Site icon Fine Arts Gurukul [ চারুকলা গুরুকুল ] GOLN

ছবি আঁকার নেশায় । শিল্পী জয়নুল আবেদিন

ছবি আঁকার নেশায়

আজকে আমাদের আলোচনার বিষয়ঃ ছবি আঁকার নেশায়। এটি শিল্পী জয়নুল আবেদিন এর জীবনী গ্রন্থমালা। জয়নুল আবেদিন  বিংশ শতাব্দীর একজন বিখ্যাত বাঙালি চিত্রশিল্পী। পূর্ববঙ্গে তথা বাংলাদেশে চিত্রশিল্প বিষয়ক শিক্ষার প্রসারে আমৃত্যু প্রচেষ্টার জন্য তিনি শিল্পাচার্য উপাধি লাভ করেন।

 

 

ছবি আঁকার নেশায় । শিল্পী জয়নুল আবেদিন

ইতোমধ্যে আমরা জেনেছি জয়নুলের বাবা পুলিশের চাকুরে ছিলেন। আর পুলিশের চাকরি মানে বদলির চাকরি। আজ এখানে কাল ওখানে । এই স্থানবদলের মধ্যেই ১৯২২ সালে জয়নুল ভর্তি হন শেরপুরে রামরঙ্গিনী এম.ই. স্কুলে। এখানে তিনি চতুর্থ শ্রেণী পর্যন্ত পড়াশোনা করেন। এরপর ময়মনসিংহ শহরের আকুয়া মাদ্রাসা কোয়ার্টারে তাদের নিজস্ব বাড়ি হয়। লম্বা টিনের ঘর তৈরি করা হয় । তার জন্য একটি ঘরও বরাদ্দ হয় । এভাবে তিনি একটি ব্যক্তিগত ভুবন পান ।

ফলে জয়নুল তার একান্ত ব্যক্তিগত চিন্তাভাবনাগুলো নাড়াচাড়া করার একটি পরিসর পেলেন। এখানে এসে তিনি ময়মনসিংহ জেলা স্কুলে পঞ্চম শ্রেণীতে ভর্তি হলেন। অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত এখানেই রইলেন । অতঃপর চলে এলেন ময়মনসিংহের বিখ্যাত মৃত্যুঞ্জয় স্কুলে। তখন ১৯৩০ খ্রিস্টাব্দ। এখানে তিনি নবম ও দশম শ্রেণী পর্যন্ত অধ্যয়ন করেন । প্রচলিত নিয়মে বলা যায়, লেখাপড়ায় তিনি ভালো ছিলেন না। মাঝারি মাপের ছাত্র ছিলেন। আর বিদ্যায়তনিক পড়াশোনা যে তার ভালো লাগতো না নানাভাবে তা প্রকাশ পেত। দিন দিন ছবি আঁকার প্রতি ঝোঁক প্রগাঢ় হচ্ছিল। এক সময় ইচ্ছাটা বেপরোয়া আকার ধারণ করে । ফলে ম্যাট্রিক পরীক্ষা আর দেয়া হলো না।

ময়মনসিংহের শম্ভুগঞ্জের কাছে ব্রহ্মপুত্র নদ

 

ময়মনসিংহ শহরে থিতু হয়ে তার সৃজনপ্রয়াসী মানসিকতা যেন আরও উসকে ওঠে। শহরের পাশে ব্রহ্মপুত্র নদ, যার কুলকুল স্রোতধারা তার মনে আবেগের ফল্গুধারা বয়ে দিত । একাকী তীরে বসে প্রকৃতির রূপরসে আপ্লুত হতেন। রঙের খেলা দেখতেন । চারদিকে যা কিছু দেখেন সবই গভীর মনোযোগে পর্যবেক্ষণ করেন । এতে তার মানসপটে যে নানা রঙের আভার পোচ লাগে, তা শিল্পীজীবনের পথটিকে সুস্পষ্ট করে দেয়। নিজে যেমন এবং সবাইকে বুঝিয়ে দেবার মতো নানা কাণ্ডকারখানা এ সময়ে তিনি প্রকাশ করতে থাকেন ।

স্কুলে আসা-যাওয়ার পথেই পড়তো আগফা স্টুডিও। এখানে কিছু সৃজনশীল মানুষের জমায়েত হতো। এরা অগ্রসর শিল্পচর্চার খবর রাখতেন । কেউ কেউ আবার কলকাতা আর্ট কলেজের ছাত্র ছিলেন। আর সে সময়ে কলকাতা আর্ট কলেজে বলা যায় অবিভক্ত ভারতবর্ষের নেতৃত্বস্থানীয় শিল্পচর্চা কেন্দ্র ছিল। স্বাভাবিকভাবেই এখানকার ছাত্রদের আলাদা একটি উঁচা ভাব থাকতো। এদের সঙ্গে মিশে এবং ময়মনসিংহ শহরের সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে অবস্থান করে জয়নুল নিজেকে আরও ধারালো করে নিতে পারেন। শিল্পের হালহকিকত সম্পর্কে জানতে পারেন ।

