দুর্ভিক্ষ চিত্রমালা । শিল্পী জয়নুল আবেদিন

আজকে আমাদের আলোচনার বিষয়ঃ দুর্ভিক্ষ চিত্রমালা। এটি শিল্পী জয়নুল আবেদিন এর জীবনী গ্রন্থমালার অন্তর্গত।জয়নুল আবেদিন  বিংশ শতাব্দীর একজন বিখ্যাত বাঙালি চিত্রশিল্পী। পূর্ববঙ্গে তথা বাংলাদেশে চিত্রশিল্প বিষয়ক শিক্ষার প্রসারে আমৃত্যু প্রচেষ্টার জন্য তিনি শিল্পাচার্য উপাধি লাভ করেন।

 

দুর্ভিক্ষ চিত্রমালা । শিল্পী জয়নুল আবেদিন

 

দুর্ভিক্ষ চিত্রমালা । শিল্পী জয়নুল আবেদিন

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ সারাবিশ্বকে বিপর্যয়ে ফেলে দেয় । এর আওতা থেকে আমরা মুক্ত ছিলাম না। বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয় ১৯৩৯ সালে। চলেছে কয়েক বছর। বলা যায়, এই অঞ্চলের মানুষ ছিল এ যুদ্ধের নির্দোষ ভুক্তভোগী। ভারতবর্ষ তখন ব্রিটিশ উপনিবেশের করতলগত। আর ব্রিটিশরা ছিল এ যুদ্ধে মিত্রশক্তির নেতৃত্বদানকারী একটি দেশ। ফলে অক্ষশক্তির বিভিন্ন হুমকির মধ্যে পড়তে হয়। শুধু কি যুদ্ধের হুমকি, মানবিক চাহিদার অনেক কিছুও হুমকিতে পড়ে । এর মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য ছিল খাদ্য নিরাপত্তা।

সৈন্যদের চাহিদা মেটাতে কর্তৃপক্ষের খাদ্যশস্যের মজুদ, আর খাদ্য সরবরাহের অভাবে দেশব্যাপী আকাল পরিলক্ষিত হয় । খাদ্য নেই, খাদ্য নেই—মাতম ওঠে। মানুষ হন্যে হয়ে খাদ্য খোঁজে। অথচ শাসকরা বাংলার খাদ্য গুদাম খালি করে সব খাদ্য উত্তর প্রদেশে জমা রাখলো। ব্যবস্থাপনার দুর্বলতায় সেই খাদ্য নষ্ট হয়ে গেল । আর খাদ্যের অভাবে বাংলায় তখন ভুখা মিছিলের হায় হায় রব ।

ঔপনিবেশিক শাসক নিজেদের স্বার্থে খাদ্য গুদামজাত করলো। ভাবলো না সাধারণ মানুষের কথা। অথচ বাংলাদেশ হলো শস্য উৎপাদনের ঘাঁটি। অবশ্য ঔপনিবেশিক ব্রিটিশ সরকারের কাছে কিছু চাওয়াও নিষ্ফল। উপনিবেশবাদের স্বভাবই এ রকম । ব্রিটিশ উপনিবেশ স্থাপনকারীরা কখনো এ দেশের সাধারণ মানুষের কথা ভাবেনি । তারা নিজেদের স্বার্থকেই বড় করে দেখেছিল । বাংলার খাদ্য মজুদ রেখে কোটি বাঙালিকে ভুখা রাখার ব্যবস্থা তারা করেছিল। বাংলায় প্রচণ্ড খাদ্য সংকট দেখা যায়।

 

দুর্ভিক্ষ চিত্রমালা । শিল্পী জয়নুল আবেদিন

 

এর ফলে ১৯৪৩ খ্রিস্টাব্দ, বাংলায় ১৩৫০ সালে সারা বাংলায় ব্যাপক হারে দুর্ভিক্ষ দেখা যায় । এটা তেতাল্লিশের মন্বন্তর নামে বহুল পরিচিত । গ্রামবাংলায় খাবারের হাহাকার, কোথাও খাদ্য নেই। টাকা থাকলেও চাল কেনা যাচ্ছে না, কারণ বাজারে চালের সরবরাহ নেই। মানুষই বরং কাক, শকুন ও কুকুরের খাদ্য হচ্ছে । বেঁচে থাকার তাড়নায় মানুষ শহর পানে ছুটে চলে। সারা বাংলা থেকে অনাহারি মানুষ দলে দলে বাংলার রাজধানী কলকাতায় জড়ো হতে থাকে দুমুঠো খাবারের জন্য

