আজকে আমরা বাংলার চিত্রকলা পরিশিষ্ট সম্পর্কে আলোচনা করবো। যা বাংলার চিত্রকলা ( মধ্যযুগ থেকে কালীঘাট) এর অন্তর্গত।
বাংলার চিত্রকলা পরিশিষ্ট
১. আর্চার আঠারো শতকে বাংলায় মাত্র ৩ রকমের চিত্রকলার কথা বলেছেন-
(ক) বেনারস, মুর্শিদাবাদ ও লক্ষ্ণৌতে প্রচলিত চিত্রকলা।
(খ) ব্রিটিশ চিত্রকর পেশাদার ও অপেশাদার চিত্রকর এবং তাঁদের উৎসাহে পাটনা থেকে কলকাতায় চলে আসা মিনিয়েচার শিল্পীরা, যাঁরা ব্রিটিশদের উৎসাহে ‘ন্যাচারাল পেইন্টিং’ করতেন বা পশ্চিমের চিত্রকলার অনুসারী কাজ করতেন, নানা বিষয় ছবিতে ‘ডকুমেন্ট’ করতেন।
(গ) পটুয়া সম্প্রদায়।
আমরা প্রাক-কথায় আরো ৭ প্রকারের চিত্রকলা বা আঠারো শতকের বাংলায় প্রচলিত উল্লেখ করেছি তা আর্চারের চোখে পড়েনি। চৌকাপটের বিভিন্ন প্রচলিত প্রকার, যেগুলো তিনি দেখেননি, ফলত কালীঘাট পট সম্পর্কে তাঁর আলোচনা অনেকটাই একপেশে ও অসম্পূর্ণ। তিনি তাঁর আলোচনায় ওপরের তিনটি ধারার ভিত্তিকেই কালীঘাটের পটের উৎস মনে করেছেন।
২. অনেকেই চীনা সাদা কালো চিত্রের সঙ্গে কালীঘাটের সাদৃশ্য দেখেছেন, আসলে কালীঘাটের চিত্র রেখাভিত্তিক আর চীনা চিত্র স্ট্রোকভিত্তিক (সূত্রটি শিল্পী অমিতাভ ভট্টাচার্য জানিয়েছেন এবং ছবি এঁকে বিশ্লেষণও করেছেন।
৩. কালীঘাটের চিত্রে শেডিং আছে তা করা হয় ডৌলতা বা ‘রিলিফ’ দেখানোর জন্য, আলোছায়ার জন্য নয়। ব্রিটিশ ন্যাচারাল পেইন্টিং এর প্রভাব দেখাতে গিয়ে কেউ কেউ লিখেছেন পটভূমি বা Background সাদাটা ঐ প্রভাবপ্রসূত। ড. ব্রতীন্দ্রনাথ মুখোাধ্যায় দেখিয়েছেন কত আগে থেকেই পুথিচিত্রে ঐ সাদা Blank Background ছিল, যেমন সাতের শতকের ‘মহাভাগবতপুরাণ’, আঠারো শতকের ‘রামরিতমানস’। আমরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সংরক্ষিত ‘পদ্মপুরাণ’ এর চিত্রিত পুথি এবং ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়ালে সংরক্ষিত ‘গীতগোবিন্দ’ এর পুথিতেও Blank Background দেখেছি ।
8. বাংলায় সব রকমের চিত্রশিল্পীদেরই পটুয়া বলা হতো, কিন্তু পটুয়াদের মধ্যে বিভিন্ন সম্প্রদায় আছে। পটুয়া বলে একটি জাতি বা সম্প্রদায় আছে যারা কুম্ভকার বা সূত্রধর বা সদগোপ সম্প্রদায়ের থেকে আলাদা জনগোষ্ঠী। এই জাত পটুয়ারা ধর্মে মুসলমান কিন্তু পৌরণিক দেবদেবী আঁকেন, আচার আচরণও মিশ্র। এই পটুয়া জাতির বাংলায় দীর্ঘকালের পট আঁকার ঐতিহ্য আছে, গান গেয়ে একটা লম্বা গোটানো কাপড়ের ওপর আঁটানো কাগজে অনেকগুলো ফ্রেমে এক একটি পৌরাণিক বা মহাপুরুষদের আখ্যান এঁরা গান গেয়ে দেখিয়ে থাকেন। কালীঘাটের পট এই সম্প্রদায়ের শিল্পীরা শুরু করেননি, পরে এসেছেন।
এই দুই শিল্পী সম্প্রদায়ের শিল্পশৈলীর পার্থক্য পরিষ্কারভাবেই দেখা যায়—
(ক) জাত পটুয়াদের পট দীর্ঘ, কালীঘাটের পট দীর্ঘ নয় তাতে একটির পর একটি দৃশ্য এঁকে আখ্যানের বর্ণনাও করা হয় না।
(খ) পটগান পটুয়াদের পটের একটি অঙ্গ অর্থাৎ গান গেয়ে পট দেখাতে হবে, কালীঘাটের পটে তার প্রয়োজন হয় না।
(গ) কালীঘাটের পটে দ্বিমাত্রিক রেখার টানে শুধু চিত্রটিকে আঁকা হয়, পটুয়া পটে নানান প্রাকৃতিক দৃশ্য দিয়ে রঙ দিয়ে Background ভরিয়ে তোলা হয় ।
(ঘ) কালীঘাটের পটে রঙের ব্যবহার সীমিত, পটুয়াটের পটে বহুবর্ণের প্রয়োগ।
(ঙ) “কালীঘাটের পটে বর্তুলাকার দ্বিমাত্রিক রেখার টান পটটিকে জীবন্ত করে। দীঘল পটে এই রেখার টান আছে কিন্তু বিভিন্ন রঙের বিন্যাসে ভিন্ন ব্যঞ্জনায় সে এক ভিন্ন বস্তু।” (কৃতজ্ঞতা, চিত্তরঞ্জন মাইতি)
(চ) কালীঘাটের পটে বর্ণ ও আয়তন চওড়া করা হয় প্রতিমা তৈরির মোটা তুলি দিয়ে, আলতাটুলি বা তুলো দিয়েও ছবি আঁকা হতো। শেষ পর্যায়ে বিলাতি তুলিরও ব্যবহার হয়েছে।
(ছ) কালীঘাটের পট প্রচলিত হওয়ার ঠিক পরেই উত্তর কলকাতায় চালু হলো ধাতু খোদাই, কাঠ খোদাই, গ্রন্থচিত্রণ যেখানে বাঙালি মানসের আর এক উৎকৃষ্ট সৃষ্টির সূচনা দেখা যায় ।
আরও দেখুনঃ