 

 

জয়নুলের বন্ধুবান্ধবের সংখ্যা খুবই কম ছিল। বালকসুলভ উচ্ছলতাও তার মধ্যে তেমন ছিল না। ব্রহ্মপুত্র নদের তীরে এ সময় তিনি নিবিষ্ট মনে ছবি আঁকতেন । বাংলা সংস্কৃতি ও সাহিত্যের দুই স্মরণীয় ব্যক্তি ছিলেন মণীশ ঘটক ও ঋত্বিক ঘটক। ময়মনসিংহ শহরের জয়নুলের স্বল্পকয়েক বন্ধুর মধ্যে অন্যতম ছিলেন এদেরই ভাই আশীষ ঘটক। জয়নুল বন্ধু হিসেবে এমনই মানুষদের বেছে নিতেন। সৃজনশীল মানুষদের সাথেই নিজকে মেলে দিতেন ।

শহরের ব্রাহ্মমন্দিরের কাছের অবস্থিত আগফা স্টুডিওর মালিক ছিলেন প্রেমরঞ্জন দাশগুপ্ত। প্রেমরঞ্জন ও তার স্টুডিও-কে কেন্দ্র করে সৃজনশিল্পীরা জড়ো হতেন। ময়মনসিংহের যেসব ছেলে কলকাতা আর্ট কলেজে পড়তো ছুটিছাটায় তারা এখানে এসেই খোশগল্প করতো। জয়নুল তাদের সঙ্গে পছন্দ করতেন । আর্টের নানা বিষয় নিয়ে তাদের সঙ্গে আলাপ হতো। তিনি কলকাতা আর্ট কলেজ সম্পর্কে কৌতূহল প্রকাশ করতেন। শিল্পের নানা খুঁটিনাটি জানতে চাইতেন। আর নিজের ভবিষ্যৎ পথরেখা নির্মাণ করতেন। প্রেমরগুনের এক ভাই ছবি আঁকতেন, থাকতেন পাটনা। প্রেমরঞ্জনের সাথে ময়মনসিংহের আদি নিবাসী দুই বিখ্যাত শিল্পী হেমেন্দ্র মজুমদার ও প্রহ্লাদচন্দ্র কর্মকারের যোগাযোগ ছিল। এমন একটি পরিবেশের সাথে নিজেকে যুক্ত করে শিল্পচর্চার প্রতি অতিমাত্রায় আগ্রহী হয়ে ওঠেন।

তখনকার একটি ঘটনা সবার কাছে জয়নুলকে নতুনভাবে উপস্থিত করে । বর্তমানে ভারতের যে শহরকে আমরা মুম্বাই বলে জানি, তখন এর নাম ছিল বোম্বাই । এখান থেকে ‘নিউজ ক্রনিকল’ নামে একটি পত্রিকা বের হতো । এই পত্রিকা ছোটদের জন্য ছবি আঁকার একটি প্রতিযোগিতা আয়োজন করে। ওই পত্রিকায় গলফ খেলার একটি ছবি ছাপা হয়েছে, সেই ছবি দেখে হুবহু আঁকতে হবে । জয়নুল খবরটি পেলেন এবং চুপি চুপি দুটি ছবি এঁকেও ফেললেন । কিন্তু বোম্বে ছবি পাঠাবার মতো ডাক মাসুল তার কাছে ছিল না। কারও কাছে কথাটি বলে টাকাও চাইতে পারলেন না। তার ছিল ভারি লজ্জা হতোদ্যম হয়ে দুটো ছবির ভালোটি এক বন্ধুকে দিয়ে দিলেন। অন্যটি তোশকের নিচে ফেলে রাখলেন। তারপর ভুলে গেলেন ব্যাপারটি।

দিন দুয়েক পর জয়নুলের বাবা কিছু খুঁজতে এসে ছবিটি দেখলেন, সঙ্গে পত্রিকাটিও। পড়ে তিনি সব বুঝতে পারলেন। আঁকা ছবিটি দেখে তিনি মুগ্ধ হলেন । পুত্রের অভিলাষও বুঝতে পারলেন। অতঃপর নিজের উদ্যোগে পাঠিয়ে দিলেন পত্রিকার অফিসে। কয়েক দিন পর বন্ধু ঋত্বিমা ঘটক যে সংবাদ দিল শুনে তো জয়নুল বিমূঢ় হয়ে গেলেন। আনন্দ উৎফুল্লতায় আলোড়িত হলো ময়মনসিংহ শহর। তাদের ছেলে জয়নুল গলফ খেলার ছবি আঁকায় প্রথম পুরস্কার’ পেয়েছে। ঋত্বিমা যখন তার সামনে ছবি ও পত্রিকাটি খুলে ধরে, দেখে তার ছবিটিই ছাপা হয়েছে পত্রিকায়, আর নিচে তার নাম। ভাবলো ছবিটা পাঠাল কে?