এ সময় নিরন্ন মানুষের মিছিলে কলকাতা শহরের অলিগলিতে দিগ্বিদিক ঘুরতে থাকে । ক্ষুধার্ত মানুষ ডাস্টবিনের খাবার সংগ্রহে কাক ও কুকুরের সাথে প্রতিযোগিতা করে। কঙ্কালসার এসব মানুষের ক্ষুধার আর্তনাদে কলকাতা শহরের বাতাস ভারি হতে থাকে। সবখানে মুঠোখানেক খাবারের জন্য হাহাকার । মানুষের এসব হাহাকার-আর্তনাদ উদীয়মান শিল্পী জয়নুল আবেদিনের মনে গভীর রেখাপাত করে । মানুষের করুণ ও অনিশ্চিত মৃত্যু তাকে বিহ্বল করে। মানবতাবিরোধী যুদ্ধ ও উপনিবেশের বিরুদ্ধে তিনি ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন। একজন শিল্পী হিসেবে তিনি তার কৌশল কাজে লাগিয়ে এর প্রতিবাদ করলেন । রঙ-তুলির সেই প্রতিবাদ ছড়িয়ে পড়লো বিশ্বব্যাপী।

দিনভর রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে জয়নুল প্রচুর ছবি আঁকেন। ১৩৫০-এর দুর্ভিক্ষের ছবিগুলোর মধ্যে ছিল অসংখ্য স্কেচ। এ সময় তিনি ১৪ নং সার্কাস রোডে এক রুমের এক বাসায় থাকতেন। এখানে তিনি স্কেচগুলোর অনুকরণে কিছু চিত্র আঁকেন । এসব স্কেচ ও চিত্রমালা জয়নুলকে মহৎ শিল্পীদের কাতারে অভিষিক্ত করে। চিত্রের মাধ্যমে প্রতিবাদের ভাষা নির্মাণ করেন, যা সাধারণ ও বোদ্ধা- সব মানুষেরই মনে দাগ কাটে। উপরন্তু অঙ্কনশৈলীতেও পরিবর্তন আনেন । সবাই বিস্মিত ও বিহ্বল হয়ে পড়ে। আর অবাক বিস্ময়ে প্রত্যক্ষ করে শিল্পের নয়া ব্যাকরণ, যা প্রচলিত অভিজ্ঞতাসমূহের বাইরে নতুন কিছু যুক্ত করে।

এ অনারম্ভরপূর্ণ ছবিগুলোতে ছিল সাধারণ কিছু কথকতা। সব মানুষের চোখের সামনে ঘটে যাওয়া প্রতিদিনের কিছু দৃশ্যাবলী। এর মধ্যে থেকেই তিনি নতুন কিছু আবিষ্কার করেন। মানুষের বোধে জাগিয়ে তোলেন মানবসৃষ্ট বিভেদের করুণ কাহিনী । কি ছিল এসব চিত্রমালায়? কলকাতায় রাস্তাঘাটে দুর্ভিক্ষপীড়িত মানুষের খণ্ডিত চিত্রমালা।

 

দুর্ভিক্ষ চিত্রমালা । শিল্পী জয়নুল আবেদিন

 

খাদ্যের সন্ধানে নিরন্ন কঙ্কালসার মানুষের হন্যে হয়ে ঘুরে বেড়ানো, মৃতপ্রায় স্ত্রীর পাশে আর্তনাদরত স্বামী, ডাস্টবিনে উচ্ছিষ্ট খাবার নিয়ে মানুষ ও কাকের মধ্যে লড়াই, শূন্য খাবার পাত্র পাশে রেখে শিশু ও মায়ের ঘুপটি মেরে বসে থাকে, মৃত মানুষের দেহে কাকের ঠোকর, অখাদ্য কুখাদ্য খেয়ে বেঁচে থাকার প্রচেষ্টা— এরূপ ধরনের বাস্তব চিত্র। দুর্ভিক্ষকালীন কলকাতায় এসব অমানবিক দৃশ্য জয়নুলের তুলিতে প্রতিবাদের ঘূর্ণি তোলে, যা আলোড়ন তোলে বিবেকমান প্রতিটি মানুষের মনে ।

