণ’ বা ‘মনসামঙ্গলে’র পুথি—দু-পাতায় নানা অবয়বের লৌকিক লেখাচিত্র, দু- পাতায় নকশা—ষষ্ঠীধর জগন্নাথ রচিত, তারিখ বিহীন (যতীন্দ্রমোহন ভট্টাচার্য সংগ্রহ [সি-৪৭], জাতীয় শিক্ষা পরিষদ ও মায়া ভট্টাচার্যের সৌজন্যে)। এর অবয়বগুলোর সঙ্গে সুকুমার সেন কর্তৃক সংগৃহীত নাগরী লিপির পুথির পৃষ্ঠা আর ঢাকা সংগ্রহের ‘পদ্মপুরাণ’ (১৮০৫)-এর সাদৃশ্য লক্ষণীয়। যতীন্দ্রমোহন ও ঢাকার পুথি দুটি উত্তর-পূর্ব বাংলার আর সুকুমার সেনের পুথি পশ্চিমবঙ্গের—অর্থাৎ, সারা বাংলাজুড়ে রেখাচিত্রের প্রচলন ছিল। এই ধরনের রেখাচিত্র লৌকিক শিল্পে, আলপনায়, কাঁথায় বা জাত-পটুয়াদের দীঘল পটে দেখা যায়।

চূঁচূড়ার আর. সি. মণ্ডলের সংগ্রহে এক ‘গীতগোবিন্দ’-এর একটি পুথির কথা জানা যায় (বিস্তারিত বিবরণ : স্টেলা ক্রামরিস, রজতানন্দ দাশগুপ্তর নিবন্ধগুলো), তবে সেটি এখন কোথায় আছে জানা যাচ্ছে না। মুদ্রিত ছবিগুলো ও বিশেষজ্ঞদের আলোচনা থেকে জানা যাচ্ছে, এগুলোও রাজপুত তথা পশ্চিম ভারতীয় শিল্পশৈলী। বঙ্গাক্ষরে লেখা পুথির চিত্রগুলোতে দেশীয় শৈলীর স্পর্শও দেখা যায়। কলকাতা ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়ামে আরেকটি চিত্রিত গীতগোবিন্দের পুথি আছে বঙ্গাক্ষরে লিখিত এবং প্রতিটি পাতাই চিত্রিত। এ চিত্রশৈলী দেশীয় শিল্পীদের লৌকিক শৈলী।

বাংলার ভিত্তিচিত্র বা দেওয়ালচিত্রগুলির মধ্যে টিকে আছে বহুডু ও গুপ্তিপাড়ার মন্দিরের কিছু চিত্র, এর মধ্যে বহুভু ভিত্তিচিত্রগুলোর (শিল্পী দুর্গারাম ভাস্কর) সঙ্গে গীতগোবিন্দর পুথিচিত্রের মিল পাওয়া যাচ্ছে। বাঁকুড়ার কিছু মন্দিরে ভিত্তিচিত্রের কথা অজিত মুখার্জি বলেছেন, সম্প্রতি প্রদীপ কর জানালেন, বাঁকুড়া-কোতলপুর সড়কের কুম্ভস্থল গ্রামের কাছে রাউতখণ্ড গ্রামে এক ভগ্নপ্রায় মন্দিরে ভিত্তিচিত্র দেখেছেন। এগুলো হয়তো সেই শিল্পী সম্প্রদায়ের কাজ, যাঁরা পুথির পাটা- চৌকোপট এঁকেছেন।

পনেরো থেকে উনিশ শতক পর্যন্ত যেসব পুথির পাটা বা চিত্রিত পুথি পাওয়া গেছে, তার শৈলীকে কয়েকটি ভাগে ভাগ করা যায়—

