আজকের আলোচনার বিষয়ঃ দেশভাগ এবং অতঃপর। এটি শিল্পী জয়নুল আবেদিন এর জীবনী গ্রন্থমালার অন্তর্গত।জয়নুল আবেদিন বিংশ শতাব্দীর একজন বিখ্যাত বাঙালি চিত্রশিল্পী। পূর্ববঙ্গে তথা বাংলাদেশে চিত্রশিল্প বিষয়ক শিক্ষার প্রসারে আমৃত্যু প্রচেষ্টার জন্য তিনি শিল্পাচার্য উপাধি লাভ করেন।

দেশভাগ এবং অতঃপর। শিল্পী জয়নুল আবেদিন
বলা যায়, দেশবিভাগের আগেই জয়নুল আবেদিন ভারতীয় উপমহাদেশের অন্যতম শিল্পী হিসেবে তার অবস্থান সুদৃঢ় করে নিতে পেরেছিলেন । এবং আস্ত র্জাতিক পরিসরেও কমবেশি তার সুনাম ছড়িয়ে পড়েছিল । দেশ-বিদেশে তার ছবি প্রদর্শিত হচ্ছিল । এবং বোদ্ধাদের প্রশংসা অর্জন করেছিলেন ।
১৯৪৬ সালের নভেম্বর-ডিসেম্বর মাসে প্যারিসে অনুষ্ঠিত হয় আন্তর্জাতিক আধুনিক শিল্প প্রদর্শনী। আয়োজক ছিল ইউনেস্কো। এই প্রদর্শনীতে শিল্পী জয়নুল আবেদিনের ছবিও স্থান পায়। পরের বছর ১৯৪৭-এর মার্চে দিল্লিতে অনুষ্ঠিত আন্তঃএশীয় শিল্প প্রদর্শনীতে জয়নুল অংশ নেন । এতে তিনি পুরস্কৃতও হন । ‘শাল বৃক্ষরাজির মধ্য দিয়ে’ চিত্রের জন্য তিনি দ্বিতীয় পুরস্কার পান । এই প্রদর্শনীর উদ্যোক্তা ছিল অল-ইন্ডিয়া ফাইন আর্টস অ্যান্ড ক্রাফটস সোসাইটি । একই বছরে লন্ডনের বার্লিংটন হাউসে সমকালীন আধুনিক ভারতীয় শিল্পীদের যে প্রদর্শনী হয় তাতে জয়নুল আবেদিনের আঁকা ছবি প্রদর্শিত হয় ।
১৯৪৭-৪৮ সালে লন্ডনের একাডেমি অব ফাইন আর্টস-এ ভারত-পাকিস্তানের শিল্প প্রদর্শনী হয় । উপলক্ষ ছিল ভারতবর্ষে ব্রিটিশ শাসনের অবসান । এতে খ্রিস্টপূর্ব ২৪০০ সাল থেকে ১৯৪৭ সাল পর্যন্ত এতদঞ্চলের শিল্পের নমুনা উপস্থাপিত হয় । এই প্রদর্শনীতেও জয়নুলের ছবি স্থান পায়। এখানে জয়নুলের দুর্ভিক্ষের চিত্রমালার একটি চিত্র প্রদর্শিত হয় । পরের বছর অর্থাৎ ১৯৪৮ সালে সিঙ্গাপুরে অনুষ্ঠিত বেঙ্গল ড্রয়িং ও পেইন্টিং প্রদর্শনীতে জয়নুলের ছবি স্থান পায় ।

এভাবে আমরা দেখি, বিভাগপূর্ব সময়ে প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ চিত্রপ্রদর্শনীতে জয়নুলের ছবি অনিবার্যরূপেই স্থান পায় । এতে আমরা জয়নুলের পূর্ণতা ও স্বীকৃতির একটি মান অনুভব করতে পারি । জয়নুল আবেদিন তখন ভারতীয় উপমহাদেশের অগ্রগণ্য শিল্পীদের মধ্যে অন্যতম হয়ে ওঠেন ।
১৯৪৭-এর দেশবিভাগের নিকট সময়ে ভারতবর্ষ জুড়ে চলছিল রাজনৈতিক উত্তেজনা। হিন্দু-মুসলিম সম্পর্কের মধ্যে ফারাক ধরেছিল সুস্পষ্টভাবে এই