ছবি ছিল সরলসোজা কিন্তু প্রগাঢ় হৃদয়স্পর্শী বিষয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে স্কেচ করার উপকরণ জোগাড় করা হয়। কম দামি কাগজে রেখার সারল্য বজায় রেখে স্কেচসমূহ আঁকা হয়েছে। হলুদ রঙের সাধারণ কাগজ আর কালি ও কলমের স্বাচ্ছন্দ্যে রেখায়িত হয়েছে সময়। রেখার কারুকাজে যে ভঙ্গি তিনি এঁকেছিলেন তা ছিল শিল্পচর্চার অভিজ্ঞতায় নতুন সংযোজন । আগে কেউ ভাবতেই পারেনি এভাবে ছবি হয়। আর কিছু ছবি এঁকেছিলেন একটু মোটা হলদে কার্টিজ কাগজে, এতে তিনি তুলি হিসেবে ব্যবহার করেছিলেন তেলরঙের চ্যাপটা তুলি ।

রঙ হিসেবে সব সময়ই কালোই ছিল একমাত্র রঙ । এমন কিসিমের ক্যানভাসে তিনি রেখার যে সদম্ভ উপস্থাপনা করেছিলেন তা ছিল তুলনারহিত। এই ছবিগুলো প্রচলিত চিত্রধারায় শুধু ভান্তন ধরায়নি, এ থেকে যে আবহ ও আবেগ বিচ্ছুরিত হয়েছিল তা মানুষের মনে ভীষণ নাড়া দেয় ।

স্কেচগুলোর মোটা দাগের রেখায় ঝলকে উঠেছিল অমানবিকতার দলিল ঔপনিবেশিক শাসনের বীভৎস রূপ, স্বাধীনতাহীনতার গ-ানি, মানবিকতার চরম অবমূল্যায়ন, ধনী ও গরিবের পাহাড়সম বিভাজন, যুদ্ধের করুণ পরিণতি… সবকিছুরই যোগসূত্ররূপে আমরা পাই জয়নুলের স্কেচ ও চিত্রসমূহ।

 

দুর্ভিক্ষ চিত্রমালা । শিল্পী জয়নুল আবেদিন

 

সে সময় ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টি কলকাতার রাজপথে মানবিকতার এরূপ অবমাননার স্বরূপ উন্মোচনে একটি চিত্রপ্রদর্শনী আয়োজন করে। কলেজ স্ট্রিট মার্কেটের ইন্ডাস্ট্রিয়াল মার্কেটের পাশে এ প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হয়। এতে জয়নুলের মন্বন্তর আক্রান্ত কলকাতার রাজপথে আঁকা চিত্রাবলীর কিছু স্থান পায় । দর্শকরা অবাক বিস্ময়ে তা অবলোকন করে, শিল্পীকে উচ্চ প্রশংসা করে। শুধু দর্শকের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না এসব চিত্রমালা ।

কমিউনিস্ট পার্টির পত্রিকা পিপল’স ওয়র ও জনযুক্ত-র মাধ্যমে চিত্রগুলো ব্যাপক মানুষের কাছে পৌঁছে যায়। পত্রিকার পাতায় ছবিগুলোর প্রতিলিপি মানুষের মনে করুণ অনুভূতি তৈরি করে । একজন মানবতাবাদী শিল্পী হিসেবে জয়নুল আবেদিন পরিগণিত হতে থাকলেন । তার খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ল চারদিকে।

এরই মধ্যেই তিনি ভারতীয় প্রগতিশীল শিল্প-সাহিত্যিকদের সঙ্গে পরিচিত হতে থাকলেন। ফ্যাসিবাদবিরোধী কবি-সাহিত্যিক-শিল্পীরা তাকে কাছেরজন হিসেবে মেনে নিলেন। তিনি তাদের সঙ্গে শুধু মতবিনিময়ে লিপ্ত হলেন না, মান- “বিধ ক্রমে নিজেকে সক্রিয় করলেন। শিল্পীসমাজে তার সমাদর বাড়তে থাকল। আর জয়নুলের ১৪ সার্কাস রোডের বাসায় গুণীজনের ভিড় বাড়তে থাকল । কলকাতাকেন্দ্রিক বুদ্ধিজীবী ও সৃজনশিল্পীরা বিভিন্ন ইস্যুতে তার বাসায় জমায়েত হাতন । এসব জমায়েতে থাকতেন সাহিত্যিক গোপাল হালদার, কবি গোলাম কুদ্দুস, বিজন ভট্টাচার্য, শম্ভু মিত্র, মণিকুন্তলা সেন, সুকান্ত ভট্টাচার্য।

