আজকে আমরা শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন সংগ্রহশালা সম্পর্কে আলোচনা করবো। এটি শিল্পী জয়নুল আবেদিন এর জীবনী গ্রন্থমালার অন্তর্গত।জয়নুল আবেদিন বিংশ শতাব্দীর একজন বিখ্যাত বাঙালি চিত্রশিল্পী। পূর্ববঙ্গে তথা বাংলাদেশে চিত্রশিল্প বিষয়ক শিক্ষার প্রসারে আমৃত্যু প্রচেষ্টার জন্য তিনি শিল্পাচার্য উপাধি লাভ করেন।
শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন সংগ্রহশালা । শিল্পী জয়নুল আবেদিন
শিল্পী জয়নুল আবেদিনের অমূল্য শিল্পকর্ম সংরক্ষণ শিল্পীর জীবৎকালেই অনেকে অনুধাবন করেছিলেন। কেননা এসব শিল্পকর্ম শুধু উৎকর্ষের জন্যই নন্দিত ছিল না, তা ছিল একদিকে যেমন তৎকালীন আর্থ-সামাজিক ইতিহাসের কখন তেমনি বাংলা শিল্পঘরানার এক নয়া উল্লাস। জয়নুল আবেদিনেরও এ বাসনায় সায় ছিল। তাই দেখতে পাই তিনি নিজেই একজন উদ্যোক্তা হয়ে নিজের শিল্পকর্মসমূহ সংরক্ষণে ব্রতী হন। সহযোগী হিসেবে ছিল স্থানীয় জেলা প্রশাসন। এ ক্ষেত্রে তিনি শিল্পকর্ম সংরক্ষণের স্থান হিসেবে বেছে নেন।
স্মৃতিবিজড়িত ময়মনসিংহ শহর। ১৯৭৫ সালের ১৫ এপ্রিল শিল্পীর আঁকা মোট ৭০টি চিত্রকর্ম নিয়ে ব্রহ্মপুত্র নদের তীরে নৈসর্গিক দৃশ্য পরিবেষ্টিত প্রাঙ্গণে সংগ্রহশালাটি প্রতিষ্ঠিত হয়। পুরনো শতবর্ষী একটি একতলা ভবনে সংগ্রহশালাটি অবস্থিত। জয়নুল সংগ্রহশালার উদ্বোধন করেন স্বাধীন বাংলাদেশের প্রবাসী সরকারের অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম। জীবন সায়াহ্নে এই প্রতিষ্ঠানটি গড়তে গিয়ে শিল্পী জয়নুল আবেদিনকে প্রচুর শ্রম দিতে হয়েছে।
জয়নুল আবেদিন আজীবন প্রান্তিয় করে রাখা মানুষের পক্ষ নিয়েছিলেন, তাদের কণ্ঠস্বর হয়েই ছবি এঁকেছেন । এবং স্বউদ্যোগী জীবনের যা অর্জন সেই শিল্পকর্মসমূহ শহর থেকে দূরে সাধারণ মানুষের আওতার মধ্যেই রাখতে চেয়েছিলেন । এর মাধ্যমেই শিল্পীর মহৎ লক্ষ্যটি আমরা উপলব্ধি করতে পারি ।
সংগ্রহশালাটি প্রতিষ্ঠার পর স্থাপনা ও ব্যবস্থাপনাগত নানা পরিবর্তন সাধিত হয়েছে । প্রথমে ১৯৭৫ সালের ১৯ জুলাই থেকে ১৯৮৬ সাল পর্যন্ত স্থানীয় জেলা প্রশাসককে সভাপতি করে ৪৬ সদস্যবিশিষ্ট একটি পরিচালনা পরিষদ দ্বারা সংগ্রহশালাটি পরিচালিত হতে থাকে। পরবর্তীতে ১৯৮৫ সালে সরকারের পরামর্শে ১৯৮৬ সালে জেলা প্রশাসককে সভাপতি করে সংগ্রহশালাটি পরিচালিত হতে থাকে।
১৯৮৭ সালে সংগ্রহশালাটির স্থাপনার বড় ধরনের পরিবর্তন ঘটে। এ সময় সংগ্রহশালাটির একতলা ভবনটি পুরনো এবং ভবনের দেয়াল ভীষণভাবে ড্যাম্পযুক্ত হওয়ায় চিত্রকর্মসমূহ সংরক্ষণে সমস্যা দেখা দেয়ায় ভবন সংস্কার জরুরি হয়ে পড়ে। তখন ট্রাস্টি বোর্ড সংগ্রহশালা ভবনটিকে দ্বিতীয় ভবনে উন্নীত করে। অতঃপর নিচতলায় রক্ষিত শিল্পকর্মসমূহ দ্বিতীয় তলায় স্থানান্তর করা হয়। ১৯৯৯ সালের ৩১ আগস্ট শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন সংগ্রহশালার যাবতীয় দায়দায়িত্ব জাতীয় জাদুঘরের কাছে নাস্ত করা হয় । এভাবে প্রতিষ্ঠানটি জাতীয় প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়।