১. বাঁকুড়া-বিষ্ণুপুর শৈলী মূলত মিশ্রণ রাজপুত -পাহাড়ি শৈলীর সঙ্গে দেশজ শৈলীর মিশ্রণজাত এই শৈলী। শিল্প-ঐতিহাসিক জয়ন্ত চক্রবর্তী এই শৈলীকে চারটি উপবিভাগে বিভক্ত করেছেন :

ক. ফুল-লতা-পাতার সরল নকশার অলংকরণ, পাটার বর্ডার সরু নকশাঙ্কিত। পাটার মধ্যভাগে বিস্তারিত অলংকরণ, যেখানে কোনো অবয়ব নেই।

খ. নরম গোলাকার রেখার একটু ভারি অবয়ব, লাল পটভূমির ওপরে অঙ্কিত, আর কোনো নিসর্গের আভাস নেই। যেমন—’রাসলীলা’, ‘বীর হাম্বির, তাঁর রানির সঙ্গে শ্রীনিবাস আচার্যের সাক্ষাৎ’ (আশুতোষ মিউজিয়াম সংগ্রহ), ‘শ্রীকৃষ্ণের নৃত্য’ (যোগেশচন্দ্র পুরাকীর্তি ভবন বিষ্ণুপুর)—তিনটিই সপ্তদশ শতকের।

গ. তৃতীয় প্রকার আরও সূক্ষ্ম অবয়ববিন্যাস, পশ্চাৎপটে গাছপালা-পাতার ডিটেলের কাজ। মেয়েদের পোশাকে স্বচ্ছ ওড়নি, তাদের কাপড়ে বিন্দু ও ফুলের মোটিভ দিয়ে অলংকরণ। যেমন—‘উদ্যান রাধাকৃষ্ণ’ ‘প্রতাপরুদ্র চৈতন্যদেব সাক্ষাৎকার’, ‘মথুর যাত্রা’। এগুলো সপ্তদশ শতকের শেষভাগের অথবা অষ্টাদশ শতকের প্রথম দিকের (আশুতোষ মিউজিয়াম সংগৃহীত)।

ঘ. চতুর্থ প্রকার শক্তিশালী মুক্তক রেখাচিত্রে যার বিন্যাস কিছুটা কৌণিক ধরনের। যেমন—‘রামের সিংহাসন লাভ’, আঠারো শতক, আশুতোষ মিউজিয়াম সংগ্রহ।

 

মধ্যযুগের বাংলা পুথি পাটার চিত্র

 

২. লোকায়ত শৈলী – এই শৈলীতে সম্পূর্ণভাবে দেশীয় চিত্রকরদের 2 অঙ্কনরীতি দেখা যায়। কোথাও জাত- পটুয়া ধরনের অঙ্কন ও পাওয়া যায়; যেমন বীনপুরের পাশে ষাঁড়পুর গ্রামের বৈষ্ণববাড়ির দুটি পাটা স্থানীয় যদু পটুয়াদের অঙ্কিত বলে সুধাংশুকুমার রায় জানিয়েছেন। মুর্শিদাবাদ থেকে সংগৃহীত সপ্তদশ শতকের একটি ভয়ংকরী কালীমূর্তির একটি পাটার (আশুতোষ মিউজিয়ামে সংরক্ষিত যে-কালীমূর্তি) মধ্যে কোনো উত্তর ভারতীয় শিল্পীশৈলীর ছায়া নেই। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পুথিশালায় টাঙ্গাইল থেকে সংগৃহীত ‘পদ্মপুরাণে’র (১৮০৫) উনচল্লিশটি পৃষ্ঠা চিত্রণ সমন্বিত পুথিটি লৌকিক শিল্পকলার বিশিষ্ট বিরল নিদর্শন। এই পুথির চিত্রণে টাঙ্গাইল ময়মনসিংহ অঞ্চলে প্রচলিত সরাচিত্র, শাড়ির নকশার অনেক উপাদান পাওয়া যায়।

