Site icon Fine Arts Gurukul [ চারুকলা গুরুকুল ] GOLN

বাংলার মন্দির গাত্রচিত্র

বাংলার মন্দির গাত্রচিত্র

আজকের আলোচনার বিষয় : বাংলার মন্দির গাত্রচিত্র। যা বাংলার চিত্রকলা ( মধ্যযুগ থেকে কালীঘাট) এর অন্তর্গত।

 

 

 

বাংলার মন্দির গাত্রচিত্র

পশ্চিম বঙ্গে একসময় মন্দির গাত্রচিত্র প্রচলিত ছিল। এখন অধিকাংশই নষ্ট হয়ে গেছে, তিনটি মাত্র মন্দিরে কিছু গাত্রচিত্র রয়ে গেছে।

বৃন্দাবনচন্দ্র মন্দির, মোঘল রীতির নক্সা, ১৯ শতক, গুপ্তিপাগা, হুগলী

 

পূর্বকথা : আদিম যুগ থেকেই মানুষ গুহাগাত্রে ছবি এঁকেছে এসবের নিদর্শন আছে ফ্রান্সের দোর্দান বা স্পেনে যেগুলো প্রস্তর যুগের। ভারতে গুহাচিত্রের নিদর্শন পাওয়া যাচ্ছে একটু পরে, মধ্যপ্রদেশের ভিমবেটকা, উত্তরপ্রদেশের মির্জাপুরের কয়েকটি গুহা, পশ্চিমবঙ্গে ঝাড়গ্রামের কাছে লালজল—সবমিলিয়ে ১০০১টি গুহাচিত্র (সংখ্যাটি অশোক দত্তর দেওয়া) দেখা গেছে। এসব আদিম মানুষের অভিব্যক্তি প্রকাশ ও সংযোগ স্থাপনের উপায়।

পরবর্তী অর্থাৎ প্রাক-ইতিহাসের পরবর্তী যুগের গুহাচিত্র পাওয়া গেছে সুরগুজায় যোগীমারা গুহায়, এগুলো জৈন সম্প্রদায়ের চিত্রকলা বলে ব্যাখ্যাত হয়েছে, সময়কাল প্রথম খ্রিস্টপূর্বাব্দ (স্টেলা ক্রামরিশ)। ভারতীয় চিত্রকলার উৎকর্ষের প্রকাশ অজন্তা গুহায় (অজন্তায় ৯ ও ১০ সংখ্যক গুহার চিত্রণের কাজ শুরু হয়েছিল যথাক্রমে খ্রিস্টপূর্বাব্দের দ্বিতীয় ও প্রথম শতাব্দীতে)। সেই সঙ্গে ইলোরা, বাগ, বেদশা, কারলি, কাহ্নেরি ও জুনার-এ।

দক্ষিণ ভারতেও গুহাচিত্র বা মন্দির গাত্রচিত্রের সূচনা প্রায় একই সময়ে হয়, বাদামি বা বাতাপিপুরে চারটি গুহা চিত্রিত ছিল, এখন মাত্র একটিতে চিত্রকলার অস্তিত্ব আছে। দক্ষিণ ভারতেও মন্দির গাত্রচিত্র অঙ্কনের প্রথা অনেক দিন চলেছে। তার দৃষ্টান্ত রয়েছে লিপাক্ষী, তিরুনান্দিক্কর, মাদুরা, পদ্মনাভপুরম ও কাঞ্চিপুরমের মন্দিরগাত্রচিত্রগুলোয়। এখানে গুহাচিত্র ও মন্দির গাত্রচিত্রগুলোকে একই পর্যায়ভুক্ত করা হয়েছে।

বৃন্দাবনচন্দ্র মন্দির, বাংলা শৈলীর গাত্রচিত্র, ১৯ শতক, গুপ্তিপাড়া, হুগলী

 

ভারতীয় চিত্রকররা যাত্রা করেছিলেন মধ্য এশিয়া ও চীনে, সেখানে অনেকগুলো গুহা ও মন্দিরগাত্র তাঁরা চিত্রিত করেছিলেন। এর বিশদ বিবরণ পাওয়া যায় উপেন্দ্র ঠাকুর রচিত ‘দি ইন্ডিয়ান মঙ্ক পেন্টার্স ইন চায়না’ (১৯৮৬) তে । এর নমুনা রয়েছে খোটান, কুচা, কিজল, কাশগড়, তুমসুক, সেরুচুক, দান্ডান, বেজেকলি, ইয়ারখন্ড, মিরন উইলিক প্রভৃতি মধ্য এশিয়ার গুহাগুলোতে।