ফারাক থেকে উত্তৰ হয়েছিল হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গা। এই দাঙ্গা ছড়িয়ে পড়েছিল সবখানে। তৎকালীন বাংলা প্রদেশও দাঙ্গায় আক্রান্ত হয়েছিল। কলকাতা শহরে দাঙ্গা বীভৎস রূপ ধারণ করে চলছিল বাড়িঘরে অগ্নিসংযোগ, খুন-রাহাজানি, নানাবিধ উচ্ছৃঙ্খলতা। ১৯৪৩-এর দুর্ভিক্ষের ভয়াবহতার পর এ ছিল এক বড় ধরনের মানবিক বিপর্যয়।
যাপিত জীবনের নানা ঝঞ্ঝার মধ্য দিয়ে জয়নুলের এগিয়ে চলা। পথচলায় সব বাধাকেই তিনি আয়াসসাধ্য করে নিয়েছিলেন। বিরূপ সব পরিস্থিতিতেই তিনি নিজেকে মানিয়ে নিতে পারতেন। জয়নুল আবেদিনের বিয়ের কথাই ভাবা যাক। কলকাতা শহর তখন দাঙ্গাবিক্ষুব্ধ। খুন, রাহাজানি আর আগুনের নষ্টখেলা। এরই মধ্যে জয়নুল চলছেন বিয়ে করতে। বিচ্ছেদের পরিস্থিতিতে মিলনের আয়োজন করলেন।
১৯৪৬ সালের ৮ অক্টোবর তিনি বিয়ে করেন । পাত্রী ঢাকাবাসী তৈয়বউদ্দিন আহমেদের তৃতীয় কন্যা জাহানারা আহমেদ । বিয়ের ঘটকালি করেছিলেন সাংবাদিক সাহিত্যিক আবু জাফর শামসুদ্দিন। এরই মধ্যে চাকরি জীবনের আট বছর অতিক্রম করেছেন। বিয়ের অনুষ্ঠানাদি ঢাকায় সম্পন্ন হয় । ওই বছরের ২৬ ডিসেম্বর ঢাকায় এক অনুষ্ঠান শেষে পরের দিন নববধূকে নিয়ে জয়নুল আবেদিন ময়মনসিংহ গমন করেন । জয়নুল বহু চিন্ত গাভাবনার পর এ বিয়ে করেন। তিনি এমন একজন সহধর্মিণী চেয়েছিলেন, আজীবন যিনি তার প্রেরণার উৎস হবেন ।

তাকে মানুষ, সমাজ ও দেশ-জাতির প্রতি দায়বদ্ধতা থেকে বিচ্যুত করবেন না । জয়নুল তা পেয়েছিলেন। জয়নুলের এই বিয়েতে বোদ্ধা মহলের শুভার্থীগণ আনন্দে উদ্বেলিত হয়েছিলেন। জয়নুল যখন ঢাকায় শ্বশুরালয়ে বধূবরণে নিয়োজিত তখন কলকাতায় তার গুণগ্রাহী ও বিষজনেরা তাকে অভিনন্দিত করে প্রকাশ করলো একটি পুস্তিকা। এর উদ্যোক্তা ছিলেন কবি আহসান হাবীব, মোহাম্মদ নাসির আলি। এতে নবদম্পতিকে শুভেচ্ছা জানিয়ে আঠারো জনের পদ্য ও দুজনের গদ্য ছাপানো হয়।
লেখক তালিকায় ছিলেন গোলাম কুদ্দুস, সৈয়দ আলী আহসান, সুফিয়া কামাল, বেনজীর আহমেদ, আবদুল কাদির, শওকত ওসমান, মণীন্দ্রভূষণ গুপ্ত, ফররুখ আহমদ, জ্যোতিরিন্দ্র মৈত্র প্রমুখ । তৎকালীন সৃজনসমাজের এরূপ সরব উপস্থিতি থেকে আমরা সহজেই জয়নুল আবেদিনের অবস্থানটি আঁচ করতে পারি । বুঝতে পারি দেশবিভাগের আগেই তিনি উপমহাদেশে বিশিষ্ট ব্যক্তিতে পরিণত হয়েছিলেন।