৩. মিশ্র ওড়িয়া-রাজপুতদেশীয় শৈলী : মহিষাদলে ১৭৭২-১৭৭৫ খ্রিস্টাব্দে লিখিত-চিত্রিত ‘রামচরিতমানসের পুথিচিত্রগুলো এই ধারার বিশিষ্ট নমুনা। একশো বাহান্ন পৃষ্ঠার চিত্র সমন্বিত এই পুথিটি দ্বিজ ইচ্ছারাম মিশ্র কর্তৃক লিখিত। এ ছাড়া, মেদিনীপুর অঞ্চলে প্রাপ্ত কিছু পাটা বাংলার লৌকিক শৈলী ও উড়িষ্যার শৈলীর মিশ্রণে অঙ্কিত । এই পুথির চিত্রণ করেন একাধিক শিল্পী।

৪. গুজরাট-রাজস্থানদেশীয় শৈলী: মেদিনীপুরের রামগড়ের রাজবাড়িতে এই শৈলীর কিছু পাটাচিত্র ছিল। ‘গুজরাট থেকে আগত এখানকার রাজবাড়ির পূর্বপুরুষ বৈষ্ণবসাধক শ্যামানন্দের কাছে বৈষ্ণবধর্মে দীক্ষিত হওয়ার ফলে কালক্রমে কাষ্ণের চৈতন্য, বাঙালি-গুজরাটি আর্টের জন্ম দিয়েছে।’

গুজরাট বা প্রাদেশিক রাজস্থানি চিত্রকলার প্রভাব এখানে ক্রিয়াশীল হওয়ার ‘রামগড়’ স্কুলের পুথির পাটা আর্টের রহস্যময় সৃষ্টি বাংলায় সম্ভব হয়েছিল। এগুলোও আঠারো শতকের।

৫. তান্ত্রিক চিত্রিত পুথি : হরিতাল বর্ণের তুলোট কাগজে কৃষ্ণানন্দ ভট্টাচার্য লিখিত তান্ত্রিক যন্ত্র, চক্র অঙ্কিত। এ ধরনের আরও পুথি ব্যক্তিগত সংগ্রহে আছে বলে অনুমান করা যায়।

৬. স্বচ্ছ গুয়াস বা স্বচ্ছ টেম্পোরার মতো পুথিচিত্র : সরসীকুমার সরস্বতী ‘ভাগবত মহাপুরাণ’ এ ধরনের পুথি (১৬৮৯ থেকে লেখা শুরু হয়)। ২০৩ পৃষ্ঠার এই পুথিতে একশো আটান্নটি চিত্র রয়েছে। এর বৈশিষ্ট্য : স্বচ্ছ জলরং ‘ওপেক’ পদ্ধতির প্রয়োগ। পালযুগের চিত্রকলার উপাদান এর বিন্যাসে কিছু কিছু এসে যায়, যদিও এই পুথির আয়তন পালযুগের তিন গুণ ।

৭. কোচবিহার শৈলী : এই শৈলীও মিশ্র; রাজপুত ও আঞ্চলিক উপাদান মিশ্রিত। দুই রাজা হরেন্দ্রনারায়ণ এবং শিবেন্দ্রনারায়ণ (১৮৩৯-১৮৪৭) শিল্পী ছিলেন। পুথি ‘উপকথা’ আর সংগীত বিষয়ক পুথি ‘সংগীত’ চিত্রিত। এ ছাড়া কোচবিহারের একটি ‘ঊষাহরণ’ বিবরণ দিয়েছেন অগ্নিবর্ণ ভাদুড়ি।

