কলকাতা আট স্কুলে ভর্তি । শিল্পী জয়নুল আবেদিন

আজকে আমাদের আলোচনার বিষয়ঃ কলকাতা আট স্কুলে ভর্তি। এটি শিল্পী জয়নুল আবেদিন এর জীবনী গ্রন্থমালা। জয়নুল আবেদিন  বিংশ শতাব্দীর একজন বিখ্যাত বাঙালি চিত্রশিল্পী। পূর্ববঙ্গে তথা বাংলাদেশে চিত্রশিল্প বিষয়ক শিক্ষার প্রসারে আমৃত্যু প্রচেষ্টার জন্য তিনি শিল্পাচার্য উপাধি লাভ করেন।

 

কলকাতা আট স্কুলে ভর্তি । শিল্পী জয়নুল আবেদিন

 

কলকাতা আট স্কুলে ভর্তি । শিল্পী জয়নুল আবেদিন

জয়নুল আর্ট কলেজে ভর্তি হবেন । কথাটা শুনতে খুব সহজ। কিন্তু পরিস্থিতি ছিল কঠিন । অনেক সমস্যা বাধা হয়ে দাঁড়ায়।

জয়নুলের বাবা তমিজউদ্দিন ছিলেন ধার্মিক মানুষ। ধর্মকর্ম মানেন। প্রচলিত চিন্তাভাবনায় আস্থাশীল। আর ছবি আঁকা বিষয়ে তখনকার প্রচলিত ধারণা সুখকর ছিল না। ময়মনসিংহ মুসলিম সমাজে তখন ছবি আঁকাটা ছিল নাজায়েজ বিষয়। ধর্মীয় নেতৃস্থানীয়রা একে পাপ বলে গণ্য করতেন। এই

ভাবনা সাধারণের মধ্যেও অনুপ্রবেশ ঘটে। ফলে মুসলমান ছেলে জয়নুল ছবি আঁকা শিখবে, এ ব্যাপারে অনেকেই মেনে নিতে পারেনি। কিন্তু আবার এই ধর্মীয় নেতৃবৃন্দের মধ্যে স্বল্পসংখ্যক আলেম ছবি আঁকা কোনো নাজায়েজ বিষয় নয় বলে জানালেন । জয়নুলের বাবা শেষোক্ত আলেমদের কথা আমলে নিলেন ।

 

কলকাতা আট স্কুলে ভর্তি । শিল্পী জয়নুল আবেদিন

 

অতঃপর বড় সমস্যা হিসেবে গেল ভর্তির খরচ। ইতোমধ্যে জয়নুলের বাবা (১৯৩১ খ্রিস্টাব্দে) চাকরি থেকে অবসর নিয়েছেন। মাসিক পেনশন মাত্র ত্রিশ টাকা। এ দিয়ে চালাতে হতো সাত সদস্যের সংসার। ময়মনসিংহ জেলা বোর্ডের বৃত্তি পাওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছিল। তা পাওয়ার জন্য বাড়তি কিছু যোগ্যতার দরকার । জয়নুল তখন পর্যন্ত তা অর্জন করতে পারেনি । তাই বলে জয়নুলের ভর্তি থেমে থাকেনি। এগিয়ে এলেন স্নেহময়ী মা। নিজের সোনার গহনাদি বিক্রি করে ছেলের ভর্তির ব্যবস্থা করলেন।

একটি ধর্মীয় রক্ষণশীল পরিবারে থেকেও জয়নুলের মা-বাবা ছেলের আঁকিয়ে হওয়ার বাসনায় নিজেদের যেভাবে জড়ালেন তৎকালীন সমাজে তাকে এক বৈপ্লবিক কাণ্ডই বলা যায়। বলা যায়, মানসিকভাবে তারা এগিয়ে ছিলেন। প্রচলিত ধারণা থেকে। তা না হলে জয়নুলের আগ্রহ চাপা পড়েই থাকতো । এমন কতো ইচ্ছারই তো মৃত্যু হয়েছে তখনকার সমাজে এবং এখনো হচ্ছে । সে হিসেবে জয়নুল ভাগ্যবান। জয়নুলও তা জানতেন। তাই মা-বাবার অবদানকে আজীবন শ্রদ্ধার আওতায় রেখেছিলেন। আর পরিবারের অন্যদের প্রতিও দায়বদ্ধ থেকেছিলেন। সামর্থ্য অনুযায়ী প্রতিদান দিতে চেষ্টা করেছেন ।

 

কলকাতা আট স্কুলে ভর্তি । শিল্পী জয়নুল আবেদিন

 

জয়নুল ১৯৩২ খ্রিস্টাব্দে কলকাতা আর্ট স্কুলে ভর্তি হন । এখানে ভর্তি হতে ম্যাট্রিকুলেশন পাস দরকার হয় । কিন্তু তার সে যোগ্যতা ছিল না । ভর্তি পরীক্ষায় তিনি প্রথম হয়েছিলেন। ফলে প্রথমেই তিনি শিক্ষকদের নজরে পড়েন। নিয়ম ভেঙে তাকে স্কুলে ভর্তি করা হলো। এ ক্ষেত্রে আমরা আরেকজন বাঙালি বরেণ্য শিল্পী এস এম সুলতানকে স্মরণ করতে পারি । অষ্টম শ্রেণী পাস করা সুলতান শুধুমাত্র মেধার পরিচয় দিয়ে আট কলেজে ভর্তি হন।

তখন আর্ট স্কুলের অধ্যক্ষ ছিলেন মুকুল দে। জয়নুলের মেধার অনন্যতায় তিনি মুগ্ধ হন । ভর্তি হওয়ার পরই জয়নুল যাতে জেলা বোর্ডের বৃত্তি পায় সে জন্য সুপারিশ করেন। এও ছিল এক ব্যতিক্রম ঘটনা। নিয়ম ছিল প্রথম বর্ষের ফলাফলের ওপর ভিত্তি করে এ সুপারিশ করা যায়। অতঃপর জয়নুলের ইচ্ছারই জয় হলো । কর্তৃপক্ষ মেধার স্বীকৃতি দিতে আরেকবার নিয়ম ভাঙলো । মুকুল দে’র সুপারিশের পর তিনি মাসিক ১৫ টাকা হারে বৃত্তি লাভ করলেন। তার আর ছবি আঁকা শেখায় প্রতিবন্ধকতা রইলো না । কষ্টে কেটেছে, কিন্তু পিছু হটেননি ।

আরও দেখুনঃ

Leave a comment