ভারতীয় মধ্য এশিয়া চীনা মিশ্র অঙ্কন শৈলীর সূচনা খ্রিস্টীয় সপ্তম, অষ্টম শতাব্দীতে শুরু হয়েছে যার দৃষ্টান্ত পাওয়া যায় সানসি প্রদেশের তিয়েন-লুন-সান, কানসুর তুন হুয়াং ও হোনান প্রদেশের গুহাচিত্রগুলোতে। এই ধারা ক্রমশ জাপান কোরিয়া ও সিংহলে ছড়িয়ে পড়ে ৷ সিংহলের সিগিরিয়া, জাপানের হরিয়ুজি, কোরিয়ার সক্কলঅমে এরকম দৃষ্টান্ত দেখা যায়, দেখা যায় মায়ানমার (বর্মা)-এও।

 

বৃন্দাবনচন্দ্র মন্দির, বাংলা শৈলীর গাত্রচিত্র, ১৯ শতক, গুপ্তিপাড়া, হুগলী

 

বৃন্দাবনচন্দ্র মন্দির, বাংলা শৈলীর গাত্রচিত্র, ১৯ শতক, গুপ্তিপাড়া, হুগলী

পূর্বভারতেও এই ধারার বিকাশ হয়েছিল, নালন্দার ধ্বংসস্তূপ থেকে প্রাপ্ত তিনটি চিত্রিত পাথর বা মন্দিরের গাত্রচিত্রের অংশ পাওয়া গেছে। বাংলা শিল্পকলা পালযুগে চরম উৎকর্ষে পৌঁছেছিল। নালন্দা বিহারেও পাল রাজাদের অবদান আছে। তাই অনুমান করা অযৌক্তিক হবে না বাংলার কিছু বৌদ্ধবিহার বা মন্দির চিত্রিত ছিল।

পালযুগের তিনটি বৌদ্ধবিহার পাহাড়পুর, মহাস্থানগড়, মোগলামারি ও জগজীবনপুরে টেরাকোটাতেও প্রস্তরখোদিত প্রচুর রিলিফের কাজ পাওয়া গেছে যার সঙ্গে পালযুগের পুথিচিত্রের রূপকল্পনা ও আকৃতিগত অনেক সাদৃশ্য আছে। এই তিনটি বৌদ্ধ বিহারে যে দেওয়াল চিত্র ছিল না এমন কথা বলা যায় না। পালপূর্ব যুগে হিউ এন সাং বাংলায় অনেক বৌদ্ধবিহার ও মন্দির দেখেছিলেন, হয়তো সেগুলোতেও ভাস্কর্যের সঙ্গে সঙ্গে চিত্রিত ছিল।

চতুর্থ শতকে ফা-হিয়েন তাম্রলিপ্তে চিত্রকরদের অবস্থান ও অঙ্কনের কথা লিখেছেন। পট চিত্রের উৎস খুঁজে পাওয়া যায় সাঁচি স্তূপের প্যানেলগুলো থেকে, বুদ্ধদেবের সময় থেকে বা তারও আগে থেকে ভারতে পটচিত্র অঙ্কিত হতো যদিও ভারতে প্রাচীন পটচিত্রের কোনো নমুনা পাওয়া যায়নি। চীনে একটি দেওয়ালচিত্রে দেখা যায় বুদ্ধ একটি দীঘল পট বা লাটাইপটের মতো একটি পট দেখছেন, ওই চিত্রটি থেকে আমরা খ্রিস্টীয় সপ্তম-অষ্টম শতকের দীঘলপটের চেহারা খানিকটা অনুমান করতে পারি।

বৃন্দাবনচন্দ্র মন্দির, গর্ভগৃহের উপরিভাগের চিত্র, মিশ্রশৈলী, গুপ্তিপাড়া, হুগলী

 

