আজকে আমাদের আলোচনার বিষয়ঃ ছবির ভাষায় কথা বলা। এটি শিল্পী জয়নুল আবেদিন এর জীবনী গ্রন্থমালা। জয়নুল আবেদিন বিংশ শতাব্দীর একজন বিখ্যাত বাঙালি চিত্রশিল্পী। পূর্ববঙ্গে তথা বাংলাদেশে চিত্রশিল্প বিষয়ক শিক্ষার প্রসারে আমৃত্যু প্রচেষ্টার জন্য তিনি শিল্পাচার্য উপাধি লাভ করেন।

ছবির ভাষায় কথা বলা । শিল্পী জয়নুল আবেদিন
পৃথিবীতে অনেক দেশ, অনেক জাতি ৷ তাদের চেহারাসুরত আলাদা। কেউ কালচে, কেউ সাদাটে, কেউ হলদেটে, কেউ আবার আমাদের মতো শ্যামলা । আকারে কেউ লম্বা, কেউ খাটো। ধর্ম, আচার-আচরণ ও পোশাক-আশাকে আলাদা। এমন কী তাদের ভাষাও আলাদা। ভাষা আলাদা হওয়াতে মানুষে মানুষে ভাব আদান-প্রদান অনেক সময় জটিল হয়ে পড়ে। প্রাচীনকালে মানুষ আকার-ইঙ্গিতে ভাববিনিময় করতো। তারপর ছবি এঁকে ভাববিনিময় করতো ।
ভাববিনিময়ের ছবিগুলো একসময় অক্ষরে পরিণত হয়। অক্ষর আবিষ্কারের পর। কোনো নির্দিষ্ট জাতিগোষ্ঠী তাদের ভাষার একটি লিখিতরূপ দিতে পারে । যদিও অন্য জাতিগোষ্ঠীর পক্ষে ঐ ভাষা জানা সহজ ছিল না। আজও এ সমস্যা রয়ে গেছে। কিন্তু আঁকা ছবিগুলোর অর্থ কিন্তু সব মানুষের পক্ষে বোঝা সম্ভব। ছবির ভাষা সবাই বোঝে । সুদূর প্রাচীনকালে ভাষা ছিল না, কিন্তু ছবি ছিল। মানুষ ছবি এঁকে মনের ভাব আদান-প্রদান করতো। গুহাগাত্রে মনের খেয়ালে আঁকা ছবিগুলো বর্তমানে সে-সময়ের ভাষা হয়ে আমাদের সঙ্গে সে-সময়ের কথা বলে । এই আধুনিক যুগেও ছবি কথা বলে। একটা গল্প বলি তাহলে ব্যাপারটা খোলাসা হবে ।

গল্পটি এক বাঙালিকে নিয়ে । ভদ্রলোক গিয়েছেন স্পেনে বেড়াতে। সেখানকার ভাষা স্প্যানিশ । তিনি ইংরেজি ভাষা রপ্ত করেছেন, আর দু-চারটি ফরাসি জানেন । স্প্যানিশ ভাষার ক থ জানেন না। তিনি আবার ছবি আঁকেন । অর্থাৎ তিনি একজন চিত্রশিল্পী । অঙ্কনের সরঞ্জামাদি নিয়ে তিনি শহরে ঘুরতে লাগলেন। এর ফাঁকে রাস্তার পাশে বসে ছবিও আঁকলেন।
দুপুরবেলা পেট ক্ষিষেয় চোঁ চোঁ করতে লাগলো। ঢুকে পড়লেন নাগালের মধ্যে এক রেস্টুরেন্টে। তিনি ইংরেজি ফরাসি ভাষা মিলিয়ে খাবারের চাহিদা জানাতে লাগলেন। কিন্তু সমস্যা হলো হোটেল বয়রা কেউই তার ভাষা বুঝতে পারে না। তাই আকার-ইঙ্গিতে ভরসা করে কিছু বোঝাতে চাইলেন । এই নিয়ে পরস্পরের ভাষা নিয়ে অজ্ঞ দুই পক্ষের মধ্যে ভাষাবিষয়ক জটিলতা কিছুটা কাটলো । কিন্তু সমস্যার সমাধান হলো না
কিছুক্ষণ আগে পাশের টেবিলের একজন চিংড়ি ভাজি দিয়ে রুটি খাচ্ছিল মেন্যুটি তার পছন্দ হয়েছিল । তিনি ইঙ্গিতে ওয়েটারকে বোঝাতে পারলেন ওই লোকটির খাবার তিনি খেতে চান। কিন্তু লোকটি ইতোমধ্যে চলে গেছেন । বিদেশ-বিভুঁইয়ের এই লোকটিকে নিয়ে হোটেল কর্তৃপক্ষ জটিলতায় পড়লেও বিরক্ত হলো না। তাকে রান্নাঘরে নিয়ে গেল। একে একে খাবারের সব মেন্যু তার সামনে উপস্থিত করা হলো ।

রাঁধুনি ও বয়রা অদ্ভুত আগন্তুককে নিয়ে মজায় মেতে উঠলো । বেশ কিছুক্ষণ পর শিল্পী তার পছন্দের খাবার পেলেন । এভাবে দুপুরের খাবার কোনো রকমে সম্পন্ন হলো। তবে খেতে খেতে ভাবছিলেন, এভাবে তো চলবে না । তাকে তো বেশ কিছুদিন স্পেনে থাকতে হবে । উপায়। উপায় তিনি পেয়ে গেলেন। রাতে একই হোটেলে এলেন আবার খেতে । তাকে দেখে হোটেলের ওয়েটার এবং কতিপয় প্রত্যক্ষদর্শী হেসে স্বাগত জানালেন ।
তাদের মধ্যে শুনগুন ও মুচকি হাসি বিনিময় চলছিল। কিন্তু বাঙালি শিল্পী তা গায়ে মাখলেন না। আত্মপ্রত্যয়ে একজন ওয়েটারকে ডাকলেন । অতঃপর ঝোলা থেকে ছবি আঁকার খাতা বের করে ঝটপট কিছু ছবি আঁকলেন।
ইতোমধ্যে তাকে ঘিরে একটি বৃত্ত রচিত হয়েছে। সবার মধ্যে কৌতূহল, অন্তত আগন্তুকের মতিগতি নিয়ে। তিনি যখন আঁকা শেষ করে ওয়েটারের সামনে খাতাটি তুলে ধরলেন, ওয়েটারের চোখ তখন ছানাবড়া, আনন্দ ও বিস্ময়ে আত্মহারা। কোনো কথাই বলতে হলো না, অথচ ওয়েটার জেনে ফেললো কাস্টমারের খাবার মেন্যু। আসলে এখানে শিল্পী এমন এক ভাষায় কথা বলেছেন, যাকে বলা চলে আমাদের আদিম এক ভাষা। এই ভাষার নাম ছবির ভাষা । ছবির মাধ্যমে তিনি কী কথা বলেছিলেন দেখা যাক ।

তিনি বলেছিলেন, তিনি কী কী খেতে চান এবং কেমন করে খেতে চান । প্রথমেই জানালেন তিনি যা খাবেন সেদ্ধ খাবেন। খাবেন গরুর রানের মাংস। মাছ, সবজি, ডিম, স্যুপ ও দুধ খাবেন। মদ খাবেন না। সবাই তো তার কারিশমায় থ বনে গেল । তার কদরও বেড়ে গেল ।
বাঙালি এই চিত্রশিল্পীর নাম জয়নুল আবেদিন ।