৮. মুর্শিদাবাদ শৈলী : নবাব আলিবর্দি খান (১৭৪০-১৭৫৬) সিরাজ ও মির কাশেম (১৭৬০-১৭৬৩) — এঁদের কিছু শিল্পী ছিলেন এবং তাঁদের অঙ্কনক্ষেত্র বা স্টুডিয়ো ছিল। দস্তুরি-এ-হিম্মত (১৭৫৬- ১৭৬৫), রাজমনামা (১৭৬১-১৭৬৩) এ-পর্যায়ে অঙ্কিত। নলদমন (১৮০৮) পুথিটির একত্রিশ পৃষ্ঠা চিত্রিত। লাল রেশমে বাঁধানো এবং জরি সূচিশিল্প করা, পৃষ্ঠাগুলো সোনার রং দিয়ে পুষ্পময় চিত্রে চিত্রিত। অনুরূপ ১৭৯৬-তে লিখিত ও অঙ্কিত ‘নলদময়ন্তী’ চিত্রিত পুথিটি ইন্ডিয়া অফিস লাইব্রেরিতে সংরক্ষিত। বিশেষজ্ঞরা বলেন, ১৮২৯-এ মুর্শিদাবাদে মোগল শৈলী চিত্রকলার অন্তিম পর্ব ।

৯. ত্রিপুরার পুথিচিত্র : ১৮৫৫-এ ত্রিপুরায় ‘পদকল্পমেরু’ চিত্রিত হয়, এর চিত্রকর আলম কারিগর, শৈলী মিশ্র মোগল শৈলী।

১০. কালো কালির অঙ্কন ত্রিপুরা বসু বিশ্বভারতী সংগ্রহের চারটি পুথির কথা উল্লেখ করেছেন, এগুলো ভাগবতীচরণ মিস্ত্রী লিখিত, *এর চিত্রগুলি কালো কালিতে অঙ্কিত। মহাভারতের আদিপর্বের প্রথম পাতায় গণেশ, শান্তিপর্বের প্রথম পাতায় মহিষাসুরমর্দিনী: কৃষ্ণদাসের ‘নারদসংবাদ’ পুথির শেষপাতায় তুলি বা লেখনি হাতে চৌকিতে উপবিষ্ট পুরুষ এবং ‘দুর্গাপঞ্চরাত্র’ পুথির প্রথম পাতায় কৃষ্ণের ছবি অঙ্কিত”।” কালো কালিতে লেখাচিত্র বা নকশাযুক্ত আরও কিছু পুথি আছে।

কলকাতার এশিয়াটিক সোসাইটির ‘চৈতন্যভাগবতে’র পুথির আটান্নটি পৃষ্ঠা চিত্রিত, এটি ১৮৪৯-এ ব্রজমোহন দেবশর্মা কর্তৃক অনুলিপিকৃত। তুলোট কাগজ বা দেশি হস্তে-প্রস্তুত কাগজে লিখিত-চিত্রিত এই পুথি প্রতিটি পৃষ্ঠাই ফুলের নকশা ধরনের বর্ডার দেওয়া। এ ছাড়া পদ্ম, চৈতন্যদেবের পদচিহ্ন, মঙ্গলঘট, রথ, মাছ, পতাকা, রাশিচক্র আরও কিছু কিছু প্রতীক অঙ্কিত।

ষোলো থেকে উনিশ শতক পর্যন্ত প্রাপ্ত অনেকগুলো পুথির পাটায় বৈষ্ণব ভাবধারা প্রাধান্য পেয়েছে। এগুলোতে দশাবতার কৃষ্ণের বিবিধলীলা, পৌরাণিক, চৈতন্যলীলা, রামায়ণ, মহাভারতের সংখ্যাধিক্য দেখা যায়। এগুলো সংরক্ষিত আছে বিষ্ণুপুরের যোগেশচন্দ্র পুরাকীর্তি ভবন, আশুতোষ মিউজিয়াম, ইন্ডিয়ান মিউজিয়াম, বিশ্বভারতী কলাভবন, গুরুসদয় মিউজিয়াম (জোকা), হাওড়ার আনন্দনিকেতন কীর্তিশালা, রাজ্য প্রত্নতত্ত্ব সংগ্রহশালা (বেহালা), বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদে। বাঁকুড়া-বিষ্ণুপুর এবং তৎসন্নিহিত মেদিনীপুরে এ ধরনের পাটা সর্বাধিক পাওয়া গেছে।