বঙ্গীয় চিত্রকলার এ যাবৎ প্রাচীনতম উপাদান পালযুগের পুথিচিত্র। এগুলোর সঙ্গে অজন্তার দেওয়াল চিত্রের সম্পর্ক সহজেই লক্ষ করা যায়। ভারতে শিল্পী গোষ্ঠীর বিভিন্ন অঞ্চলে যাতায়াত ছিল, তাই এই সংযোগ সম্ভব হয়েছে। শিল্প ঐতিহাসিক ও বিশেষজ্ঞরা মনে করেন পালযুগের ছোটো আকারের পুথিচিত্রগুলোর উৎস দেওয়াল চিত্র। ওই দেওয়ালচিত্রের অঙ্কনশৈলী ঘননিবন্ধ হয়ে পুথিচিত্রে এসেছে। পুথিচিত্রগুলো যাঁরা এঁকেছিলেন তাদের নাম পাওয়া যায় না, কিন্তু শিল্পীসংঘের অস্তিত্বের কথা জানা যায়, বীতপাল, ধীমান, রণক শূলপানি প্রমুখ শিল্পী (ভাস্কর?)-দের নাম পাওয়া যায়। বাংলায় মধ্যযুগে দেখা গেছে একই শিল্পী সম্প্রদায় টেরাকোটা কাঠের কাজ-পুথির চিত্র এবং ভাস্কর্য করতেন। এটি যদি ঐতিহ্য হয় সম্ভব যে বীতপাল-ধীমান ও চিত্রকর্ম করতেন । অজন্তা শৈলীর সঙ্গে প্রচলিত পূর্ব-ভারতীয় বা বঙ্গীয় শৈলীর মিশ্রণ ঘটেছে পালযুগের চিত্রকলায় ।

রাধাকৃষ্ণ, • মন্দির গাত্রচিত্র, ১৮ শতক, রাউলখণ্ড, বাঁকুড়া

 

বাংলায় চোদ্দো শতকে মন্দির বা বিহার সম্ভবত নির্মিত হয়নি। বৌদ্ধ শিল্পীরা নেপাল অঞ্চলে চলে গিয়েছিলেন বা শিল্পকর্ম ছেড়ে দিয়েছিলেন বলে অনুমান করা হয়। তবে পনেরো শতকেও (১৪৪৬, ১৪৫৫) বৌদ্ধ পুথিচিত্র পাওয়া গেছে বিহারের আরা থেকে, পূর্ববর্তী পালযুগের শৈলী থেকে যার খানিকটা রূপান্তর হয়েছে।

এই পালযুগের পুথিচিত্র শৈলী তার রেশ রেখে গেছে বাংলার বৈষ্ণব চিত্রকলায়। দেবপ্রসাদ ঘোষ ১৪৯৯ খ্রিস্টাব্দের একটি পুথির পাটায় অঙ্কিত দশাবতার চিত্রে পালযুগের শৈলীর ছায়া দেখিয়েছেন।

উত্তর কথা :

চৈতন্যদেবের সময়ে বাংলায় চিত্রকলা যে বহুল প্রচলিত ছিল তার বিবরণ বিভিন্ন চৈতন্যজীবনী সাহিত্য থেকে পাওয়া যায়। চৈতন্যদেব কানাই-এর নাটশালায় গিয়ে কৃষ্ণচিত্রলীলা (চৈতন্যচরিতামৃত) দেখেছিলেন। এতে অবশ্য পরিষ্কার নয় ওই কৃষ্ণলীলাচিত্রগুলো পট ছাড়াও কোনো দেওয়াল বা মন্দিরগাত্রের চিত্র কিনা। আরও বিবরণ পাওয়া যায় চৈতন্যদেবের জীবিতকালে রচিত ‘গৌরলীলামৃত’তে (কাননবিহারী গোস্বামী সম্পাদিত)। একদিন গৌরাঙ্গ ভক্তগণসহ শ্রীবাস মন্দিরে এসেছেন তখন সেখানে এক ভাস্কর এল এবং শ্রী গৌরাঙ্গকে ব্রজলীলার পট দেখাল’—

