Site icon Fine Arts Gurukul [ চারুকলা গুরুকুল ] GOLN

কালজয়ী শিল্পীর পথরেখা । শিল্পী জয়নুল আবেদিন

কালজয়ী শিল্পীর পথরেখা

আজকের আলোচনার বিষয়ঃ কালজয়ী শিল্পীর পথরেখা। এটি শিল্পী জয়নুল আবেদিন এর জীবনী গ্রন্থমালার অন্তর্গত। জয়নুল আবেদিন  বিংশ শতাব্দীর একজন বিখ্যাত বাঙালি চিত্রশিল্পী। পূর্ববঙ্গে তথা বাংলাদেশে চিত্রশিল্প বিষয়ক শিক্ষার প্রসারে আমৃত্যু প্রচেষ্টার জন্য তিনি শিল্পাচার্য উপাধি লাভ করেন।

 

 

কালজয়ী শিল্পীর পথরেখা । শিল্পী জয়নুল আবেদিন

আর্ট স্কুল জীবনে আঁকা ছবিগুলোতে জয়নুল আবেদিনের বড় শিল্পী হওয়ার আভাস ছিল । দুমকার আঁকা ছবিগুলোতে নতুন এক আবিষ্কার ছিল । তেমনি ময়মনসিংহে বিশেষ করে ত্রিশালে বড় বোনের বাড়ির সমাজজীবন ও পরিপার্শ্ব নিয়ে আঁকা ছবিগুলোতে যেন বাংলার প্রতিচ্ছবিই উদ্ভাসিত হয় ৷ চেনা-জানা চারপাশকেই তিনি অসাধারণ মমত্বে শৈল্পিক চিত্ররূপ দেন ।

এই সময় তার উল্লেখযোগ্য চিত্রগুলো হলো শম্ভুগঞ্জ (কালি কলমের স্কেচ: ১৯৩৩), হাঁস (জলরও, ১৯৩৩), বাঁশের সাঁকো (জলরঙ, ১৯৩৩), ফসল মাড়াই (ক্যানভাসে তেলরঙ, ১৯৩৪), বনানী দুমকা (জলরঙ, ১৯৩৪) পল্লী দৃশ্য (জলন্ত, ১৯৩৪), ঘোড়ার মুখ (পেন্সিল-তেলরঙ, ১৯৩৪) বাইসন-হু স্টাডি (জলরঙ, ১৯৩৫), মজুর (পেন্সিল স্কেচ: ১৯৩৫ ) প্রভৃতি ।

 

 

এসব চিত্রমালা তখনকার শিল্পবোদ্ধা ও সুধীসমাজের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। ছবিগুলোতে জয়নুলের কিছু নিজস্ব বৈশিষ্ট্য প্রকাশিত হয়। চিরায়ত গ্রামের যাপিতজীবনের পরিপার্শ্ব ক্ষেতখামারের কাজ, মাছধরা, গরুর গাড়ি, ধানমাড়াই, সৌম্য প্রকৃতি, আবার অন্যদিকে দুমকা সাঁওতাল নারীর সরল জীবন, মনোহর ময়ূরাক্ষী নদী ও নদী তীরবর্তী মানুষজীবনের ছবিগুলোতে শুধু যে বাহ্যিক সৌন্দর্য রস সৃষ্টি করেছে তাই না, উপরন্তু অন্তর্গত এক সত্যের উদ্ভাসও ঘটেছে। যা জয়নুলকে প্রচলিত শিল্পচর্চার ধারা থেকে আলাদা করে দেয় ।

জয়নুল আবেদিন ছাত্রাবস্থায় তার কাজের স্বীকৃতি পেতে থাকেন । দ্বিতীয় বর্ষে পড়াকালীন স্কুলের বার্ষিক চিত্রপ্রদর্শনীতে তার আঁকা ‘বাঁশের সাঁকো’ চিত্রটি বোদ্ধাদের উচ্চ প্রশংসা অর্জন করে। চিত্রটিতে গ্রামবাংলার সচরাচর দেখা একটি ছবি ভেসে উঠেছে। কয়েক গ্রামবাসী কাঁধে ও মাথায় বোঝা নিয়ে সাঁকো পাড় হচ্ছে। জয়নুলের এ সময়কার চিত্রগুলোতে এমনই সহজ-সরল বিষয়াদি থাকতো । বলা যায়, এটা ছিল জয়নুলের বৈশিষ্ট্য। কেননা শিল্পজীবনের পূর্ণতার কালেও তিনি এর থেকে তেমন দূরে সরে যাননি ।