যেহেতু পুথি থেকে খুলে পাটাগুলো আলাদাভাবে সংরক্ষিত হয়েছে, তাই অধিকাংশ ক্ষেত্রে লিপিকাল ও অঙ্কনকাল সঠিক জানা যায় না। এ ছাড়া বীরভূম, মুর্শিদাবাদ, হাওড়া, হুগলি, কোচবিহার অঞ্চলে বহুসংখ্যক পাটাচিত্র পাওয়া গেছে।

বীরভূমের একটি সপ্তদশ শতকের পাটায় মুদ্রিত চৈতন্যদেবকে রাজা প্রতাপরুদ্রের পদসেবার পাটাচিত্র উৎকৃষ্ট চিত্রাঙ্কনের বিশিষ্ট নিদর্শন। তুলনায় শাক্ত ও শৈব চিত্রাবলি অল্প। আশুতোষ মিউজিয়ামে সংগ্রহ—অষ্টাদশ শতকের একটি পাটায় শিব শিঙা ফুঁকতে ফুঁকতে চলেছেন, পাশে ভৃঙ্গি—ছবিটি দক্ষ চিত্রকরের।

 

মধ্যযুগের বাংলা পুথি পাটার চিত্র

 

ত্রিপুরা বসু ব্যক্তিগত সংগ্রহের আরও কিছু পাটাচিত্র হিসেবে উল্লেখ করেছেন দুর্গাপুর অঞ্চলের আড়ারা গ্রামের চট্টিরাজ পরিবারের সংগ্রহে। এগুলোও বৈষ্ণব চিত্রকলা, অনেকগুলোই সংরক্ষণের অভাবে প্রায় নষ্ট হয়ে এসেছে। দুর্গাপুরের কাছে সাগরভাঙা গ্রামের সাধন গুই-এর পারিবারিক সংগ্রহের পুথির পাটাটিও অভিনব; ‘দু-দল বৈষ্ণব কোমর বেঁধে ঘুষি বাগিয়ে পরস্পরের উদ্দেশে মারমুখী ভঙ্গিমায় দৃশ্যমান। একদল বৈষ্ণবের মাঝে কোনো বিশিষ্ট বৈষ্ণব দণ্ডায়মান।

গৌড়ীয় বৈষ্ণবদের সঙ্গে সহজিয়া বৈষ্ণবদের এমন মারামারির দৃশ্য নিয়ে আর কোনো পুথির পাটা চিত্রিত হয়েছে কিনা জানা নেই। এরকম অনাবিষ্কৃত অনালোচিত পাটার সন্ধান আজও গ্রাম-বাংলায় পাওয়া যায়। মেদিনীপুর জেলার দাসপুর থানার বাসুদেবপুর গ্রামে পঞ্চানন রায় মহাশয়ের ব্যক্তিগত সংগ্রহে দশাবতারের বহুবর্ণ চিত্র অঙ্কিত দুটি পাটা দেখেছিলাম ১৯৭৩ সালে। পাটা দুটির সূক্ষ্ম অলংকরণ ও বর্ণ সংস্থাপন উচ্চস্তরের চিত্রশিল্পীরীতির নিদর্শন”। তারাপদ সাঁতরা হাওড়ার ঝিখিরার কেরাণী রায় পরিবারের সংগ্রহের কথা উল্লেখ করেছেন’। তারাপদ সাঁতরা ও সুধাংশু রায়—দু-জনেই মেদিনীপুরের রামগড় রাজার সংগ্রহের কথা বলেছেন।