“এক চিত্রপট লই ভাস্কর ঠাকুর।

গৌরাঙ্গে দেখায়ে মেলি চিত্র সুমধুর ॥

গোদোহন যে যে স্থানো যে রূপমাধুরী।

পৃথক পৃথক সব আছে চিত্র করি ॥

তাহা দেখি গৌরচন্দ্র সুখে ভরি গেল।

নিত্যানন্দ করে ধরি নৃত্য আরম্ভিল “

এই বিবরণ থেকে আমরা কয়েকটি তথ্য পেতে পারি—১ নবদ্বীপ অঞ্চলে শিল্পীদের বাসস্থান ছিল বা তাদের যাতায়াত ছিল। ২. পৃথক পৃথক চিত্র দেখানো হয়েছে তা চৌকা পট হতে পারে। ৩. একজন ভাস্কর চিত্রপট নিয়ে এসেছিলেন।

সে সময় চিত্রকর বা মূর্তি নির্মাতাদের ভাস্কর উপাধি দেওয়া হতো। এরকম অনেকের নাম পাওয়া যাচ্ছে বৈষ্ণবগ্রন্থগুলোতে নয়ন ভাস্কর (১৬ শতক, হালিশহর), বংশীধর (খড়দা অঞ্চল), নবীনানন্দ আচার্য (১৬ শতক, দাঁইঘাটা) ।

মধ্যযুগে দেওয়ালচিত্র বা মন্দিরগাত্রচিত্র প্রচলিত ছিল, মঙ্গলকাব্য থেকে জানা যায়-

“আজ্ঞা পায়্যা আনন্দে অচ্যুত চিত্রকর।

চপল নির্মাণ করে চারিদ্বার ঘর ॥

উত্তর দুয়ারে লেখে কৃষ্ণ অবতার।

দান ছলে মনোভঙ্গ হইল রাধার

কোনখানে পুতনাবধ কেশীবধ কোথা।

কৃষ্ণ গেল মথুরায় কংসের বিতথা ॥

—মানিক গাঙ্গুলির ‘ধর্মমঙ্গল’, অষ্টাদশ শতক

এই বিবরণে মন্দির দেওয়ালচিত্রের বর্ণনা পাওয়া যায় এবং মন্দির গাত্রচিত্র অঙ্কন বঙ্গে প্রচলিত ছিল।

মন্দির কথা

পশ্চিমবঙ্গে যে তিনটি মন্দিরে গাত্রচিত্র অঙ্কিত দেখা গেছে সে তিনটি মন্দির আঠারো শতকের শেষ ভাগে ও উনিশ শতকের প্রথম তিন দশকের মধ্যে নির্মিত বা অঙ্কিত। তিনটির শৈলী তিনরকমের। এর মধ্যে হুগলি জেলার গুপ্তিপাড়ার বৃন্দাবনচন্দ্রের মন্দির বৈচিত্র্যময়। মন্দিরের নির্মাণকাল নিয়ে সুধীরচন্দ্র মিত্র এবং নৃসিংহপ্রসাদ ভট্টাচার্য এক মত নন।

নৃসিংহপ্রসাদ ভট্টাচার্যের মতে, নবকলেবর মন্দিরটি ‘আ. ১৮০৭ খ্রিস্টাব্দে নির্মিত হয় এবং ১৮১১ খ্রিস্টাব্দে মন্দির শাস্ত্রানুযায়ী প্রতিষ্ঠিত হয়।’ তারাপদ সাঁতরার মতে, আঠারো শতকের শেষার্ধ্বে এই মন্দির নির্মিত হয়। বাগবাজারের গঙ্গানারায়ণ সরকার এই মন্দির নবনির্মাণে ব্যয়ভার গ্রহণ করেন। মন্দিরটির গর্ভগৃহ বর্গাকার চিত্রিত, প্রবেশ পথও চিত্রিত।

এই চিত্রগুলোতে তিনটি শৈলী দেখা যায়—১) লোকায়ত শৈলী, কিছু মানুষের চিত্র এই লোকায়ত শৈলীর, পটচিত্রের সঙ্গে যার সাদৃশ্য। ২) পাশাপাশি অবস্থান করছে মিশ্র মোগলরীতির নকশা, যার উৎপত্তি মুর্শিদাবাদে। এই নকশাগুলো পশ্চিমবঙ্গের আরও অনেক প্রাসাদে বা মন্দির গাত্রে দেখা যায়। প্রবেশপথের সিলিংও এইভাবে নকশা করা। ৩) রাজপুত শৈলীর সঙ্গে কোম্পানি স্কুল শৈলীর মিশ্রণ।