 

 

ছাত্রাবস্থায় জয়নুলের একটি বড় অর্জন সারা ভারতে সাড়া ফেলে দেয়। ১৯৩৮ খ্রিস্টাব্দে কলকাতা জাদুঘরে সর্বভারতীয় বার্ষিক চিত্রপ্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হয় । জয়নুল এতে ছয়টি জলরঙের কাজ নিয়ে অংশগ্রহণ করেন । তার চিত্রমালার শিরোনাম ছিল অন অ্যান্ড ওভার দ্য ব্রহ্মপুত্র’। এই বছরের এক ছুটিতে বাড়িতে গিয়ে ব্রহ্মপুত্র নদের তীরে কয়েক ঘণ্টার মধ্যে ছবিগুলো এঁকেছিলেন। ছবিগুলোর বিষয় ছিল শম্ভুগঞ্জ ব্রিজ, শম্ভুগঞ্জে পাট ব্যবসায়ী।

গেসপার সাহেবের কুঠি, নদী পাড়ের কাঁশবন, জেলেদের মাছ ধরা, জাল শুকানো, হাসপাতাল ও খেয়া পারাপার, নদীতে প্রতিফলিত গাছপালার ছবি । প্রদর্শনীতে শ্রেষ্ঠ শিল্পকর্মের জন্য তিনি ‘গভর্নরস গোল্ড মেডেল’ পান। এই ছিল জয়নুলের জন্য বিরাট এক পাওয়া। কেননা এই প্রতিযোগিতায় সারা ভারত থেকে আগত অনেক প্রতিষ্ঠিত শিল্পীর উপস্থিতি ছিল। শিল্পবোদ্ধাদের কাছে তার সুনাম ছড়িয়ে পড়লো । পেয়ে গেলেন প্রতিষ্ঠা ।

 

 

জয়নুল যেন জন্মেছিলেন প্রচলিত নিয়ম ভাঙার প্রত্যয়ে। তীব্র ইচ্ছাশক্তি ও মেধা তাকে এ ক্ষেত্রে সহায়তা করে। তা না হলে ময়মনসিংহ মৃত্যুঞ্জয়ী স্কুলের যে ছাত্রটি ম্যাট্রিকুলেশন স্তর পার হলো না. সে কি না কলকাতা আর্ট স্কুল থেকে প্রথম শ্রেণী নিয়েই উত্তীর্ণ হলো। শুধু কি তাই? পরীক্ষার ফল প্রকাশের আগেই বলা যায় ছাত্রাবস্থায়ই শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ পেলেন। ১৯৩২ সালে জয়নুলের তো আর্ট স্কুলে ভর্তি হওয়ার ব্যাপারটিই ছিল অনিশ্চিত, আর সেই জয়নুল আবেদিন ১৯৩৮ সালে সেখান থেকে প্রথম শ্রেণীতে শুধু উত্তীর্ণই হলেন না, শিক্ষকও হলেন । শুধু কি তাই? ছাত্র ও শিক্ষক হিসেবে তিনি ছিলেন আর্ট স্কুলে অতি জনপ্রিয় ।

তীব্র ইচ্ছাশক্তি মানুষের মধ্যে যে দ্রোহ তৈরি করে, জয়নুল আবেদিন আজীবন নিজের সেই ইচ্ছা বাস্তবায়নে দ্রোহ করেছেন। তার জীবনশৈলীতে চোখ রাখলেই বুঝতে পারি। তবে তার সব কর্মকাণ্ডই ছিল সমষ্টিগত । দেশ ও জাতির চেতনা বিকাশে তিনি ছিলেন সদা তৎপর। শিক্ষাজীবন শেষে তিনি যা করেন, তাকে কিছুতেই শুধু ব্যক্তিগত কর্ম বলা যায় না। তিনি একাধারে শিল্পী ও সংগঠক হিসেবে এক সংগ্রামী জীবন বেছে নেন । অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছতে তিনি ছিলেন অনমনীয় । এই ধারা তার জীবনের সাথে মিলেমিশে গিয়েছিল ।

আরও দেখুনঃ

Exit mobile version