উত্তরবঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের পুথিশালায় কিছু চিত্রিত পাটা আছে, যার মধ্যে মালদহ থেকে সংগ্রহ করা মানিক দত্তের ‘চণ্ডীমঙ্গল’ ও কোচবিহার থেকে সংগ্রহ দ্বিজ কবিরাজের ‘মহাভারত’ উল্লেখযোগ্য। ঢাকা মিউজিয়ামে কয়েকটি বৈষ্ণবচিত্র সমন্বিত পাটা আছে।

বিশ্বভারতীর সংগ্রহে অন্যান্য চিত্রিত পুথির মধ্যে ‘অন্নদামঙ্গল’, ‘রামায়ণ’, ‘মহাভারত’ ও কয়েকটি পুথি সংগৃহীত।

ইন্ডিয়ান মিউজিয়ামের সংগ্রহে ধর্মীয় আলোচনা বিষয়ক পাটাটিতে শঙ্করাচার্যের সঙ্গে অন্য মতালম্বীদের বিতর্কসভার চিত্র, অন্য দিকে রামচন্দ্র, বানর মেলা, তীর-ধনুক-সহ লবকুশ ।

গুরুসদয় সংগ্রহশালার সংগৃহীত পাটাগুলোর মধ্যে একটি দশমহাবিদ্যার পাটা ছাড়া অধিকাংশ বৈষ্ণবীয়। একটি উল্লেখযোগ্য পাটা হলো ষাঁড়ের পিঠে শিব, কালী, দুর্গা।

এ ছাড়া বিদেশে কিছু চিত্রিত পাটা সংগৃহীত হয়েছে, তাদের মধ্যে লন্ডনের ভিক্টোরিয়া ও অ্যালবার্ট মিউজিয়ামের সংগ্রহটি উল্লেখযোগ্য।

কাঠের পাটাকে চিত্রিত করার দুটি পদ্ধতি দেখা গেছে। প্রথমটি, কাঠের পাটার উপর আঠা দিয়ে কাপড় লাগানো এবং সেই কাপড়ের উপর একটি ভিত্তি রং লাগিয়ে তার ওপর চিত্রণ। এটি বিষ্ণুপুর-বাঁকুড়া অঞ্চলে প্রচলিত ছিল। অপর পদ্ধতি, সরাসরি কাঠের উপর সাদা রঙের প্রলেপ দিয়ে ভিত্তি তৈরি করে আঁকা ছবি আঁকা হলে গালা বা লাক্ষা জাতীয় জিনিস দিয়ে বার্নিশ করে দেওয়া হতো।

পুথির ভেতরের চিত্রণ ও পাটা চিত্রণের জন্য ভূমিজ ও ভেষজ উৎসের রং ব্যবহার করা হতো। নীল রং হতো নীল বড়ি বা তুঁতের সাহায্যে। শঙ্খচূর্ণ, খড়ি মাটি, গিরি মাটি, এলা, লালসিসা, লাক্ষা, মেটে সিঁদুর, সিমের বিচি, চূর্ণ হলুদ, জাম বা পুঁই মেচুড়ির রস, হরিতাল প্রভৃতি থেকে রং তৈরি হতো। ভুসোকালির থেকে কালো রং হতো; শামুকের খোলা থেকে এক ধরনের সাদা রং হতো। গোমূত্র থেকে হতো হলুদ রং। লালের জন্য মেটে সিঁদুরের সঙ্গে আলতাও ব্যবহৃত হতো। কোনো কোনো পুথিতে সোনার জলের সাহায্যে সোনালি রং ব্যবহৃত হয়েছে।

পুথি লেখার কালি ও কালো রং তৈরির ব্যাপারে অচিন্ত্য বিশ্বাস দুটি ছড়া উদ্ধৃত করেছেন, একটি নির্মল করের ‘সেকালের পুথিপত্র ও লিপিকরেরা’-তে উদ্ধৃত—