জয়নুলের ধর্মপ্রাণ বাবা, সেই আমলে জয়নুলের ছবি প্রতিযোগিতায় পাঠিয়ে যে কাণ্ডটি ঘটালেন, তা তৎকালীন মুসলিম সমাজে বিরল ঘটনা। জয়নুলও ছবি আঁকা শেখার মানসিক পারিবারিক সমর্থন পেল। পুরস্কার ও বাবার পৃষ্ঠাপোষকতা জয়নুলের ভবিষ্যৎ নির্মাণের সড়কটি কিছুটা সহজ করে দিল ।

এ সময়ই তিনি আরেকটি কাণ্ড করলেন । কাউকে না জানিয়ে হঠাৎ উধাও হয়ে গেলেন । বাবা অস্থির আর মা পাগলপ্রায়। পাড়াপড়শিরা চিন্তিত। সবাইকে কয়েকদিন দারুণ উৎকণ্ঠায় রেখে জয়নুল ফিরে আসেন। খুবই স্বাভাবিকভাবে। জানান, তিনি কলকাতা গিয়েছিলেন। আর সে সময় কলকাতা আর্ট স্কুলই ছিল অবিভক্ত বাংলার একমাত্র চিত্রকলা শেখার প্রতিষ্ঠান। তিনি ভর্তি হওয়ার নিয়মকানুন জেনে এসেছেন বলেও সবাইকে জানিয়ে দেন ।

 

 

ব্রহ্মপুত্র নদীর তীরে ফেরির জন্য অপেক্ষমাণ ১৯৫১

 

এরপর জয়নুল যেন অন্য মানুষ। এমনিই ছিলেন মাঝারি মাপের ছাত্র, কলকাতা থেকে ফিরে লেখাপড়া থেকে আরও দূরে সরে যেতে লাগলেন । ব্রহ্মপুত্র নদের পাড়ে বিভোর হয়ে ছবি আঁকাতেই মনোযোগী হন বেশি। ছবি আঁকায় এতো নেশায় পেয়ে বসেছিল যে, ক্লাসে বসেও বই-খাতায় আনমনে ছবি আঁকতেন । তখন মৃত্যুঞ্জয় হাই স্কুলের হেডমাস্টার ছিলেন বাবু চিন্তাহরণ মজুমদার। খুবই কড়া শিক্ষক। ছাত্র শাসনে জুড়ি নেই, আর ছাত্র শাসন মানেই জোড়া বেতের পিটুনি । ইংরেজি ক্লাসে একদিন তিনি দেখলেন জয়নুল ক্লাসে মনোযোগী না হয়ে ছবি আঁকছে। হেডমাস্টার টুনুর নিকটে এসে বইটি দেখতে চাইলেন। দেখলেন বইটির খালি জায়গায় বিভিন্ন স্থানে ছবি আঁকা। সহপাঠীরা উৎকণ্ঠিত । পুরো ক্লাস জয়নুলের শাস্তি দেখতে প্রস্তুত। কিন্তু হেডমাস্টার চুপ করে রইলেন । পরদিন খাতাটি ফেরত দেবেন বলে জানান ।

কিন্তু জয়নুল শাস্তির ভয়ে পরদিন আর ক্লাসেই এলো না। ভাবলো বড় রকমের শাস্তি তার জন্য অপেক্ষা করছে। এমনি কাটল আরও কয়েক দিন । জয়নুল স্কুলের নাম করে বাড়ি থেকে ঠিকই বের হয়, কিন্তু শাস্তির ভয়ে স্কুলে না এসে এখানে-সেখানে ঘুরেফিরে সময় কাটিয়ে বাড়ি ফেরে। হেডমাস্টার ব্যাপারটি কিছুটা অনুমান করতে পারলেন। আবার ভাবলেন অসুখ হলো না। তো? সোজা চলে গেলেন জয়নুলের বাড়ি। জয়নুল বাড়ি নেই । সাতদিন স্কুলে যায়নি, শুনে তো জয়নুলের বাবা অবাক হলেন। হেডমাস্টার হাসলেন। তার সামনে ইংরেজি বইটা খুলে ধরলেন, পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠা শুধু আঁকিবুকি। অদ্ভুত যতো ছবি। হেডমাস্টার বাবু চিন্তাহরণ মজুমদার বললেন- ওকে উৎসাহ দিন, একদিন ও খুব বড় শিল্পী হবে। ওকে আর্ট স্কুলে ভর্তি করিয়ে দিন

জয়নুলের বাবা কথাটি মেনে নিলেন ।

জয়নুলের আর প্রবেশিকা পরীক্ষা দেয়া হলো না। পরীক্ষার প্রতি তার কোনো আগ্রহও ছিল না।

Exit mobile version