পরবর্তীতে প্রতিষ্ঠানটির লক্ষ্য বাস্তবায়নে “শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন সংগ্রহশালা’ শীর্ষক একটি প্রকল্প নেয়া হয়। প্রকল্পের উদ্দেশ্য হয় আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন শিল্পী জয়নুল আবেদিনের অমূল্য শিল্পকর্মগুলোকে স্থানীয়ভাবে সংগ্রহ, সংরক্ষণ, প্রদর্শন, গবেষণা এবং শিল্পাচার্যকে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে পরিচয় করিয়ে দেবার জন্য সংগ্রহশালাটিকে প্রতিষ্ঠা করা।
সংগ্রহশালাটির মাধ্যমে বাংলাদেশের চারুশিল্পের ঐতিহ্য সম্পর্কে দেশ-বিদেশের জনগোষ্ঠী একটি উচ্চ ধারণা নিতে সক্ষম হবে এবং সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের ধারা নিতে সক্ষম হবে এবং সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের ধারা উৎকর্ষ সম্পর্কে সম্যক জ্ঞান লাভ করবে । শিল্পকলা চর্চাকে উৎসাহিত করার পাশাপাশি দেশের পরিবেশ সংরক্ষণ উন্নয়নে যথেষ্ট ভূমিকা রাখবে । অর্থনৈতিক উন্নয়নের পাশাপাশি জনগণকে আমাদের অতীত ঐতিহ্যের সাথে প্রত্যক্ষভাবে পরিচয় করিয়ে দিতে পারলে তাঁদের সামাজিক মূল্যবোধ শাণিত হবে এবং আত্মপরিচয়বোধে জাতি সমৃদ্ধ হবে।
জাতির ইতিহাস, ঐতিহ্য সংরক্ষণ, শিক্ষা এবং গবেষণামূলক কাজে সংগ্রহশালাটি সহায়ক ভূমিকা পালন করবে। এর ফলে নাগরিকদের মধ্যে সাংস্কৃতিক চেতনাবোধ, দেশপ্রেম ও জাতীয়তাবোধ সঞ্চারিত হবে। প্রকল্প শেষে সংগ্রহশালাটিকে একটি পূর্ণাঙ্গ জাদুঘরে রূপান্তর করার পরিকল্পনা সরকারের রয়েছে। সংগ্রহশালা প্রকল্পটি ১৯৯৭ সালে অনুমোদিত হলেও প্রকৃতপক্ষে প্রকল্পটির উন্নয়ন কাজ আগস্ট ১৯৯৯ সাল থেকে জুন ২০০৪ পর্যন্ত মোট ৫ বছরে সম্পন্ন করা হয়েছে।
বর্তমানে সংগ্রহশালার দ্বিতীয় তলায় শিল্পীর ৬২টি চিত্রকর্ম ও তাঁর ব্যবহার্য ৬৯টি নিদর্শন রয়েছে। এছাড়া সংগ্রহশালার দ্বিতীয় তলার বারান্দায় জয়নুলের একটি প্রতিকৃতি, সংগ্রহশালার সংক্ষিপ্ত ইতিহাস, শিল্পাচার্যের সংক্ষিপ্ত জীবন বৃত্তান্তসহ ১৯৪৩ সালের দুর্ভিক্ষ সিরিজের ১৬টি প্রকাশিত চিত্রের প্রতিচ্ছবি প্রদর্শনের ব্যবস্থা রয়েছে। সংগ্রহশালার সময়সূচি অনুযায়ী নিয়মিত দর্শকদের জন্য গ্যালারি খোলা ও বন্ধ করা হয়।
দুই টাকা দর্শনীর বিনিময়ে সকল দর্শক শিল্পাচার্যের অমূল্য চিত্রকর্মসমূহ শনি থেকে বুধবার বেলা ১০ ৩০ থেকে বিকাল ৪ ৩০টা পর্যন্ত এবং শুক্রবার বিকাল ৩.৩০ থেকে সন্ধ্যা ৭.৩০টা পর্যন্ত দর্শন করতে পারেন । সাপ্তাহিক ছুটি ও সরকারি ছুটির দিনে সংগ্রহশালা বন্ধ থাকে।
আরও দেখুনঃ