তিল ত্রিফলা শিমুল ছালা

ছাগ দুগ্ধে করি মেলা

ছিঁড়ে পাত্র না ছাড়ি মসী

আর একটি —

কাজল গোমূত্র লয়ের জল

ভৃঙ্গ ভেলা দিয়ে তোল

পীত কাষ্ঠ দিয়ে রসি

তোটে পত্র না তোটে মসি

ছড়া দুটিতে প্রাপ্ত কালি তৈরির উপকরণের তালিকা তৈরি করা যায়: ১. তিল, ২ ত্রিফলা, ৩. শিমুলের ছাল, ৪. ছাগ দুগ্ধ, ৫ কাজল, ৬. গোমূত্র, ৭. লাউয়ের জল। আবার চিত্রা দেব-এর ‘পুথিপত্রের আঙিনায় সমাজের আলপনায় আর একটি রীতির কথা বলা আছে—

লোধ লোহা লোহার গুঁড়ি। অর্কাঙ্গার জবার গুঁড়ি ॥

গাবের ফল হরিতকী । ভৃঙ্গার্জুন আমলকী ॥

বাবলা ছাল জাটির রস । ডালিম সেচে করিবে কষ ॥

ভেলায় করা এক আলি। চারি যুগ না উঠিবে কালি ॥

পালযুগের পুথিচিত্র একটি ছাড়া সবই তালপাতায় অঙ্কিত। এ ছাড়া আরও কিছু সংস্কৃত পুথি এ অঞ্চলে রচিত তালপাতায় লিখিত। পরবর্তী পুথি বাংলাদেশে লেখা বাংলা ও হিন্দি ভাষায় যেগুলো কাগজেই লেখা হয়েছে। বাংলায় বিভিন্ন ধরনের হাতে তৈরি কাগজ বা তুলোট কাগজ তৈরি হতো, অঞ্চল ভেদে কাগজের সামান্য পরিবর্তন হতো। কাগজ প্রস্তুতকারকদের বলা হতো কাগজি, আবার মুকুন্দরামের ‘চণ্ডীমঙ্গলে’ পাই—’কাগজ কুটিয়া নাম ধরল কাগতি’।

কীভাবে তালপাতা তৈরি হতো, তার বিবরণ দিয়েছেন সরসীকুমার সরস্বতী : পাতাগুলি সংগ্রহ করে গোছা করে বাঁধার পর জলে ডুবিয়ে রাখা হতো। মাস খানেক পর সেগুলি তুলে গোছাবাঁধা অবস্থাতেই লম্বাভাবে ছায়ায় শুকোনো হতো। আবহাওয়া অনুসারে শুকোতো লাগত চার থেকে সাত দিন। তারপর প্রত্যেকটা পাতা শাঁখ দিয়ে ঘষে দু-দিকে মসৃণ করা হতো। পরে পাতাগুলো সাজিয়ে সমানভাবে কাটা হতো।

দেশি তুলোট কাগজ প্রস্তুতপ্রণালী দিয়েছেন অচিন্ত্য বিশ্বাস, ‘পুরোনো চট, ছেঁড়া কাপড়, আঁশওয়ালা গাছের টুকরো চুনে মিশিয়ে ঢেঁকিতে কুটে নেওয়া হতো। চুনের জলে এই মণ্ডটিকে ভেজানো হতো, কয়েক দিন পর পর জল বদলে দেওয়া হতো। ছাঁচে ঢেলে মণ্ডটিকে চাপে রেখে তৈরি করা হতো কাগজ। এই কাগজ শুকোনো হতো ধীরে ধীরে। পরে ভাতের ফ্যানের ওপর ঘেঁটে নিয়ে আবার শুকিয়ে কয়েক দিন চাপা দিয়ে রাখা হতো। সব শেষে ভেলা দিয়ে (গিলে করার কাজে আজও যার ব্যবহার আছে) ঘষা হতো কাগজের টুকরোগুলো। মসৃণ ও স্থায়ী করার আর একটি পদ্ধতিও ছিল।