একটি কৃষ্ণলীলা চিত্রে দেখা যাচ্ছে ডিম্বাকৃতির বা ওভাল আকারের সমুদ্রসম জলাশয় তাতে নৌকা ভাসছে। ওই চিত্রেই মেঘের চিত্র অনেকটা কোম্পানি শৈলীর, ডাচ বা ফ্রোমিস শৈলীর। এই ওভাল শেপ ও ফ্রেমিস মেঘ অঙ্কন রীতি ইউরোপ থেকে আগত শিল্পীদের কাছ থেকে দেশি শিল্পীরা আয়ত্ত করেন। কৃষ্ণলীলার কৃষ্ণ ও সখীগণসহ রাধার চিত্র অনেকটা রাজপুত মিনিয়েচার ধরনের। রাজস্থানি চিত্রকররা বিষ্ণুপুর ও মুর্শিদাবাদে আগেই এসেছিলেন এবং বেশ কিছু পুথির পাটায় রাজপুত শৈলী বা মিশ্র রাজপুত শৈলী দেখা যায়। মুর্শিদাবাদে প্রাপ্ত একটি চৌকাপট চিত্রে শিল্পীর পূর্বনিবাস জয়পুর লিখিত আছে।

আবার বর্গাকার ক্ষেত্রগুলোতে কিছু পাখি, বৃক্ষ, ফল ও ঘোড়ার চিত্রগুলো কোম্পানি শৈলী মিশ্রিত। আশ্চর্যের বিষয় একই প্যানেলে, দেওয়ালে পাশাপাশি লোকশিল্প ও কোম্পানি স্কুল প্রভাবিত শিল্প দেখা যাচ্ছে। এগুলো একই শিল্পীর কাজ বলে মনে হয় না। এমন হতে পারে একটি শিল্পী গোষ্ঠীতে দু-তিন ধরনের শিল্পী ছিলেন। তাঁরা সমবেত ভাবে এই দেওয়াল চিত্রগুলো এঁকেছিলেন অথবা কিছু ছবি নষ্ট হওয়ার পর আরেক শিল্পীগোষ্ঠী এঁকেছিলেন। এখন অনেকগুলো বর্গাকার দেওয়ালচিত্র নষ্ট হয়ে গেছে, কিছু টিকে আছে। মন্দিরের ওপরের প্যানেলের চিত্রগুলো জুম লেন্স ব্যবহার করেও পরিষ্কারভাবে আনা যায়নি।

 

 

একই মন্দিরে লোকশিল্পী ও পেশাদার শিল্পীদের কাজের প্রভেদ চোখে পড়বে। পূর্বালোচিত কৃষ্ণলীলার চিত্রের রাধাকৃষ্ণের অবয়ব। এছাড়াও যে সরস্বতীর চিত্রটি রয়েছে এটিও লৌকিক শৈলীর বা রাজপুত শৈলীর নয়, মিশ্র কোম্পানি বা মিশ্র ডাচ শৈলী ততদিনে বাংলায় বহুল প্রচারিত হয়েছে।

দেওয়ালচিত্রগুলো অঙ্কিত হয়েছে দেশি পদ্ধতিতে প্রস্তুত ভূমির ওপরে একটা আস্তরন দিয়ে এবং দেশি আঠা ব্যবহার করা হয়েছে। কোনোভাবেই ইতালীয় ফ্রেসকোরীতির আঙ্গিকে রং ব্যবহার বা গ্রাউন্ড কোটিং করা হয়নি। এই পদ্ধতির দেওয়ালচিত্র বাংলায় খুব প্রচলিত ছিল ।

আটাচাল বা আট বাংলা এই মন্দিরের চিত্রগুলো অঙ্কিত হয়েছে ম্যানেজার রাজেন্দ্র রায়ের মঠ প্রশাসন কালে বলে নৃসিংহপ্রসাদ ভট্টাচার্য জানিয়েছেন। শিল্পীরা স্থানীয় বা কলকাতা বা হুগলি-চুঁচুড়া বা মুর্শিদাবাদ থেকে এসেছিলেন এ তথ্য জানা যায় না। নব নির্মিত মন্দিরের পৃষ্ঠপোষক কলকাতার আবার কাছেই চুঁচুড়া-চন্দননগর বা অল্প দূরের মুর্শিদাবাদ ওল্ড বেঙ্গল স্কুলের শিল্পীদের বাসস্থান। অথবা এঁরা স্থানীয় সূত্রধর শিল্পী ছিলেন, যে সূত্রধর শিল্পীরা চিত্রকলা-ভাস্কর্যে বাংলা ঐতিহ্যে বিশিষ্ট শিল্পরীতি যোগ করেছিলেন।