এরা সবাই ফ্যাসিবাদবিরোধী লেখক ও শিল্পী সংঘ এবং গণনাট্য সংঘের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। এদের বাইরেও বিভিন্ন স্তরের শিল্পী ও বোদ্ধাদের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠতা জমে উঠেছিল। যেমন শিল্পবোদ্ধা শাহেদ সোহরাওয়ার্দী, কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায়, পল্লীকবি জসিম উদদীন, কবি গোলাম মোস্তফা, সাহিত্যিক আবুল মনসুর আহমদ, কথাসাহিত্যিক শওকত ওসমান, কবি ফররুখ আহমদ মোহাম্মদ মোদাব্বের, শিল্পী আব্বাসউদ্দিন, সওগাত সম্পাদক মোহাম্মদ নাসিরউদ্দিন, কবি সুফিয়া কামাল। ঘনিষ্ঠজনদের মধ্যে ছিলেন অনিল ভট্টাচার্য, সত্যেন ঘোষাল, দিলীপ দাশগুপ্ত, রাজেন তরফদার, রথীন মৈত্র, আনোয়ারুল হক, শফিউদ্দিন আহমেদ, সোমনাথ হোড়, কামরুল হাসান প্রমুখ ।

১৯৪৪ সালে বিজন ভট্টাচার্যের মঞ্চস্তরবিষয়ক নাটক ‘নবান্ন’ মঞ্চায়নে জয়নুল আবেদিন গুরুত্বপূর্ণ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন। এ বছরই জয়নুলের আঁকা দুর্ভিক্ষ চিত্রের ১২টি ছবি নিয়ে প্রকাশিত হয় একটি গ্রন্থ, নাম ডার্কেনিং ডেইজ অব বেঙ্গল । গ্রন্থটি গ্রন্থনা করেন ইলা সেন । এটি ব্যাপক পাঠকপ্রিয়তা পায়। বেশ আলোড়নও তোলে । ফলে গ্রন্থটি ঔপনিবেশিক ব্রিটিশ সরকারের কোপানলে পড়ে এবং প্রচারের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি হয়।

 

 

দুর্ভিক্ষ চিত্রমালা । শিল্পী জয়নুল আবেদিন

 

১৯৪৫ সালে ফ্যাসিবাদবিরোধী লেখক ও শিল্পী সংঘের সম্মেলন উপলক্ষে আয়োজিত চিত্রপ্রদর্শনীতে জয়নুল আবেদিনের দুর্ভিক্ষের ছবিগুলো প্রদর্শিত হয় । এভাবে তিনি সর্বমহলে প্রশংসিত ও খ্যাতিমান ব্যক্তি হিসেবে গণ্য হতে থাকেন ।

১৯৪৬ সালে দিল্লিতে অনুষ্ঠিত হয় সর্বভারতীয় শিল্পী সম্মেলন । একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক শিল্প প্রদর্শনী। এর আয়োজক ছিলেন অল ইন্ডিয়া ফাইন আর্ট অ্যান্ড ক্রাফট । প্রদর্শনীতে অংশ নেয় ফ্রান্স, ব্রিটেন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও স্বনামধন্য ভারতীয় শিল্পীবৃন্দ । এতে জয়নুলের দুর্ভিক্ষ চিত্রমালার কয়েকটি স্থান পায়। খ্যাতিমান শিল্পী। ও বোদ্ধারা এর মাধ্যমে তার ছবির সঙ্গে পরিচিত হতে পারেন। জয়নুলের ছবি প্রদর্শনীতে প্রশংসা পায়।

একই সঙ্গে সমগ্র ভারতের সীমানা পেরিয়ে তার ছবি বিদেশেও প্রচারের সুযোগ পায়। এভাবে জয়নুল আবেদিনের শিল্পী পরিচিতির ব্যাপ্তি বাড়তে থাকে । একই বছরের শেষার্ধে কলকাতায় হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গার পরিপ্রেক্ষিতে কলকাতা ইসলামিয়া কলেজে অনুষ্ঠিত হয় ‘মুসলিম আর্ট একজিবিশন’ । জয়নুল আবেদিন এই প্রদর্শনীতে প্রধান শিল্পী হিসেবে অংশ নেন ।

আরও দেখুনঃ

Leave a comment