কাগজের ওপর গদ, কাঁইবিচি (তেঁতুল বীজ) বাটা, হরিতাল বাটা প্রভৃতির প্রলেপ দেওয়া হতো। এর ফলে কাগজে সহজে পোকা ধরত না। হরিতাল মেশানোর পর বড়ো কড়ি, শঙ্খ বা ঝিনুক দিয়ে ঘষে ঘষে মসৃণ করা হতো।

পুথির পাটা আঁকতেন সাধারণ সূত্রধর সম্প্রদায়। পাথর-কাঠ-মৃৎ ও চিত্র—এই চার আগেই তাঁদের দক্ষতা ছিল। পুথির ভেতরের চিত্রও সম্ভবত তাঁরাই করতেন কোথাও কোথাও শর্মা উপাধিধারী পাওয়া গেলেও। এ ছাড়া যেসব রাজস্থানী ও উত্তর ভারতীয় শিল্পীরা বাংলায় বসবাস করতেন, তাঁরাও পাটাচিত্র পুথিচিত্র এঁকেছেন। জাত-পটুয়ারা দু-একটি ক্ষেত্র ছাড়া পুথিচিত্র লেখার সুযোগ পেতেন না। এই সূত্রধর সম্প্রদায়ের শিল্পকর্ম সারা বাংলায় ছড়িয়ে আছে, মন্দিরের টেরাকোটায়, প্রস্তর ভাস্কর্যে, মন্দিরগাত্রের চিত্রে, রথের অঙ্কন-অলংকরণে, কাষ্ঠ- শিল্পে, চৌকোপট অঙ্কনে।

এই সম্প্রদায়ের শিল্পকর্মের প্রাচীনতম প্রমাণ পাওয়া যায় কবিকঙ্কন মুকুন্দরাম-কৃত ‘চণ্ডীমঙ্গলে’ : ‘ছুতারপুরের মাঝে চিঁড়া কুটে মুড়ি ভাজে কেউ চিত্র করায় নির্মাণে। …. হুদ্দার চৌকাঠি সূত্রধর চিত্র গড়ে সব সমান কপাট।’ এঁরা কেউ কেউ ভাস্কর, ফৌজদার ইত্যাদি উপাধি ব্যবহার করতেন। আসামে অনুরূপ একটি শিল্প সম্প্রদায় ‘খনিকর’ সম্প্রদায় এঁরাও কাষ্ঠ-প্রস্তর-মৃৎ-চিত্রশিল্প করতেন এবং অনেকগুলো পুথিতে চিত্রকরের নাম পাওয়া গেছে।

কলকাতার বিড়লা অ্যাকাডেমিতে ছ-টি বাংলার পাটা আছে যার মধ্যে দুটি চৈতন্যদেব সংক্রান্ত, অন্য দুটি পাটায় লোকায়ত অঙ্কন শৈলী দেখা যায়; এগুলো আঠারো শতকের।

অনেকগুলো পাটা এবং চিত্রিত পুথির সন্ধান আর পাওয়া যাচ্ছে না, যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য চুঁচুড়ার গীতগোবিন্দের পুথি, ভাগবত মহাপুরাণের পুথি। ত্রিপুরা বসু দুই বৈষ্ণবগোষ্ঠীর মধ্যে হাতাহাতির দৃশ্যযুক্ত যে-পাটাটা দেখেছিলেন, সেটিরও আর হদিস নেই । বিশ্বভারতীর তালিকাভুক্ত একটি পাটাচিত্র দেখতে পাওয়া গেল না । হয়তো মধ্যযুগের পুথিপাটা ও তার চিত্রকে আমরা ততটা গুরুত্ব দিতে পারিনি। প্রতিবেশী আসাম ও উড়িষ্যার ওই সময়ে পুথিপাটা সচিত্র, অনেক ভালোভাবে সংরক্ষিত আছে।

আরও দেখুনঃ

Leave a comment