মঠের অধীন গুপ্তিপাড়ার রথও চিত্রিত ও খোদিত। তবে সেই চিত্র ও খোদাই কর্মের সঙ্গে মন্দির গাত্রচিত্রের সাদৃশ্য প্রায় নেই, বিশেষ করে যেখানে ওভাল আকার ব্যবহার করা হয়েছে বা মিশ্র মোগল শৈলীর নকশা আঁকা হয়েছে। তারাপদ সাঁতরার মতে গুপ্তিপাড়ার রথ সূত্রধর শিল্পীদের সৃষ্টি। বাংলার বিভিন্ন অঞ্চলের কাঠের রথ মূলত সূত্রধর শিল্পীদের তৈরি এবং অনেকগুলো রথ নানাভাবে চিত্রিত, বিশেষ করে রাধাকৃষ্ণ, জগন্নাথ বলরাম, দুর্গা ইত্যাদি দুশো বা তার কিছু বেশি বছরের রণচিত্র এখন কয়েকটি সংগ্রহশালায় সংরক্ষিত এবং এর সঙ্গে পাটাচিত্রের সাদৃশ্য লক্ষণীয়।

হুগলি জেলারই আরেকটি মন্দির মহানাদের ব্রহ্মময়ী মন্দির, এটি নবরত্ন মন্দির। এটির প্রতিষ্ঠাতা কৃষ্ণচন্দ্র নিয়োগী, ১৮২৯ খ্রিস্টাব্দে প্রতিষ্ঠিত। সুধীরকুমার মিত্র তাঁর ‘হুগলি জেলার দেব দেউল’ গ্রন্থে জানাচ্ছেন ১৩০৩ বঙ্গাব্দে ভূমিকম্পে মন্দিরের অনেক চিত্র নষ্ট হয়ে যায়। মন্দিরগাত্রচিত্র আরও অনেক যে ছিল তা দেওয়ালগাত্র থেকে বোঝা যায় ।

বাংলা মন্দিরগাত্র চিত্রের খুব বেশি আর অবশিষ্ট নেই, দুটি চিত্র থাকলেও বাংলার চিত্রকলার ইতিহাসে এর গুরুত্ব তাই থেকে যায় । গুপ্তিপাড়া বৃন্দাবনচন্দ্র মন্দিরগাত্রচিত্রগুলোর মধ্যে একটি কৃষ্ণ যশোদা, এটির অঙ্কনরীতি দেশি শৈলীর এবং তার সমকালীন কালীঘাট শৈলীর সঙ্গে সাদৃশ্য রয়েছে। রং অনেকটা নষ্ট হয়ে গেলেও রেখার সাবলীলতা বোঝা যায় এবং কালীঘাট শৈলী যে একটা দেশীয় ঐতিহ্য থেকে উঠে এসেছিল এটা প্রমাণিত হয়, একই কথা প্রমাণিত হয় চব্বিশ পরগণার বহুডুর দেওয়ালচিত্র, বিশেষ করে ষড়ভুজ চৈতন্য চিত্রটি দেখে।

এই মন্দিরের অপর চিত্রটি হালকা-নীল রঙের ওপর নৃত্যরত গৌরনিতাই, একই বাংলা শৈলীর। ভোলানাথ ভট্টাচার্য যাকে বাংলা কলম বলেছেন—এ ঠিক সেই শৈলীর।

মহানাদ একটি প্রাচীন প্রত্নতাত্ত্বিক ক্ষেত্র। গুপ্তযুগ থেকে পাল-সেন যুগ পর্যন্ত প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন এই অঞ্চলে পাওয়া গেছে। ব্রহ্মময়ীর মন্দিরটিও উল্লেখযোগ্য, কথিত আছে দক্ষিণেশ্বর মন্দির নির্মাণের আগে রানি রাসমণি এই মন্দির দেখতে আসেন এবং দক্ষিণেশ্বর মন্দির ব্রহ্মময়ী মন্দিরের আদলেই তৈরি।