১৯৪৭ সালে ভারতবর্ষ ভাগ হলো। ধর্মীয় সংখ্যাধিক্যকে সামনে রেখে বিভাজিত হলো হিন্দু অধ্যুষিত ভারত ও মুসলিম অধ্যুষিত পাকিস্তান । এই অঞ্চলের মানুষ ঔপনিবেশিক শাসন থেকে মুক্তি পেল । তবে মুক্তির প্রারম্ভিক সময়টা ছিল কলঙ্কের ও হতাশার। হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গায় হাজার হাজার মানুষ নিহত হলো । বাস্তুহারা হলো অনেক মানুষ, তেমনি স্থানচ্যুত হলো উভয় অংশের মানুষ । এমনই রক্তাক্ত অভিজ্ঞতার মাধ্যমে পেলাম আমরা স্বাধীনতা। পাকিস্তান নামক রাষ্ট্রটি দুটো অংশে বিভক্ত ছিল। মাঝখানে ছিল বারো শত মাইলের ব্যবধান। অবিভক্ত বাংলার পূর্বাঞ্চল অর্থাৎ মুসলিম অধ্যুষিত পূর্ব বাংলা হলো পূর্ব পাকিস্তান।
দেশভাগের দুর্বিষহ ও ভয়াবহ পরিস্থিতির মধ্যে জয়নুল আবেদিন কলকাতা ছেড়ে ঢাকায় চলে এলেন। শুধু তিনি নন আরো কিছু গুণী ব্যক্তি চলে আসেন । কলকাতা আর্ট স্কুলে তখন বাঙালি মুসলিম শিক্ষক ছিলেন তিনজন—জয়নুল আবেদিন, আনোয়ারুল হক ও শফিউদ্দিন আহমেদ। এরা সবাই চলে এলেন ঢাকায়। এদের সঙ্গে আরো এলেন মুসলিম শিল্পী ও বোদ্ধাগণ খাজা শাফিক আহমেদ, আলি আহসান, শফিকুল আমীন, মোহাম্মদ কিবরিয়া, হাবিবুর রহমান প্রমুখ।

এরা ঢাকা ও চট্টগ্রামের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যোগ দিলেন। জয়নুল যোগ নিলেন ঢাকার নরমাল টিচার্স ট্রেনিং স্কুলে। এখানে প্রাইমারি শিক্ষকদের ট্রেনিং দেয়া হতো। জয়নুল সেখানে ড্রয়িং শেখাতেন। অন্যান্যের মধ্যে সফিউদ্দিন আহমেদ যোগ দেন ঢাকা কলেজিয়েট স্কুলে, শফিকুল আমিন আরমানিটোলা স্কুল, আনোয়ারুল হক চট্টগ্রাম নর্মাল স্কুলে। আলী আহসান এবং হাবিবুর রহমান যোগ
দেন তৎকালীন আহসানউল্লাহ ইঞ্জিনিয়ারিং স্কুলে। তখন পূর্ববঙ্গে শিল্পচর্চার বড় কোনো প্রতিষ্ঠান ছিল না। আবার এতো শিল্পী কাজ করতে পারেন এমন কোনো ব্যবস্থাও ছিল না। তাই শিল্পীরা ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়লেন জীবিকার টানে।
জয়নুল আবেদিন পূর্ববঙ্গের মানুষের সৃজনশীল মানসিকতার উৎক সাধনের নিমিত্তে একটি শিল্পচর্চা কেন্দ্রের প্রয়োজন তীব্রভাবে অনুভব করলেন । শিল্পচর্চা শেখানোর মতো লোকবল তো আশেপাশেই ছিল। দরকার ছিল শুধু রাষ্ট্রযন্ত্রের কর্তাব্যক্তিদের এর গুরুত্ব বোঝানো।
কলকাতা অবস্থানকালেই সহশিল্পীদের সঙ্গে এরূপ একটি শিল্প প্রতিষ্ঠান নিয়ে আলোচনা হয়েছিল। অর্থাৎ প্রাথমিক উদযোগটি তারা আগেই সম্পন্ন করে রেখেছিলেন । এখন শুধু পরিকল্পনা তৈরি ও বাস্তবায়নের তোড়জোড়ের পালা। কাজে নেমে বুঝতে পারলেন জটিল ও দীর্ঘযাত্রার এক মহাঅভিযানে তিনি নেমেছেন। কিন্তু স্বভাবজাত অনমনীয়তায় জয়নুল আবেদিন এগিয়ে গেলেন।
আরও দেখুনঃ