সবচেয়ে আলোচিত গাত্রচিত্র সমন্বিত মন্দির বহুডু (১২৩২ বঙ্গাব্দের, কয়েক বছর আগে প্রতিষ্ঠিত ১৮২২-২৩?) চিত্রকর দুর্গারাম ভাস্কর। আরেকটি মন্দির সম্ভবত বিংশ শতাব্দীর, কৃষ্ণনগরের চেতলানীয়া মন্দির, রাজস্থান থেকে শিল্পীরা এসে এখানে দেওয়ালচিত্র এঁকেছিলেন। এগুলো নিয়ে আমরা পরবর্তীকালে পৃথক আলোচনা প্রকাশ করব।

কালিদাস দত্ত (প্রবাসী, চৈত্র ১৩৩৯) মন্দির গাত্রচিত্র সম্পর্কে জানাচ্ছেন, ‘এই চিত্রগুলো বেশি পুরাতন না হইলেও বাংলাদেশের প্রাচীর ভিত্তি চিত্রাঙ্কন প্রথার সহিত এক্ষনে আমাদের পরিচিত হইবার প্রধান অবলম্বন। কিন্তু দুঃখের বিষয় কেবলমাত্র বাঁকুড়া জেলা ব্যতীত এ-প্রদেশের অন্য কোনো অংশের এই প্রকার চিত্রের বিবরণ ও প্রতিলিপি এ পর্যন্ত প্রকাশিত হয়নি।’ বাঁকুড়া জেলার মন্দির গাত্রচিত্র (টেরাকোটা নয়) নিয়ে কোনো নিবন্ধ আমরা এখনও সংগ্রহ করতে পারিনি। তবে কয়েকটি মন্দিরে ফ্রেসকোর মতো কাজ আছে যেমন সোনামুখীর শ্রীধর জীউ মন্দির (সূত্র প্রদীপ কর, টেরাকোটা ২-১ ২০১১)। বাঁকুড়ার রাউতখন্ড গ্রামে একটি প্রায় ভেঙে পড়া মন্দিরে কয়েকটি দেওয়ালচিত্র। এই অঙ্কন শৈলী বাঁকুড়া জেলার পুথি পাটাচিত্রের শৈলী এবং উৎকৃষ্ট।

মন্দির গাত্রচিত্র শিল্পীরা জানতেন এগুলোর সংরক্ষণের উপায়, কালিদাস দত্ত জানাচ্ছেন বহড়ুতে একটি খাতা ছিল তাতে কীভাবে ছবিগুলো পরিষ্কার রাখতে হবে সে বিবরণ ছিল। শান্তিনিকেতনে নন্দলাল বসু, বিনোদবিহারী মুখোপাধ্যায়, শিল্পীদের উদ্যোগে ভিত্তিত্রি নিয়ে পরীক্ষা নিরীক্ষা হয়েছিল। শেষ পর্যন্ত রাজস্থান থেকে ভিত্তিচিত্র বিশেষজ্ঞ এসে কাজ শিখিয়েছিলেন। নন্দনাল-বিনোদবিহারী কি বাংলা ভিত্তিচিত্রকারদের সন্ধান পাননি? না বিংশ শতাব্দীর তৃতীয়-চতুর্থ দশকে তাঁরা নিশ্চিহ্ন হয়ে গিয়েছিলেন?

চিত্রকর চঞ্চল মুখোপাধ্যায় তাঁর তোলা আলোকচিত্রগুলো ব্যবহারের অনুমতি দিয়েছেন এবং চিত্রকর সংরক্ষক উদ্ধৃতি দাস ছবিগুলো ফোটোশপে খানিকটা উন্নত করেছেন, কতজ্ঞতা জানাই তাদের। কৃতজ্ঞ শিল্প-ঐতিহাসিক ড টি কে বিশ্বাসের কাছে প্তিপাড়ার মন্দির গাত্রচিত্র নিয়ে অনেক সংশয় তিনি দূর করে দিয়েছেন।

আরও দেখুনঃ

Exit mobile version